সুন্দরবনের হাতছানি

সুন্দরবন দেশের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট, ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। এ বনে ভ্রমণের প্রধান এবং সবচেয়ে সহজ রুট খুলনা হয়ে। খুলনার বিআইডব্লিউটিএ লঞ্চঘাট, ৪ নম্বর ঘাট, জেলখানা ঘাট বা রূপসা ঘাট থেকে প্রতিদিন শত শত পর্যটক জাহাজে ও লঞ্চে চড়ে সুন্দরবন রওনা হন। পর্যটকদের নিরাপত্তা, সুস্বাদু খাবার, অভিজ্ঞ গাইড এবং আরামদায়ক জলযানের নিশ্চয়তা দিতে খুলনায় বহু ট্যুর অপারেটর কাজ করছে।

সুন্দরবন যেতে বন বিভাগ পর্যটকদের সর্বোচ্চ ৫ দিনের জন্য অনুমতি দিয়ে থাকে। ট্যুর অপারেটররা সাধারণত ২ রাত ৩ দিনের ভ্রমণ প্যাকেজ নির্ধারণ করেন। ব্যক্তিগতভাবে জাহাজ বুকিং করে সপ্তাহের যেকোনো দিন, যেকোনো সময় সুন্দরবন ভ্রমণ করা যায়। তবে বৃহস্পতি ও শুক্রবার সকাল ৮টায় অধিকাংশ জাহাজ ছেড়ে যায়। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে আন্দারমানিক, কটকা, জামতলা বিচ, কচিখালী, ডিমের চর ও করমজল এই ৭টি পয়েন্টে ভ্রমণ করা হয়। অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আন্দারমানিক, কটকা, জামতলা বিচ, হিরণ পয়েন্ট ও দুবলার চরে ভ্রমণ করা হয়।

সুন্দরবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা হলো কটকা। হিরণ পয়েন্ট ও দুবলার চর সুন্দরবনের দক্ষিণাংশে অবস্থিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র। হিরণ পয়েন্ট একটি সংরক্ষিত অভয়ারণ্য। এখানে বাঘ, হরিণ, বানর ও নানা প্রজাতির পাখি অবাধে বিচরণ করে। আর দুবলার চর হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বার্ষিক রাসমেলা ও পুণ্যস্নানের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত। এই স্থানটি শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকা ও চিত্রা হরিণের বিচরণের জন্যও বিখ্যাত।

ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের (টোয়াস)-এর তথ্যমতে, বর্তমানে খুলনা থেকে প্রায় ৭০টি জাহাজ সুন্দরবনে যায়। এর মধ্যে কিছু বিলাসবহুল জাহাজও রয়েছে। এমভি সানওয়ে, এমভি গ্লোরি, এমভি উৎসব, এমভি দি এক্সপোলার টু পয়েন্ট জিরো, এমভি মালিঙ্গি, ওয়েভ-২, ওয়েব-১, এমভি ক্রাউন, এমভি ওসান পার্ল, এমভি ভ্রমণতরী, এমভি আলাসকা ক্রুজ, এমভি কোস্টাল ক্রুজের মধ্যে অন্যতম। একটি জাহাজে সর্বোচ্চ ৭৫ জন দর্শনার্থী নেওয়ার অনুমতি আছে। দুই রাত তিন দিনের প্যাকেজে ৭৫ জনের একটি বিলাসবহুল এসি জাহাজে জনপ্রতি ১২ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২০ হাজার থেকে ভাড়া দিতে হয়। ননএসি জাহাজে জন প্রতি ৭ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ১১ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। প্রতিটি জাহাজে রুচিসম্মত খাবার ও সুইমিং পুল আছে। অন্তত ২ থেকে ৪ সপ্তাহ আগে পছন্দের ট্যুর অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ করে বুকিংয়ের জন্য কমপক্ষে ৫০ শতাংশ অগ্রিম দিয়ে ভ্রমণ নিশ্চিত করতে হয়।

একদিনের ভ্রমণে অনেকে সকাল-সন্ধ্যার প্যাকেজে বাগেরহাটের মোংলা থেকে ট্রলার বা ছোট বোটের মাধ্যমে সুন্দরবনের করমজল, হাড়বাড়িয়া এলাকায় ঘুরতে যান। এ ছাড়া সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সীগঞ্জ এলাকা থেকে ট্রলারযোগে সুন্দরবনে প্রবেশ করা যায়।

ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহসভাপতি ও ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের সভাপতি মো. মইনুল ইসলাম বলেন, ‘পর্যটকদের জন্য নিরাপদ ও আরামদায়ক ভ্রমণ নিশ্চিত করতে আমরা আন্তরিকভাবে কাজ করছি। বন বিভাগের সব নিয়মকানুন ও বিধিমালা মেনে সুন্দরবনে চলাচল করতে দর্শনার্থীদের অনুরোধ করি।’ পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে প্লাস্টিক ও পলিথিন ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে পরিবেশবান্ধব ভ্রমণ নিশ্চিত করতে তিনি সবার সহযোগিতা কামনা করেন। 

