কুবিতে কথা-কাটাকাটি গড়াল সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায়, আহত ১২

পরিচয় না দেওয়াকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি)। কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে শুরু হওয়া কথা-কাটাকাটি গড়িয়েছে মারধর, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও হলকেন্দ্রিক সংঘর্ষে। জানা গেছে, দফায় দফায় সংঘর্ষে আইসিটি ও শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলের অন্তত ১২ শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।

রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি এলাকায় ঘটনার সূত্রপাত। পরে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলের সামনে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনা। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে প্রক্টর অফিসে দুই পক্ষকে নিয়ে বৈঠক করে মীমাংসা হওয়ার পরও ঘটনা গড়ায় দফায় দফায় সংঘর্ষে।

প্রত্যক্ষদর্শী আবীরের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সূত্রপাত হয় লাইব্রেরিতে পড়াশোনাকে কেন্দ্র করে। তাঁরা জানান, আইসিটি বিভাগের ১৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সালমান পাটোয়ারী আবীর ও তাঁর সহপাঠী ওমর লাইব্রেরিতে বসে পড়ছিলেন। এ সময় পাশে থাকা নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাকিব তাঁদের আস্তে কথা বলতে বলেন। পরে সাকিব তাঁদের ‘তোরা কোন ব্যাচের?’ বলে প্রশ্ন করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, আবীর কোনো উত্তর না দিয়ে ‘সরি’ বলে সেখান থেকে চলে যান।

পরে আবীরের বন্ধু সামিন মজুমদার লাইব্রেরি থেকে বের হলে শাকিল তাঁকে লাথি দেন বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা। খবর পেয়ে প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা প্রক্টর অফিসে বিষয়টি মীমাংসা করে দেন।

জানা যায়, প্রক্টর অফিসে বসে আইসিটি বিভাগের শিক্ষার্থীদের ছবি তুলে রাখেন সাকিলের বন্ধু রাফসান এবং মারধরের হুমকি দেন সাকিলের অন্যান্য বন্ধুরা।

এর পরই পরিস্থিতি পুনরায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শী ও ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, প্রক্টরিয়াল বডির মীমাংসার পর আইসিটির ১৯তম ব্যাচের দুই শিক্ষার্থী ক্যাম্পাস ত্যাগ করতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে তাঁদের ওপর লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা করেন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শাকিল, একই বর্ষের ইংরেজি বিভাগের তাহসিন, নৃবিজ্ঞান বিভাগের আবীর, ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিভাগের এহসান, ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের রাফসান, নৃবিজ্ঞান বিভাগের একই ব্যাচের সাকিব ও আইন বিভাগের প্রান্ত। এ সময় আইসিটি বিভাগের ওই শিক্ষার্থীরাও মারামারিতে জড়ান।

ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, মূল ফটক থেকে ভুক্তভোগীদের দৌড়ে আইসিটি বিভাগে নিয়ে যান অভিযুক্তরা। এ সময় আইসিটি বিভাগের শিক্ষার্থীরা উত্তেজিত হলে প্রক্টরিয়াল বডি আইসিটি বিভাগের গেটে তালা দেন। শিক্ষার্থীদের উত্তেজনায় প্রক্টরিয়াল বডি গেট খুলে দিলে হামলাকারীদের ধাওয়া করেন আইসিটি বিভাগের শিক্ষার্থীরা।

ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলের সামনে আইসিটি বিভাগের শিক্ষার্থীরা উপস্থিত হয়ে পূর্বে হামলাকারীদের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থান নেন। এ সময় দত্ত হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ও পূর্বে হামলাকারী আবীর আইসিটি বিভাগের একজন শিক্ষার্থীকে লাঠি দিয়ে আঘাত করেন। পরে তাঁরা পাল্টা আঘাত করলে পরিস্থিতি দ্বিমুখী সংঘর্ষে রূপ নেয়। এ সময় হলের শিক্ষার্থীরা নামলে তাঁদের সঙ্গেও সংঘর্ষ হয়।

