রোনালদোকে বেঞ্চে বসিয়ে হালান্ডদের হারাল পর্তুগাল

লড়াইটা হবার কথা ছিল দুই প্রজন্মের দুই গোলমেশিনের। ফুটবলপ্রেমীরাও তো সেই লড়াই দেখার অপেক্ষাতেই ছিল। তবে ১৪৬টি আন্তর্জাতিক গোলের মালিককে সাইডলাইনে বসিয়ে রেখে কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নামা যেকোনো কোচের জন্যই এক বিশাল জুয়া; সেই সাহসী সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত নেন পর্তুগিজ কোচ হোর্হে জেসুস। ম্যাচটিতে আর্লিং হালান্ড তার রেকর্ড গড়া গোল দিয়ে ঘরের মাঠে ঝড় তোলার চেষ্টা করলেও, ভুলত্রুটিহীন ফুটবল খেলে এবং সুযোগের সঠিক সদ্ব্যবহার করে নরওয়ের বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে স্বস্তির জয় পায় পর্তুগাল।

কৌশলগত পরিকল্পনায় বড় এক চমক হিসেবে ম্যাচের শুরুর একাদশে রাখা হয়নি ৪১ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে। পুরো ৯০ মিনিট তাকে বেঞ্চে বসিয়ে রেখেই দল পরিচালনা করেন কোচ। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে নেশনস লিগের ম্যাচের পর এই প্রথমবার সিআরসেভেনকে শুরুর একাদশের বাইরে রেখে সাবস্টিটিউট হিসেবে ডাগআউটে রাখেন কোচ। মূলত বর্তমান বর্ধিত আন্তর্জাতিক বিরতিতে মহারথীর ওপর অতিরিক্ত চাপ না কমিয়ে তার খেলার সময় (মিনিটস) সঠিকভাবে ম্যানেজ করার জন্যই এমন পরিকল্পনা করেছিলেন জেসুস। 

এদিকে দীর্ঘ ১৮ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো কোনো প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক ম্যাচে এক মিনিটের জন্যও মাঠে না নেমে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বেঞ্চে বসে খেলা দেখতে হলো রোনালদোকে; এর আগে সর্বশেষ এমন ঘটনা ঘটেছিল ২০০৮ ইউরোতে, যেখানে সুইজারল্যান্ডের কাছে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে ২-০ ব্যবধানে হেরেছিল পর্তুগাল।

ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলের আক্রমণভাগে তীব্র লড়াই জমে ওঠে। লড়াইয়ের শুরুতেই বড় ধাক্কা খাওয়ার উপক্রম হয়েছিল পর্তুগালের, যখন মার্টিন ওডেগার্ডের বাড়ানো বল থেকে নরওয়ের গোলমেশিন হালান্ড দারুণ এক ভলি শট নেওয়ার চেষ্টা করেন; তবে সফরকারী গোলরক্ষক দিয়োগো কস্তা তা দুর্দান্ত সেভ করে দলকে রক্ষা করেন। 

সেই যাত্রায় বেঁচে যাওয়ার পর দ্রুতই পাল্টা আক্রমণ শাণায় পর্তুগিজরা। ১৭ মিনিটে পেদ্রো নেতার বাড়ানো চমৎকার ক্রস বক্সে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিখুঁত ও নিচু শটে পর্তুগালকে এগিয়ে দেন ফরোয়ার্ড জোয়াও ফেলিক্স। প্রথমার্ধের বাকি সময় এই এক গোলের লিড নিয়েই মাঠ ছাড়ে সফরকারীরা। অবশ্য এর মাঝেও হালান্ডকে গোলবঞ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখেন ম্যানচেস্টার সিটিতে তারই সতীর্থ রুবেন দিয়াজ, যিনি গোললাইন থেকে নরওয়ের নিশ্চিত একটি শট ব্লক করে ফিরিয়ে দেন। এছাড়া হাফ টাইমের দশ মিনিট আগে হালান্ডের একটি হেডও চমৎকার সেভ করে রুখে দেন কস্তা।

