বাংলাদেশের কৃষিতে সার শুধু একটি উৎপাদন উপকরণ নয়, খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। কৃষকের জমিতে এক বস্তা সার পৌঁছানোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের আয়, একটি ফসলের সম্ভাবনা এবং দেশের খাদ্যভা-ার। আমরা জানি, সার মাটির উর্বরতা বাড়ায়, ফলন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে এবং উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখে। তাই সারের সংকট কেবল কৃষকের ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এর প্রভাব পড়ে খাদ্য সরবরাহ, বাজারদর ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে। ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাওয়া সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ৯ সেপ্টেম্বর দেশে ইউরিয়া ৪ লাখ ১৮ হাজার, টিএসপি ৩ লাখ ৪৩ হাজার, ডিএপি ৩ লাখ ২ হাজার এবং এমওপি ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯০০ টনসহ মোট প্রায় ১২ লাখ ৪১ হাজার ৯০০ টন সার মজুদ ছিল। এর বাইরে পরিবহনের পথে ছিল টিএসপি ১ লাখ ২৮ হাজার ২০০, ডিএপি ১ লাখ ১৪ হাজার ৬০০ এবং এমওপি ১ লাখ ৮৯ হাজার ৪০০ টন। রবি ও বোরো মৌসুমে চাহিদা ৩৫ লাখ ৮৭ হাজার টনের বিপরীতে ৫১ লাখ ৭১ হাজার টন সরবরাহ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। অর্থাৎ জাতীয় পর্যায়ে সরবরাহের ঘাটতির চেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, এই সার যথাসময়ে সঠিক কৃষকের হাতে পৌঁছাচ্ছে কি না।
এই প্রশ্নের গুরুত্ব সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় আরও বেড়েছে। ২২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত দেশ রূপান্তরের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের কয়েকটি সীমান্ত ও উপকূলীয় এলাকা দিয়ে সার মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে এবং এর বিপরীতে ইয়াবা, আইসের মতো মাদক ও আগ্নেয়াস্ত্র দেশে প্রবেশের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে কক্সবাজার ও বান্দরবান সীমান্তের পাশাপাশি কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, যশোর ও সাতক্ষীরার বিভিন্ন সীমান্তের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। কোস্ট গার্ড ও বিজিবির তথ্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুন থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কক্সবাজার ও বান্দরবান সীমান্তে ২ লাখ ৩৫ হাজার ৯০৮ কেজি সার জব্দ এবং ১১৭ জনকে আটক করা হয়েছে। অভিযোগটি গুরুতর হলেও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যকে তদন্তের চূড়ান্ত ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সার পাচারের সঙ্গে মাদক বিনিময়ের অভিযোগের সত্যতা আইনসম্মত তদন্তে নির্ধারণ করতে হবে এবং অভিযোগ সত্য হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে কৃষকের হাতে সময়মতো নির্ধারিত দামে সার পৌঁছে দেওয়া রাষ্ট্র ও প্রশাসনের দায়িত্ব। ভর্তুকির সার যাতে কোনোভাবেই অবৈধ পথে চলে না যায়, তা নিশ্চিত করতে সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। কারণ সার পাচার কৃষকের উৎপাদন ও দেশের খাদ্যনিরাপত্তাকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করে। তারপরও অভিযোগটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ সার ও