যৌন নির্যাতন

শিশুকে সরব হতে সাহস দিন 

আমাদের সমাজে একজন শিশু বা শিক্ষার্থী কোথাও কি পুরোপুরি নিরাপদ? অপরিচিত লোকের কাছে তো নয়ই। নিজের ঘর বলে যা সে জানে, বেড়ে ওঠার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এমনকি আত্মীয়স্বজন ও পরিবারের মানুষ হিসেবে যাদের নির্ভরতার স্থান বা ব্যক্তি হিসেবে সে মনে করে, তাদের সবার কাছে কি সে নিরাপদ? প্রশ্নগুলোর জবাবে একশব্দে ‘হ্যাঁ’ বলা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, শিশু ও শিক্ষার্থীরা আজকাল ঘরে-বাইরে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এমন অপরাধের ব্যাপকতা বেশ বেড়েছে।

দেশ রূপান্তরে গতকাল শুক্রবার প্রকাশিত ‘রক্ষকই যেখানে ভক্ষক’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আত্মীয়স্বজন, সাধারণ ও ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এমনকি অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও শিশুরা যৌন নির্যাতনের অভিযোগ করছে। এমন নির্যাতনের ঘটনা যে দু-একটি বা কালেভদ্রে ঘটছে, তা নয়। শত শত শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে; যাদের মধ্যে একটি বড় অংশ শিক্ষকের লালসার শিকার।

আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় শিশুরা সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে। সাধারণভাবে মেয়েশিশুদের ঝুঁকি বেশি মনে করা হয়; তবে ছেলেশিশুরাও নিরাপদ নেই। সমস্যার একটি দিক হলো অনেক শিশু তার সঙ্গে বাজে স্পর্শ, ধর্ষণ ও বলাৎকারের মতো মারাত্মক অন্যায়-অপরাধ করা হচ্ছে, তা বোঝার বয়সই হয়তো হয়নি। অনেকে এ সম্পর্কে ধারণা না থাকায় বোঝে না। তবে সমস্যার বড় দিকটি হলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব ঘটনা ঘটায় প্রতিবেশী, শিক্ষক, আত্মীয়, এমনকি পরিবারের সদস্যসহ শিশুর বিশ্বাসের মানুষদের কেউ কেউ। সমাজে শিশুর বেড়ে ওঠার জায়গা বাড়ি, স্কুল, মক্তব-মাদ্রাসা, ধর্মীয় উপাসনালয়েই যদি নিরাপত্তা না থাকে, তাহলে তারা যাবে কোথায়?

আরেকটি সমস্যা হলো যেসব শিশু তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায়-অপরাধ বোঝে, কে দায়ী চিহ্নিত করতে পারে, তাদের বড় অংশ থাকে নীরব বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভয় ও লজ্জায়; বহু ক্ষেত্রে সামাজিক চাপ,  পারিবারের ভেতরকার সম্পর্ক, অর্থনৈতিক প্রভাব ও অপরাধীর প্রভাবের কারণে। ভুক্তভোগীদের এই নীরব থাকার সুযোগে অপরাধী কখনো একা, কখনো দলবদ্ধভাবে যৌন নির্যাতনের মতো গুরুতর অপরাধ চালিয়ে যেতে থাকে। রাজধানীর খ্যাতনামা একটি কলেজের বেপরোয়া এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রলোভনে কমপক্ষে ২০ জন মেয়ে-শিক্ষার্থীকে তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে।

একসময় এসব অপরাধ যেনতেন উপায়ে ধামাচাপা দেওয়াই রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আজকাল আগে হোক, কিংবা পরে, কিছু অভিযোগ প্রকাশ্যে আসছে। ইউনিসেফ, স্থানীয় সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষণা অনুযায়ী, শিশু ও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে সংঘটিত যৌন সহিংসতা ব্যাপকভাবে ঘটছে। বিশেষ করে শিশুদের সুরক্ষা ও বিকাশের জন্য নির্ধারিত স্থানেও যৌন সহিংসতার ঘটনা ঘটেই চলেছে। আমরা এতে উদ্বিগ্ন।

আমরা মনে করি, পরিবারে সন্তানকে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের তাদের ‘শরীরের সীমা’ সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে; শেখাতে হবে কোথায় কোন মানুষের কোন স্পর্শ স্নেহের ও নিরাপদ এবং কোন ধরনের স্পর্শ বিপজ্জনক। ‘শরীরের সীমা’ লঙ্ঘন হওয়ার বিষয়ে তাকে ধারণা দিতে হবে। কেউ তাকে ভয় দেখালে বা কোনো কিছু গোপন রাখতে বললে অবশ্যই বাসায় মা-বাবাকে জানানোর সাহস তাকে দিতে হবে। 

প্রতিটি পরিবারে যেকোনো বয়সের শিশু ও শিক্ষার্থী অস্বাভাবিক আচরণ করলে, আত্মীয়স্বজন, পরিচিত-অপরিচিত নির্বিশেষে কোনো ব্যক্তির কাছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে অনীহা প্রকাশ করলে, তা সহানুভূতির সঙ্গে নিতে হবে। বাবা-মা ও ভাইবোনকে ছোটদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলতে হবে। তাদের কথাকে গুরুত্ব দিতে হবে, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। 

শিশুদের সুরক্ষার ব্যবস্থা রাষ্ট্রীয়ভাবে কাগজে-কলমে কম নেই। কিন্তু সমস্যা বাস্তবায়নে। শিশুদের সুরক্ষার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি সেল গঠন বাধ্যতামূলক। আমরা প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে দ্রুত এমন সেল গঠন এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে শিশু ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ শোনার ব্যবস্থা চাই। একই সঙ্গে আমরা প্রতিটি যৌন সহিংসতার ঘটনার অভিযোগকারীর সুরক্ষা, নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণিত অভিযোগে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করারও দাবি জানাই।