খুলনা থেকে সুন্দরবন ভ্রমণে সহায়ক কয়েকটি সংস্থা হলো :

মিসর এন্টারপ্রাইজ : খুলনার শের-এ-বাংলা রোডে অবস্থিত মিসর এন্টারপ্রাইজ একটি সুপরিচিত, বিশ^স্ত ও পরিবেশবান্ধব ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠান, যারা শিপ এমভি সানওয়ে ক্রুজ পরিচালনা করে। প্রতিটি ট্যুরেই বন বিভাগের দক্ষ ও সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষী এবং অভিজ্ঞ গাইড অন্তর্ভুক্ত থাকে। এর মাধ্যমে করমজল, হারবাড়িয়া, কটকা, কচিখালি, হিরণ পয়েন্ট ও দুবলার চরের মতো জনপ্রিয় বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও ওয়াচ টাওয়ার ভ্রমণের ব্যবস্থা আছে।

সুন্দরবন ওয়ান্ডার্স ট্যুরিজম : এই প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব জাহাজ ও পেশাদার গাইড টিম আছে। খুলনার বিআইডব্লিউটিএ লঞ্চঘাট এলাকা থেকে তারা সুন্দরবন ট্যুর পরিচালনা করে থাকে। নিয়মিত করমজল, হাড়বাড়িয়া, কটকা ও কচিখালী রুটে ৩ দিন ২ রাতের প্রিমিয়াম প্যাকেজ পরিচালনা করে।

সুন্দরবন হলিডেজ : খুলনায় সুন্দরবন হলিডেজ একটি সুপরিচিত নাম। এই প্রতিষ্ঠানের ওয়েভ-২ খুলনার সবচেয়ে বিলাসবহুল জাহাজ। ওয়েভ-২-এর খাবারও আকর্ষণীয়। ওয়েভ-১ নামে আরও একটি বিলাসবহুল জাহাজ আছে তাদের।

নিঝুম ট্যুরিজম : ছোট গ্রুপ ও বন্যপ্রাণীকেন্দ্রিক এক্সক্লুসিভ ক্রুজে বড় পিকনিক পার্টির ভিড় এড়িয়ে যারা শান্ত পরিবেশে ও গভীর বনের ছোট খালে ঘুরে বন্যপ্রাণী দেখতে চান, তাদের জন্য এই প্রতিষ্ঠানটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।

সুন্দরবন ক্রুজ বিডি : রূপসা ফেরিঘাট থেকে সরাসরি সুসজ্জিত জাহাজে  করমজল, হাড়বাড়িয়া থেকে শুরু করে কটকা-দুবলার চর পর্যন্ত আধুনিক সুযোগ-সুবিধায় এই প্রতিষ্ঠান প্যাকেজ পরিচালনা করে।

ইকো-ট্যুরিজম সুন্দরবন : প্রকৃতিবান্ধব ও নিরাপদ নৌভ্রমণে ইকো-ট্যুরিজম ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের নীতি অনুসরণ করে পরিচালিত হয়। এই অপারেটরটি ছোট নৌকায় সুশৃঙ্খলভাবে সুন্দরবনের ভেতরের ছোট ক্যানেল ক্রুজিং করায়।

এছাড়া এভারগ্রিন ট্যুরস, পপুলার ট্যুরস, নিঝুম ট্যুরিজম, রয়েল ভিশন ট্যুরিজম, বিটিএ হলিডেজ, সুন্দরবন ক্রুজ বিডিও বেশ জনপ্রিয়।    

সবুজ বনানী, পশুর নদী ও ঢাংমারী খালের জোয়ার-ভাটার মেলবন্ধনে বুক ভরে শ্বাস নিতে ইকো রিসোর্টগুলো জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। এর মধ্যে দাকোপের জঙ্গলবাড়ি ম্যানগ্রোভ রিসোর্ট,  কৈলাসগঞ্জ ও ঢাংমারী অঞ্চলের বনবাস ইকো ভিলেজ, রেইনবো ইকো রিসোর্ট, বনবিবি ফরেস্ট রিসোর্ট, সুন্দরী ইকো রিসোর্ট, অরণ্যছায়া ইকো রিসোর্ট, বনলতা ইকো কটেজ, বানিয়াশান্তা ও মোংলার মধ্যবর্তী নদী ও খালের সংযোগস্থলে অবস্থিত ম্যানগ্রোভ ভ্যালি সুন্দরবন ইকো রিসোর্ট সুন্দরবন ভ্রমণে ও সেখানে অবস্থানে ভালো সেবা দেয়। যারা সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র, ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণী নিয়ে জানার সঙ্গে সঙ্গে শান্তিতে সময় কাটাতে চান তাদের পছন্দ হতে পারে ইরাবতী ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার।