ধনী-গরিবের ভিন্নতায় আল্লাহর হেকমত

মহান আল্লাহ সবকিছু অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সৃষ্টি করেছেন। তার প্রতিটি সৃষ্টির মাঝে রয়েছে বিশেষ হেকমত। আসমান ও জমিনের প্রতিটি অণু তার পরিপূর্ণ জ্ঞান, রহমত, ক্ষমতা ও প্রজ্ঞার সাক্ষ্য বহন করে। বিশুদ্ধ বুদ্ধি ও সহজাত স্বভাব তাই প্রমাণ করে, যা কোরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত অর্থাৎ মহান আল্লাহর প্রতিটি কাজই সুগভীর প্রজ্ঞা থেকে নিঃসৃত।

মহান আল্লাহর প্রজ্ঞার একটি দিক হলো, তিনি বান্দাদের শারীরিক গঠন, চরিত্র, বুদ্ধি, উপলব্ধি, রিজিক ও জীবনযাপনের ক্ষেত্রে একে অন্যের থেকে আলাদা করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি মানুষকে পরস্পরের কাজে নিয়োজিত করেছেন। কারণ একে অন্যের প্রয়োজনেই মানুষ পরস্পরের সহযোগী হয়।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা কি তোমার রবের রহমত বণ্টন করে? আমিই তাদের মধ্যে পার্থিব জীবনের জীবিকা বণ্টন করেছি এবং তাদের একজনকে অন্যজনের ওপর বিভিন্ন মর্যাদায় উন্নীত করেছি, যাতে তারা একে অন্যের দ্বারা কাজ করিয়ে নিতে পারে।’ (সুরা জুখরুফ ৩২)

সৃষ্টির মধ্যে এই পার্থক্যও আল্লাহর প্রজ্ঞার অংশ। তিনি যদি সব সৃষ্টিকে সমান করে দিতেন, তাহলে তার অনুগ্রহ, নেয়ামত ও রহমতের মর্যাদা উপলব্ধি করা যেত না। গরিবদের প্রতি দান ও সদাচরণের মতো ইবাদতগুলোও অকার্যকর হয়ে পড়ত। অথচ এসব ইবাদত আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়।

সব মানুষ যদি ধনী হতো, তাহলে ধনসম্পদের নেয়ামতের মর্যাদা এবং এর জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের গুরুত্ব উপলব্ধি করা যেত না। আল্লাহই রিজিকদাতা। তিনি কখনো রিজিক সংকুচিত করেন, কখনো প্রশস্ত করেন। তিনি তার সৃষ্টির মধ্যে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী সবকিছু পরিচালনা করেন। তিনি যদি মানুষকে তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত রিজিক দিতেন, তাহলে তা তাদের সীমালঙ্ঘন ও অবাধ্যতার দিকে ঠেলে দিত।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ যদি তার সব বান্দার জন্য রিজিক প্রশস্ত করে দিতেন, তাহলে তারা পৃথিবীতে অবশ্যই সীমালঙ্ঘন করত। কিন্তু তিনি তার ইচ্ছা অনুযায়ী পরিমিতভাবে রিজিক অবতীর্ণ করেন। নিশ্চয়ই তিনি তার বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক অবগত, সর্বদ্রষ্টা।’ (সুরা শুরা ২৭)

আল্লাহ তার বান্দাদের জন্য যে রিজিক নির্ধারণ করেন, তাই তাদের দেন। তাদের কল্যাণ কোনটিতে রয়েছে, তা তিনি সবচেয়ে ভালো জানেন। তার এই বণ্টনের পেছনে রয়েছে গভীর প্রজ্ঞা।

আল্লাহ তার নেয়ামতের মাধ্যমে বান্দাদের পরীক্ষা করেন। আবার পরীক্ষার মধ্য দিয়েও তাদের নেয়ামত দান করেন। এর মাধ্যমে তিনি তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন এবং পাপ মোচন করেন।

নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে বিপদে নিপতিত করেন।’ (সহিহ বুখারি ৫৬৪৫) অর্থাৎ আল্লাহ তাকে বিপদাপদ দিয়ে পরীক্ষা করেন, যাতে সে এর বিনিময়ে সওয়াব লাভ করতে পারে।

