দুশ্চিন্তায় জেলেরা

মেঘলা আকাশ, থেমে থেমে বৃষ্টি আর দমকা বাতাস। এতেই উত্তাল হয়ে উঠেছে বঙ্গোপসাগর। বৈরী আবহাওয়ায় মাছ ধরতে না পেরে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য পটুয়াখালীর আলীপুর ও মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে ফিরেছে দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকার শত শত মাছ ধরার ট্রলার। দীর্ঘ ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে নতুন আশায় সাগরে নামলেও বৈরী আবহাওয়ায় সেই আশায় বাধা পড়েছে। মাছ ধরতে না পারায় একদিকে জেলেদের আয় যেমন বন্ধ হয়েছে, তেমনি বাড়ছে খাবার, বরফ, জ্বালানি ও ট্রলার পরিচালনার খরচ। ফলে সাগরে না গিয়েও ঘাটে বসে লোকসান গুনছেন জেলেরা, দিন কাটছে তাদের দুশ্চিন্তায়।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বঙ্গোপসাগরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত জারি থাকায় আলীপুর ও মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র এখন ট্রলারে ট্রলারে পরিপূর্ণ। অনেক ট্রলার কয়েক দিন সাগরে অবস্থান করেও আশানুরূপ মাছ না পেয়ে ফিরে এসেছে। আবার অনেকে আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় ঘাটে অবস্থান করছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে আলীপুর ও মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, স্থানীয় ট্রলারের পাশাপাশি চট্টগ্রাম, বাঁশখালী, ভোলা, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা থেকে আসা শত শত ট্রলার ঘাটে নোঙর করে রয়েছে। ট্রলারে অবস্থানরত জেলেদের কেউ বাজার-সদাই, পানি, বরফ ও প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ করছেন, কেউ আবার আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনছেন।

জেলেরা জানান, দীর্ঘ ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে মাছ ধরতে নেমেছিলেন তারা। নিষেধাজ্ঞার পর প্রথম দিকে ভালো মাছ পাওয়ার প্রত্যাশা থাকলেও বৈরী আবহাওয়ায় তা পূরণ হচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম। পর্যাপ্ত মাছ না পেলে জ্বালানি, বরফ, খাবার, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে ট্রলার মালিক ও জেলেদের।

বাঁশখালী থেকে আসা এফবি বাদশা ট্রলারের মাঝি খোয়েব বলেন, ‘আমরা পাঁচ দিন আগে মাছ ধরতে সমুদ্রে গিয়েছিলাম। কিন্তু সমুদ্র উত্তাল হয়ে যাওয়ায় আলীপুর বন্দরের কাছাকাছি চলে আসি। কিছু মাছ পেয়েছি, তা নিয়েই ফিরে আসছি। কিন্তু বর্তমান বাজারে জ্বালানি তেলের যে দাম, সেই তুলনায় মাছ খুব কম পেয়েছি। এতে খরচও ওঠানো সম্ভব হচ্ছে না।’

মহিপুর বন্দরের জেলে সুলতান মাঝি বলেন, ‘আমরা তিন দিন ধরে সমুদ্রে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছি। ট্রলার, জাল, বাজারসহ সব সরঞ্জাম প্রস্তুত। কিন্তু আবহাওয়া খারাপ থাকায় সাগরে যাওয়ার সাহস করছি না। মাছ ধরতে না পারলেও ট্রলারের শ্রমিক ও অন্যান্য খরচ ঠিকই দিতে হচ্ছে।’

জেলে হারুন আকন মাঝি বলেন, ‘সমুদ্রের মধ্যে কয়েকটি ট্রলার নিয়ে আমরা একসঙ্গে ছিলাম। আবহাওয়া খারাপ হতে থাকায় সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিই, ঝুঁকি নিয়ে আর সাগরে থাকা যাবে না। তাই নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য তীরে ফিরে এসেছি।’ তিনি আরও বলেন, শুধু জেলে বা ট্রলার মালিকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না। মাছ বহনকারী শ্রমিক, বরফ কল, পরিবহন শ্রমিক, আড়তদারসহ মৎস্য ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সবাই ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এক হাজারের বেশি ট্রলার ঘাটে এসেছে। অনেক ট্রলারই আশানুরূপ মাছ না পেয়ে ফিরে এসেছে।

আলীপুরের ভাই ভাই ফিশের পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, ‘বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা থেকে শত শত ট্রলার আলীপুর ও মহিপুরে আশ্রয় নিয়েছে। এতে মাছের আমদানি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু স্থানীয় বাজার নয়, ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাছ সরবরাহেও এর প্রভাব পড়ছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত মৎস্য ব্যবসায় স্বাভাবিক গতি ফেরার সম্ভাবনা কম।’

পটুয়াখালী জেলা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহবুবা সুখী বলেন, ‘বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে সমুদ্রবন্দরগুলোকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করছে। সাগর উত্তাল থাকায় দমকা ও ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, নিম্নচাপটি আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ কারণে গভীর সমুদ্রে অবস্থানরত মাছ ধরার ট্রলার ও নৌযানগুলোকে সর্বশেষ আবহাওয়া বার্তা অনুসরণ করে সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করতে হবে।