সিটির বিরুদ্ধে এত অভিযোগ, তবুও কেন আত্মবিশ্বাসী রদ্রি?

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের আর্থিক নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগে যখন তোলপাড় বিশ্ব ফুটবল, ঠিক তখনই ম্যানচেস্টার সিটির পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন দলটির সদ্য সাবেক মিডফিল্ডার রদ্রি। ক্লাবটির বিরুদ্ধে আনা ১১৫টি অভিযোগের মধ্যে ১১৪টিতেই দোষী সাব্যস্ত হওয়ার খবর সামনে আসার পর যেখানে পুরো ফুটবল বিশ্বে হুলস্থুল পড়ে গেছে, সেখানে ইতিহাদ স্টেডিয়ামের পুরোনো ক্লাবের প্রতি নিজের অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছেন এই স্প্যানিশ তারকা। 

নেশনস লিগে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার আগে ওয়েম্বলিতে গতকাল আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রদ্রি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানিয়ে দিয়েছেন, ক্লাব কর্তৃপক্ষ নির্দোষ, যতক্ষণ না এর বিপরীত কিছু প্রমাণিত হচ্ছে, সিটির ওপর তার ও সতীর্থদের বিশ্বাস শতভাগ অটুট থাকবে।

রদ্রির চোখে সিটির নির্দোষত্ব ও পুরোনো স্মৃতি

ওয়েম্বলিতে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে রদ্রি ২০২০ সালের সেই বিখ্যাত ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দেন, যখন উয়েফার নিষেধাজ্ঞা থেকে কোর্ট অব আরবিট্রেশন ফর স্পোর্টের (সিএএস) রায়ে মুক্ত হয়ে ফিরেছিল সিটি। সংবাদ সম্মেলনে রদ্রি বলেন, ‘তারা (ক্লাব কর্তারা) সবসময় আমাদের নিশ্চিত করেছেন যে তারা কোনো ভুল কিছু করেননি এবং আমরাও সেটিই বিশ্বাস করি। যতক্ষণ না পর্যন্ত তারা দোষী প্রমাণিত হচ্ছেন, আমরা ক্লাবের পক্ষেই থাকব।’ 

সিটির এই সাবেক তারকা আরও যোগ করে বলেন, ‘ফুটবলারদের ভাবনা ও আপনাদের দৃষ্টিকোণ সম্পূর্ণ আলাদা। ২০২০ সালেও আমাদের প্রায় একই রকম ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। সেবারও প্রথম ধাপে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর আমরা শেষ পর্যন্ত বেকসুর খালাস পেয়েছিলাম। তাই আমি বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থাশীল।’

এ ছাড়া ক্লাব অর্জিত শিরোপাগুলো কেউ কেড়ে নিতে পারবে না দাবি করে তিনি বলেন, ‘আমরা মাঠে যা অর্জন করেছি, তা কেউ আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবে না। এসব অর্জিত হয়েছে সাধনা ও প্রতিদিনের লড়াইয়ে।’ 

যে ১১৫ অভিযোগের বেড়াজালে ম্যানচেস্টার সিটি

ইংলিশ ফুটবলের অন্যতম সফল এই ক্লাবের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের লম্বা অভিযোগের পাহাড় জমেছে বেশ কিছুদিন ধরে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে দীর্ঘ তদন্ত শেষে প্রিমিয়ার লিগ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে মোট ১১৫টি আর্থিক নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয় সিটির বিরুদ্ধে। ২০০৯-১০ থেকে ২০১৭-১৮ মৌসুম পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই অনিয়মের পরিধি ছিল বেশ ব্যাপক। 

এর মধ্যে রয়েছে ক্লাবের আয় ও স্পনসরশিপের সঠিক আর্থিক হিসাব গোপন করা, কোচ ও খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক সংক্রান্ত গোপনীয়তা রক্ষা করা, উয়েফার ফিন্যান্সিয়াল ফেয়ার প্লে (এফএফপি) এবং প্রিমিয়ার লিগের পিএসআর (প্রফিট অ্যান্ড সাসটেইনিবিলিটি) নীতি ভঙ্গ করা। এর পাশাপাশি, দীর্ঘ তদন্ত কার্যক্রমে ক্লাবটির পক্ষ থেকে সহযোগিতা না করার মতো গুরুতর অভিযোগও যুক্ত রয়েছে এর সঙ্গে।

স্বাধীন কমিশনের রায়ে ১১৪টিতেই দোষী সিটি

দ্য অ্যাথলেটিক ও বিবিসির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সম্প্রতি প্রকাশ পেয়েছে যে, এই বিশাল মামলার শুনানির জন্য গঠিত স্বাধীন কমিশন দীর্ঘ পর্যালোচনার পর ১১৫টি অভিযোগের মধ্যে ১১৪টিতেই ম্যানচেস্টার সিটিকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। অবশ্য এই রায়ের পরেও এখনই চূড়ান্ত কোনো শাস্তি ঘোষণা করা হয়নি। 

প্রক্রিয়াগত নিয়ম অনুযায়ী ক্লাবটির সামনে আপিল করার পূর্ণ সুযোগ রয়েছে। ফলে আইনি এই লড়াইয়ের চূড়ান্ত পরিণতি দেখতে ফুটবল বিশ্বকে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে রায়ের এই প্রাথমিক ফল সিটির মুকুটে বড় একটা কলঙ্কের দাগ বসিয়ে দিয়েছে।

সিটির সামনে কী ধরনের শাস্তির খড়্গ ঝুলছে?

আইনি লড়াইয়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর এখন ফুটবল মহলে প্রশ্ন উঠেছে, ঠিক কী ধরনের শাস্তি পেতে পারে  সিটি? অতীতে ছোটখাটো আর্থিক অনিয়মের কারণে এভারটন বা নটিংহাম ফরেস্টের পয়েন্ট কাটার নজির থাকলেও সিটির এই মামলাটির পরিধি এবং গুরুত্ব অনেক বিশাল। স্বাধীন কমিশনের রায়ের ওপর ভিত্তি করে ক্লাবটির ওপর বড় অঙ্কের আর্থিক জরিমানা থেকে শুরু করে চলতি বা ভবিষ্যৎ মৌসুমে বিশাল অঙ্কের পয়েন্ট কাটা হতে পারে।

সবচেয়ে কঠোর শাস্তির অংশ হিসেবে প্রিমিয়ার লিগ থেকে সরাসরি অবনমন বা টুর্নামেন্ট থেকে বহিষ্কারের মতো কঠোর ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি, অভিযুক্ত সময়সীমায় (২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে) ক্লাবের জেতা ৩টি প্রিমিয়ার লিগ, ৩টি লিগ কাপ ও ২টি এফএ কাপসহ মোট ৮টি বড় ঘরোয়া ট্রফি বা শিরোপা কেড়ে নেওয়ার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে সবকিছুর চূড়ান্ত ফয়সালা নির্ভর করছে আপিল প্রক্রিয়া ও স্বাধীন কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।