দারিদ্র্য ও প্রাচুর্য উভয়ই বান্দাদের পরীক্ষার মাধ্যম। এ দুটির কোনোটি থেকেই মানুষ সম্পূর্ণ মুক্ত নয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি তোমাদের মন্দ ও ভালো উভয়টি দিয়ে পরীক্ষা করি।’ (সুরা আম্বিয়া ৩৫) অর্থাৎ কখনো বিপদাপদ দিয়ে, আবার কখনো নেয়ামত দিয়ে তোমাদের পরীক্ষা করা হয়।

মুমিন বান্দার জন্য আল্লাহর ফয়সালা কখনো দান না করার রূপে এলেও তা প্রকৃতপক্ষে দান। কখনো তা বিপদের রূপে এলেও নেয়ামত। আবার কখনো তা দুর্ভোগের মতো মনে হলেও এর মধ্যে রয়েছে কল্যাণ। কিন্তু বান্দার অজ্ঞতার কারণে সে সাধারণত সেটাকেই দান, নেয়ামত ও সুস্থতা মনে করে, যা তাৎক্ষণিকভাবে তাকে আনন্দ দেয় এবং তার স্বভাবের সঙ্গে মানানসই হয়।

রিজিকের প্রাচুর্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার প্রতি সম্মান ও ভালোবাসার প্রমাণ নয়। একইভাবে দারিদ্র্যও আল্লাহর পক্ষ থেকে অপমান কিংবা অসন্তুষ্টির প্রমাণ নয়। আল্লাহ কখনো এমন কাউকে পার্থিব নেয়ামত দান করেন, যাকে তিনি ভালোবাসেন না। এসব নেয়ামতের মাধ্যমে তিনি তাকে ধীরে ধীরে শাস্তির দিকে এগিয়ে দেন। আবার যাকে তিনি ভালোবাসেন, কখনো তাকে এসব নেয়ামত থেকে বঞ্চিত রাখেন, যাতে তার কাছে ওই বান্দার মর্যাদা কমে না যায়।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের অবস্থা এমন যে, যখন তার রব তাকে পরীক্ষা করেন, তাকে সম্মানিত করেন এবং নেয়ামত দান করেন, তখন সে বলে, ‘আমার রব আমাকে সম্মানিত করেছেন।’ আর যখন তিনি তাকে পরীক্ষা করেন এবং তার রিজিক সংকুচিত করেন, তখন সে বলে, ‘আমার রব আমাকে অপমানিত করেছেন।’ কখনোই নয়।’ (সুরা ফজর ১৫-১৭)

নবী-রাসুলদের মধ্যে অনেকেই ধনী ছিলেন। যেমন হজরত ইবরাহিম, আইয়ুব, দাউদ ও সুলাইমান (আ.)। জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত প্রথম যুগের সাহাবিদের মধ্যেও অনেকে ধনী ছিলেন। যেমন হজরত ওসমান, আবদুর রহমান ইবনে আউফ, তালহা ও যুবাইর (রা.)।

আবার নবী-রাসুলদের মধ্যে দরিদ্রও ছিলেন। যেমন হজরত ঈসা ও ইয়াহইয়া (আ.)। মহান সাহাবিদের মধ্যেও দরিদ্র ব্যক্তি ছিলেন। যেমন হজরত আবু জর, মুসআব ইবনে ওমাইর ও সালমান ফারসি (রা.)।

আবার এমন ব্যক্তিও ছিলেন, যাদের জীবনে কখনো প্রাচুর্য এসেছে, আবার কখনো দারিদ্র্য এসেছে। আমাদের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.), আবু বকর ও ওমর (রা.) তাদের মধ্যে অন্যতম।

আল্লাহ দারিদ্র্য কিংবা প্রাচুর্যের কারণে কাউকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেননি। বরং তিনি শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন তাকওয়ার ভিত্তিতে। যার ইমান ও তাকওয়া বেশি, সেই শ্রেষ্ঠ। আর এ ক্ষেত্রে দুজন সমান হলে তাদের মর্যাদাও সমান।

১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার, মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন মুফতি আতিকুর রহমান