ঝুলে আছে বেসরকারি জ্বালানি আমদানির নীতিমালা

বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক সংকট ও মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে তীব্র অনিশ্চয়তায় পড়েছে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া এবং বাব আল মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ার পর দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। একই সঙ্গে প্রশ্ন ওঠে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সক্ষমতা নিয়েও। এমন পরিস্থিতিতে দেশে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বিতরণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির খসড়া নীতিমালা তৈরির নির্দেশও দেওয়া হয়।

তবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অনাগ্রহ ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় খসড়া নীতিমালা প্রণয়নের প্রক্রিয়া শুরুর আগেই থেমে গেছে। চার দিনের মধ্যে খসড়া নীতিমালা করে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও এক মাসেও নীতিমালা তৈরি করতে পারেনি বিপিসি। বেসরকারি পর্যায়ে তেল আমদানির বিষয়টি নিয়ে বিপিসির আগ্রহও কম বলে জানা গেছে। ফলে দেশের জ্বালানির চাহিদা মেটানো, রিজার্ভের ওপর চাপ কমানো এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের করা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদার পুরোটাই আমদানি করা হয়। বর্তমানে জ্বালানি তেলের একক ক্রেতা ও বিক্রেতা (আমদানি, বিতরণ ও বিপণন) হচ্ছে বিপিসি। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে চুক্তির মাধ্যমে অপরিশোধিত তেলের পুরোটা আমদানি করা হয়। আর পরিশোধিত জ্বালানি তেল সাতটি দেশ থেকে আমদানি করা হয়। বিভিন্ন দেশের সরকারি-বেসরকারি কোম্পানি নির্দিষ্ট চুক্তি ও দরপত্রের মাধ্যমে চাহিদা অনুযায়ী তেল বিপিসিকে সরবরাহ করে। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ইরান যুদ্ধ শুরু হলে দেশে সরাসরি এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। যুদ্ধ শুরুর পরপরই হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া এবং পরে বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে। এ ছাড়া সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্বালানির ডিপোগুলোর ব্যাপক ক্ষতির কারণে জ্বালানি তেল আমদানি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। দেশে জ্বালানি তেলের সংকটও দেখা দেয়। এমনকি অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের অভাবে দেশের একমাত্র শোধানাগার কয়েকদিন বন্ধও ছিল। পরে সরকারের ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও শঙ্কা কাটেনি।

ভূ-রাজনৈতিক সংকট ও মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল এখন কৌশলগত পণ্যে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে বিশ্ব বাজারে জ্বালানি পণ্যটির দাম ক্রমেই বাড়ছে। একইসঙ্গে ভেঙে পড়েছে সরবরাহ ব্যবস্থা। বাংলাদেশে এরই মধ্যে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। জ্বালানি আমদনি করতে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সহায়তা নিতে হয়েছে। এই অবস্থায় দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে দেশেও বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।

গত ৬ আগস্ট জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ থেকে বিপিসির চেয়ারম্যানকে ‘বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন নীতিমালা, ২০২৬’-এর খসড়া তৈরির নির্দেশনা দিয়ে চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে বলা হয়, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণণের জন্য একটি নীতিমাল করা প্রয়োজন। এজন্য চিঠিতে ১০ আগস্টের মধ্যে খসড়া জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়; কিন্তু খসড়া নীতিমালা তৈরির নির্দিষ্ট সময়ের এক মাসের বেশি সময় পার হলেও তা জমা দিতে পারেনি বিপিসি। এ কারণে সরকারি সিদ্ধান্তে নীতিমালা তৈরি এবং বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি ও বিতরণের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি এখনো ঝুলে আছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অনাগ্রহ ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় খসড়া নীতিমালা প্রণয়নের প্রক্রিয়া শুরুর আগেই থমকে গেছে।

এ বিষয়ে জানতে বিপিসির চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। এমনকি তার ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপে পরিচয় দিয়ে প্রশ্ন লিখে পাঠালেও সাড়া মেলেনি।

