রাজধানীর মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে নিরাপত্তাকর্মীদের বেঁধে রেখে ভাঙচুর ও লুটপাটের পর পুরো স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে মুখোশ পরা দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ওই স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে ঢুকে ভাঙচুর চালায়। পরে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে একটি পাকা ও তিনটি আধা পাকা ভবনসহ স্থাপনাটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার দাবি করেছেন, এ ঘটনায় এক কোটি টাকার বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ ঘটনায় তিনি বাদী হয়ে শাহ আলী থানায় মামলা করেছেন।
মামলার এজাহার ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে ২০০ থেকে ২৫০ জন মুখোশধারী ব্যক্তি দা, হাতুড়ি ও লাঠিসোঁটা নিয়ে সীমানাপ্রাচীর টপকে কেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করে। সেখানে থাকা দুই নিরাপত্তাকর্মী আন্দ্রিয় সরকার ও আবদুল হাইকে মারধর করে একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। এরপর পুরো স্থাপনার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়।
একপর্যায়ে মূল ফটক ভেঙে ভবন ভাঙার ভারী যন্ত্রপাতি আনা হয়। পরে কেন্দ্রের সব কটি কক্ষে ভাঙচুর চালানো হয়। মামলার এজাহারে হানিফ মিয়া (৫০) নামে একজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য।
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, হামলাকারীরা সরকারি ইপিআইয়ের টিকা, টিকা প্রদানের সরকারি রেজিস্টার ও নথি, পরিবার পরিকল্পনার বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও উপকরণ, ওষুধ ও ভ্যাকসিন, দুটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, একটি জেনারেটর, দুটি কম্পিউটার, একটি প্রিন্টার, তিনটি ফ্রিজ, তিনটি এসি, তিনটি স্টিলের আলমারি, সিসিটিভি ক্যামেরা, চেয়ার-টেবিলসহ বিভিন্ন আসবাব নিয়ে যায়।
যাওয়ার আগে দুর্বৃত্তরা দেয়ালে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যানার টানিয়ে দেয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুক্রবার দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, মিরপুর-১ নম্বরের কাছাকাছি মুক্তিযোদ্ধা মার্কেট ও ফেয়ার প্লাজা মার্কেটের মাঝের অংশে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি টিকাদান কেন্দ্রটি অবস্থিত। কেন্দ্রের মূল ফটক তালাবদ্ধ। ফটকের ওপরে থাকা সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ থেকে বরাদ্দ পাওয়া ও রেজিস্ট্রি মূলে এই প্লটের মালিক সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড। জমির পরিমাণ ১০ কাঠা।’
পাশের একটি গলি দিয়ে কেন্দ্রের পেছনের অংশে গিয়ে দেখা যায়, সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ফেলা হয়েছে। পাশাপাশি থাকা তিনটি পাকা ও আধা পাকা ভবনও ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে পলেস্তারা, বাঁশ, খুঁটিসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী পড়ে আছে। ভবনের কক্ষগুলোর দরজা-জানালা খুলে ফেলা হয়েছে। কয়েকটি কক্ষে দরজা থাকলেও সেগুলোতে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়।
কক্ষের ভেতরে থাকা আসবাব, ওষুধ, ভ্যাকসিন ও ক্যাপসুল মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখা যায়। স্থাপনার এক কোণে থাকা বড় একটি আমগাছেরও একাধিক ডাল কেটে ফেলা হয়েছে। ধ্বংসস্তূপ দেখতে সেখানে উৎসুক মানুষ ভিড় করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা, দোকানি ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জায়গাটি দখল নিয়ে স্থানীয় বিএনপির দুটি পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ রয়েছে। জায়গাটি নিয়ে মামলাও হয়েছিল। ফলে এত দিন কেউ দখল নিতে পারেনি।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ২০২৬ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর ব্যানারে আবারও জায়গাটি দখলের চেষ্টা শুরু হয়। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার রাতে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি ভেঙে জায়গাটি দখলে নেওয়া হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ওই পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ফেরদৌসী আহমেদ। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ভাঙচুরের ঘটনা তিনিও শুনেছেন। ব্যস্ততার কারণে ঘটনাস্থলে যেতে পারেননি। সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির সঙ্গে তার নাম থাকলেও ভাঙচুরের সঙ্গে তিনি জড়িত নন। যেহেতু ভাঙচুরের মামলা হয়েছে, আইনগতভাবেই পুলিশ ঘটনার তদন্ত করে দেখুক।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার ১৯৭৪ সালে মিরপুরের সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের মাতৃ ও শিশুসেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে কার্যক্রম শুরু করে। তৎকালীন সুইডিশ সেভ দ্য চিলড্রেনের প্রতিষ্ঠান রাড্ডা বার্নেনের উদ্যোগে কেন্দ্রটির যাত্রা শুরু হয়।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা, গর্ভকালীন ও প্রসবোত্তর সেবা, শিশুদের টিকাদান, শিশু স্বাস্থ্যসেবা এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্য কার্যক্রম পরিচালনা করে। কেন্দ্রটির তিনটি স্থায়ী ক্লিনিকে রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্যাথলজি, বায়োকেমিস্ট্রি ও হেমাটোলজিসহ বিভিন্ন পরীক্ষার সুবিধা রয়েছে।
মিরপুর-১০ এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কেন্দ্র হলেও মিরপুর-১, বাউনিয়াবাদ, উত্তরা, ভাসানটেক বস্তি ও পুরান ঢাকায় এর সেবা কার্যক্রম রয়েছে।
নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার বলেন, রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার প্রায় ৫০ বছর ধরে সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে দরিদ্র ও অসহায় নারী-শিশুদের বিনা মূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে আসছে। এটি এলাকার হাজারো মানুষের স্বাস্থ্যসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। সরকারের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে তারা প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করে আসছেন।
তিনি আরও জানান, আগামীকাল থেকে সরকারি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা ছিল। এর আগেই প্রতিষ্ঠানটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, হামলা ও ভাঙচুরের সময় তারা পুলিশকে খবর দিয়েছিলেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও স্থাপনাটি রক্ষা করতে পারেনি।
শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলম গণমাধ্যমকে বলেন, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় মামলা হয়েছে। ঘটনার তদন্ত করে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।