বিরতির পর ঘুরে দাঁড়ানোর মরিয়া চেষ্টা চালায় স্বাগতিকরা। ম্যাচের ৫১ মিনিটে অবশেষে কাঙ্ক্ষিত গোলের দেখা পান নরওয়ের প্রাণভোমরা হালান্ড। প্যাট্রিক বার্গের হেডের বল ডি-বক্সে পেয়ে ট্যাপ-ইন করে জালে জড়ান এই ম্যানসিটি ফরোয়ার্ড। উয়েফা নেশনস লিগের ইতিহাসে এটি ছিল তার ২২তম গোল, যার সুবাদে টুর্নামেন্টের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে নিজের রেকর্ডকে আরও একক ও অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেলেন তিনি। 

তবে সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে দেয়নি পর্তুগিজরা। সমতা ফেরানোর মাত্র তিন মিনিট পরই নরওয়ের গোলরক্ষক ওরজান নাইল্যান্ডের মারাত্মক এক ভুলে বল পেয়ে যান বদলি হিসেবে নামা গনসালো রামোস। ডি-বক্সের বাইরে থেকে দারুণ এক চিপ শটে বল জালে জড়িয়ে পর্তুগালকে আবারও চালকের আসনে বসান তিনি।

ম্যাচের বাকি সময় ব্যবধান বাড়াতে মরিয়া ছিল সফরকারীরা। রাফায়েল লেয়াওর একটি জোরালো শট ডিফ্লেক্টেড হয়ে ক্রসবারে লেগে প্রতিহত হয়। এমনকি ম্যাচের শেষ দিকে গোলরক্ষককে একা পেয়ে রামোস বল জালে জড়ালেও ভিএআর চেক করার পর সামান্য অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল করা হয়। অন্যদিকে, সমতা ফেরাতে শেষ মুহূর্তে গোলরক্ষক নাইল্যান্ডসহ নরওয়ের পুরো দল আক্রমণভাগে উঠে আসলেও পর্তুগিজদের জমাট রক্ষণ ভাঙতে পারেনি। রামোসের সেই গোলটিই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। 

ম্যাচ শেষে স্পোর্ট টিভি-কে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় জমজমাট এই ম্যাচের জয়ের নায়ক রামোস বলেন, ‘প্রতিটি মুহূর্তই খুব গুরুত্বপূর্ণ। যখনই সুযোগ পাব, দলের জন্য নিজের সেরাটা দিয়ে অবদান রাখাই আমার মূল লক্ষ্য। দলের জয়ে ভূমিকা রাখতে পেরে আমি আনন্দিত।’

ম্যাচ জুড়ে নরওয়ের আক্রমণ সামলাতে রক্ষণ জমাট রাখার ওপর জোর দিয়েছিল জেসুসের দল। এর আগে ওয়েলসের বিপক্ষে ম্যাচেও রোনালদোকে দ্রুত তুলে নিয়েছিলেন কোচ। তরুণ ও নতুন ফুটবলারদের সুযোগ দিয়ে দল সাজানোর এই কৌশল ও রোনালদোকে বসিয়ে রাখা প্রসঙ্গে ম্যাচ শেষে জেসুস জানান, ‘কঠিন এক অ্যাওয়ে ম্যাচ থেকে দারুণ এই জয় তুলে নেওয়াটা খুব জরুরি ছিল। নতুন কোচ হিসেবে আমরা দলের প্রত্যেকের ওপর আস্থা রাখছি এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী সঠিক পথে এগোচ্ছি।’ 

নেশনস লিগে নিজেদের পরবর্তী ম্যাচ আগামী ১ অক্টোবর ডেনমার্কের মাঠে ওয়েলসের মুখোমুখি হবে নরওয়ে, অন্যদিকে একই রাতে পর্তুগাল তাদের পরবর্তী অ্যাওয়ে ম্যাচে আগামী ২ অক্টোবর কার্ডিফে ডেনমার্কে বিপক্ষে মাঠে নামবে। তবে গ্রুপ পর্বের ফিরতি লেগের লড়াইয়ে আগামী ৪ অক্টোবর পর্তুগালের মাটিতেই আবারও মুখোমুখি হবে হালান্ড-রোনালদোরা।