এই সংঘর্ষে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের নৃবিজ্ঞান বিভাগের জুনাঈদ লামিম, একই বর্ষের মাজহারুল ইসলাম আবীর, ইংরেজি বিভাগের কাজী তাহসিন, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শাকিল খান, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের সৌরভ কাব্য, ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিভাগের শিহাব, একই বিভাগের শফিউল্লাহ আকাশ এবং ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের মোহাম্মদ তাওহীদ, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তিয়াস, নৃবিজ্ঞান বিভাগের নাজমুল হোসেন এবং ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিভাগের মর্তুজা হোসাইন সিদ্দিকসহ দত্ত হল ও বিজয়-২৪ হলের আরও কিছু শিক্ষার্থীকে আইসিটি বিভাগের একাধিক শিক্ষার্থীকে মারধর করতে দেখা যায়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, হামলাকারীদের ধাওয়া দিলে তাঁরা শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলে আশ্রয় নেন। তখন হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ঘটনাটিতে জড়িয়ে পড়লে আইসিটি বিভাগের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁদের সংঘর্ষ বাধে। কয়েক দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও মারধরের ঘটনা ঘটে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।

আইসিটি বিভাগের ১৬ ব্যাচের শিক্ষার্থী সামিন মজুমদার বলেন, ‘আমরা গেট দিয়ে বের হচ্ছিলাম। এ সময় কয়েকজন আমাদের ডেকে নিয়ে যায়। সেখানে একজনকে ধাক্কা দিলে আমি কারণ জানতে চাই। পরে তারা আমার গলা চেপে ধরে ও ঘুষি মারে। এরপর আমিও আত্মরক্ষায় তাদের মারি। এর আগে লাইব্রেরিতে আমার এক বন্ধুকে ব্যাচ জিজ্ঞেস করে কয়েকজন ধাক্কা ও লাথি মেরেছিল। পরে সিনিয়ররা এসে বিষয়টি থামান এবং প্রক্টর অফিসের কাছে গিয়ে মীমাংসা হয়।’

আইসিটি বিভাগের শিক্ষার্থী ইফতেকার বলেন, ‘ক্লাস শেষে আমি, সামিন ও ফয়সাল একসঙ্গে যাচ্ছিলাম। এ সময় কয়েকজন আমাদের ডেকে ঘিরে ধরে ভেতরে নিয়ে যায় এবং মারধর শুরু করে। আমাকে লাথি মারলে সামিন বাঁচাতে এগিয়ে আসে, তখন তাকেও ঘুষি মারা হয়। পরে প্রায় ১০ থেকে ১২ জন আমাদের ওপর হামলা করে। আমরা দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলেও তারা পেছনে পেছনে এসে মারধর করে। আমাদের বাঁচাতে আসা অন্য শিক্ষার্থীদেরও তারা মারধর করে।’

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাকিব ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী শাকিলের সঙ্গে আইসিটি বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থীর বিরোধও পরবর্তী উত্তেজনায় যোগ হয়। এ সময় প্রত্নতত্ত্ব ও নৃবিজ্ঞান বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন বলে জানা গেছে।

এ ঘটনায় ১২ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেলের ডেপুটি চিফ মাহমুদুল হাসান সোহাগ। এর মধ্যে আটজনকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়।

তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে ১২ জন ভর্তি হয়েছেন। আটজনকে কুমিল্লা মেডিকেলে পাঠিয়েছি। তাঁদের মধ্যে একজন গুরুতর আহত হয়েছেন। তাঁর হাত ভেঙে গেছে।’

সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে আইসিটি বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের তাওহীদ, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শামীম মজুমদার, ইফতেখার, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, নিশারুল ও সাইফ এবং ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলের শিক্ষার্থী নিবিড় রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলের প্রভোস্ট জনি আলম বলেন, ‘সকালের একটি ঘটনা কেন্দ্র করে দত্ত হলে আক্রমণ করে হলের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে এবং জিনিসপত্র ভাঙচুর করে। এই ঘটনা কারা ঘটিয়েছে, তা আমরা সিসিটিভি ফুটেজ দেখে পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। হলে কে বা কারা আক্রমণ করেছে, তা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানিয়েছি, যাতে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করা হয়।’

সার্বিক বিষয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘শুরুতেই আমরা দুই পক্ষকে একসঙ্গে করে মিটিয়ে দিয়েছিলাম। পরে আবার কী নিয়ে ঝামেলা সৃষ্টি হয়েছে, বলতে পারছি না। আমরা সমাধানের চেষ্টা করছি। আমরা বসে বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে জড়িতদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’

এ বিষয়ে আইসিটি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো. তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘আজকের ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত। এ ঘটনায় একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।’

উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করিম বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা আমাদের প্রধান লক্ষ্য। হলে আক্রমণ করাও কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। আমরা মিটিং করেছি। ভিডিও ফুটেজ কমিটি তাদের রিপোর্ট দিলে জড়িতদের বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’