ছাদখোলা চান্দের গাড়ি সাত লেয়ারের চা

‘চলে আমার চান্দের গাড়ি/যাইবো সোনা বন্ধুর বাড়ি/বন্ধু আমার রসের হাঁড়ি/ভাবের তরী বন্দনা/এমন বসন্তে বন্ধু আইলো না।’ উপরোক্ত কলিগুলো গীতিকার ও সুরকার তরুণ শিল্পী তুহিন কান্তি দাসের রচিত একটি জনপ্রিয় গান। গানটির শিরোনাম ‘চান্দের গাড়ি’। প্রায় দুই দশকের অধিককাল ধরে চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত মৌলভীবাজার জেলা পর্যটন নগরী নামে দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদের কাছে অন্যতম ভালো লাগার স্থান হলো জেলার শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলা। যেখানে আঁকা-বাঁকা পাহাড়ি পথ ভ্রমণে প্রয়োজনীয় যান হলো বাহারি চান্দের গাড়ি। শ্রীমঙ্গলে প্রায় তিন শতাধিক চান্দের গাড়ির অধিকাংশই লাল রঙের। তবে হলুদ, সাদা, কালো, নীলসহ অনেক রঙের গাড়িও রয়েছে।

কেন বা কীভাবে চান্দের গাড়ি নামে পরিচিত হলো, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়নি। পাহাড়ি জনপদের বাসিন্দাদের মতে, ফোর হুইল গিয়ারসমৃদ্ধ এ গাড়িগুলো যেহেতু পাহাড়ি উঁচু-নিচু টিলা, মেঠোপথ, কাদা মাড়িয়ে চলতে পারে, সেহেতু এ গাড়ি নিয়ে চান্দেও (চাঁদে) যাওয়া সম্ভব। তাই গাড়িটির নাম দেওয়া হয় চান্দের গাড়ি।

সপ্তাহান্তে শুক্র ও শনিবার এবং ঈদ-পূজাসহ সরকারি অন্যান্য ছুটির দিনগুলোয় শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জসহ আশপাশের উপজেলার পর্যটন স্পটগুলো ভ্রমণে পর্যটকের ঢল নামে। স্পটগুলোর অধিকাংশই পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত। ফলে উঁচু-নিচু আঁকা-বাঁকা পাহাড়ি ও গ্রামের কাদাযুক্ত মেঠোপথে নিরাপদ চলাচলে স্বাভাবিকভাবেই প্রয়োজন হয় চান্দের গাড়ি নামক জিপ গাড়ির। এমন বন্ধুর পথে ফোর হুইল গিয়ারযুক্ত এই গাড়িগুলো চলাচল করতে পারে নির্বিঘেœ।

গাড়িগুলোয় আসন থাকে সাধারণত ৮ থেকে ১০ জনের। তবে আসনে বসে ও দাঁড়িয়ে ভ্রমণ করতে পারেন ১৫ থেকে ২০ জন পর্যন্ত।

জয়পুরহাটের কলেজ শিক্ষার্থী আল আমিন হোসেনসহ আট বন্ধু গত রবিবার এসেছেন শ্রীমঙ্গলে। তিনি গত সোমবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চান্দের গাড়ি ভাড়া করে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বেশ কয়েকটি স্থানে গিয়েছি, পান করেছি সাত লেয়ারের চা। সবকিছু মাড়িয়ে ছাদখোলা চান্দের গাড়িতে ভ্রমণের মজাটাই আলাদা।’

গত বছরও শ্রীমঙ্গল এসেছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখানকার অবারিত সবুজ আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে আমি এতই বিমোহিত যে, আমার বন্ধুদের সঙ্গে শ্রীমঙ্গলের কথা প্রায়ই বর্ণনা করি।’

কী দেখা যাবে?

চান্দের গাড়িতে করে সারাদিন দেখা যাবে কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, লাউয়াছড়া খাসিয়া পানপুঞ্জি, মাগুরছড়া পরিত্যক্ত গ্যাসকূপ, মাধবপুর লেক, মণিপুরীপাড়া, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর স্মৃতিসৌধ, শ্রীমঙ্গলের অবারিত চা বাগান, রাবার বাগান, বিটিআরআই, বধ্যভূমি একাত্তর, নিরালা খাসিয়া পানপুঞ্জি, বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন, বাইক্কা বিল ইত্যাদি পর্যটন স্পট।

ভাড়া কেমন?

শ্রীমঙ্গল ও আশপাশ উপজেলার পর্যটন স্পটগুলো ভ্রমণে সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রতিটি চান্দের গাড়ের ভাড়া ৫ হাজার থেকে সাড়ে ৬ হাজার টাকার মধ্যে। শ্রীমঙ্গল থেকে জেলার অন্যান্য উপজেলায় গেলে ওই সময়ের জন্য ভাড়া নেবে সাড়ে ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকার মধ্যে। পর্যটন মৌসুম শীতকালে এবং সরকারি ছুটির দিনে যেহেতু পর্যটকের ঢল নামে সেহেতু ওই সময়ের যে ভাড়া থাকে, অন্য সময়ে সে ভাড়া থেকে কিছুটা কমে পাওয়া যায় চান্দের গাড়িগুলো।

কোথায় পাওয়া যায় চান্দের গাড়ি?

শ্রীমঙ্গল শহরে চান্দের গাড়ির নির্দিষ্ট কোনো স্ট্যান্ড নেই। তবে শহরের রেলওয়ে স্টেশন রোডস্থ যমুনা পেট্রল পাম্পের বিপরীত পাশে, দেওয়ান বেকারির সামনে, ঘরণীর সামনে, ভানুগাছ রোডস্থ মহসিন অডিটরিয়ামের সামনে প্রতিদিন ভোর থেকে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য অপেক্ষায় থাকে গাড়িগুলো। এ ছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে সিলেটগামী আন্তঃনগর ট্রেনগুলোর শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনে প্রবেশের সময়ে স্টেশনের পাশেই চান্দের গাড়িগুলো পাওয়া যায়।

চান্দের গাড়ির চালক পরিচিত হলে কোনো কোনো পর্যটক অগ্রিম বুকিং দিয়ে রাখেন। তা না হলে ছুটির দিনগুলোয় পর্যটক বেশি থাকে বলে চান্দের গাড়ি পাওয়া অনেকটাই দুরূহ ব্যাপার।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা মিছির আলী বলেন, ‘আমাদের মৌলভীবাজার ও পার্শ্ববর্তী জেলা হবিগঞ্জের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই আনারস, লেবু, কাঁঠালসহ বিভিন্ন ফলমূল উৎপাদিত হয়ে থাকে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে উৎপাদিত ফল শহরে নিয়ে আসার জন্য মিৎসুবিসি জিপ গাড়ি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রায় দুই দশক আগে শ্রীমঙ্গলের পর্যটনশিল্পে জাগরণ শুরু হয়। সে সময় থেকেই এ গাড়িগুলোরও কদর বাড়তে থাকে।’ তিনি বলেন, বর্তমানে পর্যটকদের যাতায়াতের জন্য বিভিন্ন রঙের প্রায় তিন শতাধিক চান্দের গাড়ি রয়েছে শ্রীমঙ্গলে।

চান্দের গাড়ির চালক মো. ইদ্রিস মিয়া বলেন, ‘প্রতি বছর শীত মৌসুমে প্রচুর পরিমাণ পর্যটক আসেন শ্রীমঙ্গলে। এর মধ্যে শতকরা ৯০ শতাংশ দেশি এবং ১০ শতাংশ বিদেশি।’