মাদক একই অবৈধ বাণিজ্যিক প্রবাহে যুক্ত হয়ে থাকলে এর ক্ষতি দ্বিমুখী। একদিকে কৃষকের খাদ্য উৎপাদনের জন্য বরাদ্দ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে, অন্যদিকে তার বিনিময়ে সমাজের জন্য ভয়ংকর মাদক প্রবেশের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। সারের অপচয় বা পাচারকে শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ হিসেবে দেখলে বিষয়টির পূর্ণ গুরুত্ব বোঝা যাবে না। এটি খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত, আর মাদক প্রবেশের অভিযোগ সত্য হলে তা জননিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। কৃষকের জন্য রাষ্ট্র যে সহায়তা দেয়, সেই সহায়তার পণ্য যদি অবৈধ বাণিজ্যের হাতিয়ার হয়, তাহলে তার সুফল কৃষকের বদলে পাচারকারীর কাছে চলে যায়।
চোরাচালানের অর্থনৈতিক প্রণোদনার বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সরকার কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমাতে বিভিন্ন ধরনের সার তুলনামূলক কম দামে সরবরাহ করে। দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৩৫০ টাকা দামের এক বস্তা ইউরিয়া মিয়ানমারে পাচারকারীদের মাধ্যমে প্রায় ৮ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে। এ ধরনের বড় মূল্য পার্থক্য থাকলে অবৈধ বাণিজ্যের জন্য আর্থিক প্রণোদনা তৈরি হতে পারে। তবে কোথা থেকে সার সংগ্রহ করা হচ্ছে, কারা সরবরাহ করছে, কীভাবে পরিবহন হচ্ছে এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত, সেসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তেই বেরিয়ে আসতে হবে। শুধু বহনকারী শ্রমিক বা নৌকার মাঝিকে আটক করলেই সমস্যার মূল সমাধান হবে না। পুরো অর্থনৈতিক চক্রের অর্থের উৎস, সরবরাহব্যবস্থা, মজুদস্থল, পরিবহন এবং চূড়ান্ত গন্তব্য শনাক্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী দরিদ্র মানুষকে অপরাধী চক্র ব্যবহার করছে কি না, সেটিও তদন্তে গুরুত্ব পাওয়া দরকার। সারের সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গুদামে পর্যাপ্ত সার থাকলেই কৃষকের সমস্যা সমাধান হয় না। উৎপাদন বা আমদানি থেকে শুরু করে সরকারি গুদাম, জেলা পর্যায়, ডিলার এবং খুচরা বিক্রেতার হাত ঘুরে সার কৃষকের জমিতে পৌঁছায়। এই দীর্ঘ ব্যবস্থার কোনো স্তরে অনিয়ম হলে জাতীয় মজুদের হিসাব আর মাঠের বাস্তবতা এক হয়ে থাকে না। এ কারণেই কোন ডিলার কত সার বরাদ্দ পেলেন, কত উত্তোলন করলেন, কত বিক্রি করলেন এবং কত অবশিষ্ট রইল, তার ডিজিটাল হিসাব থাকা প্রয়োজন। কৃষকের কৃষি কার্ড, জমির পরিমাণ ও ফসলের ধরন বিবেচনায় নিয়ে বিক্রির তথ্য সংরক্ষণ করা গেলে অস্বাভাবিক লেনদেন শনাক্ত করা সহজ হবে। কৃষককে বিক্রির সময় রসিদ দেওয়া এবং নির্ধারিত মূল্য প্রকাশ্যে টানিয়ে রাখা দরকার। একই সঙ্গে কৃষকের জন্য বরাদ্দ এই মূল্যবান
কৃষি উপকরণ যেন কোনোভাবেই অবৈধ পথে না যায়, তা নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনের নয়, সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, ডিলার ও নাগরিকদেরও নৈতিক দায়িত্ব। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ১ হাজার ১০৫ জন মূল ডিলার ও ৩১ হাজার ৬০০ জন খুচরা ডিলার রয়েছে এবং ৬৪ জেলায় সার মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। এই বিশাল বিতরণব্যবস্থাকে কার্যকর নজরদারির আওতায় এনে সারের অপচয় ও পাচার রোধ করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
