সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আবারও আহ্বান জানিয়েছে সরকার। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বিরোধী দল আলোচনায় অংশ নিলে তাদের বক্তব্য ও প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করা হবে।
রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির তৃতীয় বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কমিটির সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, সাকিলা ফারজানা এবং মো. মাহমুদুল হক রুবেল উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন। তারা সংবিধান সংশোধনের বিভিন্ন বিষয়ে মতামত, প্রস্তাব ও পরামর্শ দেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিরোধী দলকে এর আগেও আলোচনায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তারা যখনই বিশেষ কমিটিতে যোগ দেবে, তাদের স্বাগত জানানো হবে। তাদের বক্তব্য ও প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা করা হবে।
তিনি বলেন, বিরোধী দল আলোচনায় অংশ নিলে তাদের উত্থাপিত বিভিন্ন বিষয়ও বিবেচনা ও সমন্বয় করা সম্ভব হবে। সংবিধান সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয়ে বিভক্তি এড়িয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে কাজটি সম্পন্ন করতে চায় সরকার।
বিশেষ কমিটির রিপোর্টের সম্ভাব্য সময়সূচি সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় সংসদে রিপোর্ট উপস্থাপনের জন্য তারা জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। এরপর আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের বিল আসবে।
সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের প্রথম সংসদ অধিবেশনেই বিলটি আসতে পারে বলেও জানান তিনি। ডিসেম্বরের মধ্যে আলোচনা শেষ করে সংসদে রিপোর্ট দেওয়ার লক্ষ্য কমিটি আগেই জানিয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে প্রথমে সংসদে বিল উত্থাপন করা হবে। এরপর বিলের ওপর আলোচনা, সংশোধনী প্রস্তাব ও বিরোধিতার বিষয়গুলো সংসদীয় বিধি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করে সংশোধনী পাসের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। যেসব সাংবিধানিক বিধানের সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।
সাংবিধানিক গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাধারণ গণভোট ও সাংবিধানিক গণভোট এক বিষয় নয়। সংবিধানের নির্দিষ্ট কিছু বিধানে পরিবর্তন আনা হলে সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী গণভোটের প্রয়োজন হতে পারে। এ প্রসঙ্গে তিনি সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, সংশোধনী সংসদে পাস হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে যেসব অনুচ্ছেদে পরিবর্তনের জন্য গণভোটের বিধান রয়েছে, সেসব বিষয়ে গণভোট হবে। জনগণ পক্ষে ভোট দিলে এরপর রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষর করবেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, সংবিধানের কিছু মৌলিক বিষয়ে সংশোধনী আনার ক্ষেত্রে গণভোটের বিধান কার্যকর হতে পারে। তবে কোন কোন অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আনা হবে, তা কমিটির আলোচনা ও পরবর্তী সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হবে।
তিনি বলেন, তারা ঐক্যের ভিত্তিতে কাজ করতে চান এবং কোনো বিভক্তি রাখতে চান না। জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবেই তা বাস্তবায়ন করার কথা জানান তিনি। এর বাইরে ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় আসেনি বা পরিহার করা হয়েছে—এমন বিষয়ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে গ্রহণের কথা বলেন তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনি ইশতেহারে থাকা যেসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে, সেগুলোও বিবেচনায় নেওয়া হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত ও জনসেন্টিমেন্ট থেকে সংবিধানে ধারণযোগ্য বিষয়গুলোও পর্যালোচনা করা হবে। আর যেসব বিষয় আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বাস্তবায়ন সম্ভব, সেগুলো আইন প্রণয়নের মাধ্যমেই করা হবে।
সাংবাদিকদের মতামত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বৈঠকে অংশ নেওয়া সাংবাদিকদের অধিকাংশই বিভিন্ন বিষয়ে মতামত ও প্রস্তাব দিয়েছেন। অনেকে লিখিত আকারেও প্রস্তাব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। এসব লিখিত প্রস্তাব কমিটি গ্রহণ করে আলোচনার মাধ্যমে বিবেচনা করবে।
তিনি জানান, সংবিধানের প্রস্তাবনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন অনুচ্ছেদ এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের বিষয়েও সাংবাদিকরা বিস্তারিত মতামত দিয়েছেন। বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে এসব মতামত নিয়ে একটি প্রতিবেদন ও পুস্তিকা প্রণয়ন করা হবে। তবে বিশেষ কমিটির মূল রিপোর্ট পৃথক থাকবে।
কমিটির সভাপতি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদই তাদের কাজের প্রধান ভিত্তি। তবে নির্বাচনি ইশতেহারে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতিও সংবিধান সংশোধনের সুপারিশ তৈরির সময় বিবেচনায় নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, সংবিধানের প্রস্তাবনা ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে মহান আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাসের বিষয়টিও তাদের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অংশ। এসব বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত না এলেও তাদের নির্বাচনি অঙ্গীকার রয়েছে। তাই সংবিধান সংশোধনের সুপারিশ তৈরির সময় বিষয়গুলো বিবেচনা করা হবে।
বিরোধী দলের অংশগ্রহণের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, শুধু বিশেষ কমিটির পক্ষ থেকে নয়, সাংবাদিকদের মাধ্যমেও বিরোধী দলকে আলোচনায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। এর আগে সংসদে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকেও তাদের অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ক্ষমতা তাদের নেই। তবে তারা বারবার আহ্বান জানাতে পারেন এবং আশা করেন বিরোধী দল আলোচনায় অংশ নেবে। ঐক্যবদ্ধভাবে সংবিধান সংশোধনের কাজ এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।