বিপিসির এক কর্মকর্তা জানান, সংশ্লিষ্টদের মতামত নিয়ে একটি নীতিমালা করা হবে। তবে নীতিমালা বিপিসি তৈরি করবে নাকি কোনো তৃতীয় পক্ষকে দিয়ে করানো হবে, তা নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০১৪ সালেও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য ফার্নেস অয়েল আমদানির বিরোধিতা করেছিল বিপিসি। পরবর্তীতে সরকারের চাপে বাধ্য হয়ে অনুমতি দেওয়ায় বর্তমান গ্যাস সংকটের মধ্যেও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালানো সম্ভব হচ্ছে এবং লোডশেডিং অনেক কম হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, এবারও বিপিসি বিষয়টি নিয়ে চুপ করে আছে। কারণ বেসরকারি খাত যুক্ত হলে বিপিসির তেল আমদানির পুরোনো সিন্ডিকেট ভেঙে পড়বে। নিজেদের স্বার্থে বিপিসির কর্মকর্তারা বেসরকারি পর্যায়ে প্রতিযোগিতায় যেতে চান না। অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের আমলে বিপিসির মাধ্যমে জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল এক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে। বিপিসিতে ১১টি তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে ৬টিরই স্থানীয় এজেন্ট তার প্রতিষ্ঠান। এমনকি বিপিসির সাবেক অনেক কর্মকর্তা বিশেষ করে তেল ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িতদের এই অফিসে নিয়োগ দেওয়া হয়।

জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, হরমুজ প্রণালি ঘিরে সংকটের সময় বিপিসির মজুত সক্ষমতার দুর্বলতা দৃশ্যমান হয়েছিল। এ ছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন থাকায় বিপিসির পক্ষে এককভাবে পর্যাপ্ত মজুত গড়ে তোলা কঠিন। এখানে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের যুক্ত করা গেলে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ কমবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা সহজ হবে। বোতল গ্যাস বা এলপিজি নিয়ে সরকার কোনো আর্থিক চাপ নেই। এমনকি যুদ্ধের কারণে এলপিজির দাম বৃদ্ধির পরও প্রকৃত সংকট হয়নি, কৃত্রিম সংকট হয়েছিল।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এরই মধ্যে জ্বালানি তেল আমদানি ও পরিশোধনে আগ্রহ দেখিয়েছে মেঘনা গ্রুপ, ইস্ট কোস্ট গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপসহ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া নীতিমালা বিষয়ে আরও কয়েকটি দেশি-বিদেশি কোম্পানি খোঁজখবর নিচ্ছে বলেও জানা গেছে। সরকার বর্তমানে দুটি ফর্মুলা নিয়ে ভাবছে—তেল আমদানির বড় অংশ বিপিসির হাতে রেখে এক-তৃতীয়াংশ বেসরকারি খাতকে দেওয়া অথবা এলপিজির মতো নিজস্ব সরবরাহ চেইনের মাধ্যমে উন্মুক্ত বিপণনের সুযোগ দেওয়া।