সীমান্ত ও উপকূলীয় এলাকায় নজরদারির বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। স্থলপথে নজরদারি বাড়লে পাচারকারীরা নদী বা নৌপথ ব্যবহার করতে পারে। তাই বিজিবি, কোস্ট গার্ড, পুলিশ, কৃষি বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় বাড়ানো প্রয়োজন। কোথায় অস্বাভাবিক পরিমাণ সার যাচ্ছে, কোন ডিলারের বিক্রির পরিমাণ স্থানীয় চাহিদার সঙ্গে মিলছে না, কোন এলাকায় বারবার সার জব্দ হচ্ছে, এসব তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করা গেলে ঝুঁকিপূর্ণ প্রবাহ দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী কৃষকদের সচেতন করতে হবে। সারের নিরাপত্তার সঙ্গে দেশের উৎপাদন সক্ষমতার প্রশ্নও জড়িত। বাংলাদেশে সারের বড় অংশ আমদানিনির্ভর এবং ইউরিয়া উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ। গ্যাসের সীমাবদ্ধতা, পুরনো কারখানা ও উৎপাদন ব্যাহত হলে দেশীয় উৎপাদন কমে আমদানির প্রয়োজন বাড়ে। এ কারণেই ৯ সেপ্টেম্বর ১ লাখ ১০ হাজার এবং ১৬ সেপ্টেম্বর আরও ১০ লাখ ৭৫ হাজার টন সার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত মজুদ জরুরি, কিন্তু জনগণের অর্থে ভর্তুকি দিয়ে আমদানি করা সার পাচার হয়ে তার বিনিময়ে মরণফাঁদ মাদক দেশে প্রবেশ করলে তা কাম্য নয়। তাই শুধু আমদানি নয়, উৎপাদন, গ্যাস সরবরাহ, আমদানি পরিকল্পনা, গুদামজাতকরণ, পরিবহন ও বিতরণকে সমন্বিত ব্যবস্থায় আনতে হবে। মাটির প্রয়োজন অনুযায়ী সুষম সার ব্যবহারে কৃষকদের সচেতন করতে হবে। সারের অপচয় কমলে উৎপাদন ব্যয় ও জাতীয় সম্পদের ওপর চাপ কমবে। কৃষি, জ্বালানি ও শিল্পকে তাই পরস্পরনির্ভর অর্থনৈতিক শৃঙ্খল হিসেবে দেখতে হবে।
সার কৃষকের ক্ষুধা মেটানোর উপকরণ, আর মাদক মানুষের জীবন ধ্বংসের হাতিয়ার। এই মৌলিক সত্যটি সামাজিক সচেতনতার কেন্দ্রে থাকা উচিত। কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার অন্যত্র বিক্রি করা, কৃত্রিম সংকট তৈরি করা, অবৈধ পথে সার পাচার করা কিংবা মাদক চোরাচালানে সহযোগিতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ‘সার যাচ্ছে, মাদক আসছে’ অভিযোগের প্রকৃত সত্য দ্রুত উদ্ঘাটন করা জরুরি। অভিযোগ সত্য হলে চোরাচালানের পুরো চক্র ভেঙে দিতে হবে, আর সত্য না হলে স্পষ্টভাবে তা জানাতে হবে। কৃষকের ঘরে অন্নের নিশ্চয়তা ও আমাদের সন্তানদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও নাগরিক সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। রাষ্ট্রকে পর্যাপ্ত মজুদ, সঠিক বণ্টন, ডিজিটাল ট্র্যাকিং, সীমান্ত নজরদারি ও আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে আর নাগরিকদের সততা, নৈতিকতা ও সচেতনতার সঙ্গে সহযোগিতা করতে হবে। কৃষকের জমিতে সার পৌঁছানো মানে শুধু একটি বস্তা সার পৌঁছানো নয়, একটি পরিবারের খাদ্য ও আয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আর মাদক ঠেকানো মানে শুধু একটি চালান আটকানো নয়, একটি পরিবার, একটি প্রজন্ম এবং একটি সমাজকে রক্ষা করা। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত, কৃষকের সার কৃষকের জমিতে যাবে আর মাদকের চালান যাতে কোনোভাবেই দেশে ঢুকতে না পারে।
লেখক : কৃষিবিদ, প্রাবন্ধিক, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন।
rssarker69@gmail.com