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বেসরকারি পর্যায়ে জ্বালানি আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং বিক্রয় নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে জন্য বিপিসিকে একটি খসড়া নীতিমালা তৈরি করে জমা দেওয়ার জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হয়। কিন্তু এখনো তাদের কাছ থেকে খসড়া নীতিমালা পাওয়া যায়নি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বেসরকারি পর্যায়ে জ্বালানি তেল আমদানির অনুমতি দিলে প্রতিযোগিতা বাড়বে। দেশে বিনিয়োগ হবে, রিজার্ভের ওপর চাপ কমবে। শক্তিশালী অর্থনীতির জন্য বেসরকারি বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করে তদারকি ও জবাবদিহির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তারা। তাদের মতে, এখন যে নিকট ভবিষ্যতের মহামন্দার কথা বলা হচ্ছে, তার আঁচ থেকে বাঁচতে হলে যে কোনো রাষ্ট্রের ‘জীবন রক্ষাকারী পণ্য’ জ্বালানি তেল আমদানিতে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়া দরকার। এতে সরকারের ওপর চাপ কমবে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, বর্তমানে বিপিসির পরিধি এতটা বড় হয়ে গেছে যে, তাদের একার পক্ষে সব সেবা নিখুঁতভাবে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে এবং এতে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রাইভেট সেক্টর বা বেসরকারি খাতকে যুক্ত করা যেতে পারে। তবে হুট করে পুরো বাজার উন্মুক্ত না করে কোনো একটি নির্দিষ্ট জ্বালানি বা নির্দিষ্ট অংশের ওপর পরীক্ষামূলক কাজ শুরু করে তাদের দক্ষতা যাচাই করা উচিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ভোক্তারা এর থেকে প্রকৃত সুবিধা পাচ্ছেন কি না সেটা দেখা।

তিনি বলেন, প্রতিযোগিতা তৈরি বা নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ কমার ভয়ে বিপিসি হয়তো ইতস্তত করছে। এর আগে বিদ্যুৎ খাতেও (পিডিবি) বেসরকারি খাতকে আনার সময় একই ধরনের গড়িমসি দেখা গিয়েছিল। ভারত যদি ঝুঁকি সামলে সফল হতে পারে, তবে বাংলাদেশেও একটি ভালো রিপোর্টের ভিত্তিতে এটি চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে।

ড. ইজাজ হোসেন বলেন, বিদ্যমান পরিবহন ব্যবস্থায় তেল চুরির মতো যেসব অনিয়ম রয়েছে, বেসরকারি খাত যুক্ত হলে ব্যবসায়ীরা নিজস্ব স্বার্থেই তা ঠেকাবে। তবে তাদের ক্ষেত্রে তেলের ভেজাল রোধ এবং যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থা শুরুতেই সমাধান করতে হবে। নীতিমালায় এমন সুযোগও রাখতে হবে যেন পরীক্ষামূলক পদক্ষেপে ভালো ফল না এলে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন বা চুক্তি বাতিল করা যায়; স্থায়ী কোনো সুযোগ দেওয়া ঠিক হবে না।

এদিকে বাংলাদেশের নীতি প্রক্রিয়াকরণ যেখানে স্থবির, সেখানে দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান তিনটি দেশ- ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল আমদানির অনুমতি রয়েছে। ভারতে পেট্রোলিয়াম আমদানিতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ অত্যন্ত শক্তিশালী।

বিষয়টি নিয়ে সরকারের অবস্থান জানতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে একাধিকবার চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। কয়েক দিন ধরে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সচিব মো. জিয়াউল হকের সরকারি মোবাইল ফোন নম্বরের একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। এমনকি প্রশ্ন লিখে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দেওয়ার পরও সাড়া মেলেনি। পরবর্তীতে একান্ত সচিবের মাধ্যমে মেসেজ পাঠানোর পর সচিব এ বিষয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি সেনসেটিভ হওয়ায় হয়তো কেউ কথা বলতে চাচ্ছেন না। তিনি বলেন, মূলত বেসরকারি কয়েকটি কোম্পানি থেকে আগ্রহ দেখানোর পর অনুমোদনের বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়। বেসরকারি পর্যায়ে জ্বালানি তেল আমদানি ও বিতরণে বেসরকারি খাত যুক্ত হলে সরকারের ওপর থেকে ভর্তুকির বোঝা কমবে এবং এটি নীতিগতভাবে ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে। তবে তার জন্য আগে একটি স্পষ্ট নীতিমালা, সঠিক গাইডলাইন এবং সরকারের নিজস্ব শক্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা আবশ্যক। পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও মেকানিজম ছাড়া বেসরকারি খাতকে আমদানির সুযোগ দিলে লাভের চেয়ে ক্ষতির পরিমাণ বেশি হবে।