বইচিত্র

বাংলাদেশে নৃভাষাবিজ্ঞান চর্চার অভিনব সংযোজন

দীপেশ চক্রবর্তীকে একবার কিংবদন্তি ঐতিহাসিক রণজিৎ গুহ বলেছিলেন, ‘তুমি থিসিস লিখো না, থিসিস লেখা খুব সোজা। তুমি মনে করবা বই লিখতেছ। ফলে মানুষ যে ভাষায় বই লেখে আমি সেই ভাষাতেই থিসিস লিখছিলাম।’ থিসিসের মানের দুরবস্থা খেয়াল করেই রণজিৎ গুহ ওই পরামর্শ দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের বিদ্যায়তনিক পরিসরে প্রচুর অভিসন্দর্ভ রচিত হচ্ছে। সেগুলো যখন গ্রন্থাকারে প্রকাশ করা হয়, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই থিসিস আর বইয়ের মধ্যে মিল থাকে না। ব্যাপক রদবদল করতে হয়। বই প্রকাশ করার সময় বাড়তি যত্ন লাগে, থিসিস করতে সে রকমটা লাগে না। অধিকাংশ থিসিসই মানহীন বিবেচনায় আলোর মুখ দেখে না। মুহাম্মদ আসাদুজ্জামানের পাত্র ভাষা ও সংস্কৃতি গ্রন্থটি পাঠ করতে গিয়ে মনে হয় এ অভাব ভুলে যাওয়া গানের সুরের মতো ফিরে এসেছে। এটি ‘বাংলাদেশে পাত্র সম্প্রদায়ের ভাষা ও সংস্কৃতি : একটি নৃ-ভাষাবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ’ শীর্ষক অভিসন্দর্ভের গ্রন্থিক প্রকাশ। এতে ভাষাবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ফোকলোরসহ বেশ কয়েকটি শাস্ত্রের দৃশ্যমান প্রকাশ বাড়তি মূল্য আদায় করতে পারবে সহজেই। চলমান ও ব্যস্ত জীবনে বাঙালি পাঠক একটি গণ্ডূষেই সমুদ্রের খোঁজ পাবেন। শুধু বিষয়-পরিকল্পনার জন্যই বাড়তি সাধুবাদ দেওয়া যেতে পারে লেখককে। 

বারোটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত এ গ্রন্থে সিলেট অঞ্চলের ‘পাত্র’ নৃগোষ্ঠীর সমাজ, ভাষা ও সংস্কৃতি বিশ্লেষিত হয়েছে। পাত্র জাতির লোকসাহিত্য তাদের জীবন, সমাজ ও সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। জন্ম থেকে মৃত্যু, উৎসব-পার্বণ থেকে দৈনন্দিন জীবন—জীবনের প্রতিটি পর্বেই এই মৌখিক সাহিত্য নানারূপে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু সংরক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে সময়ের প্রবাহে পাত্রদের সমৃদ্ধ লোকসাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে। তাই পাত্র ভাষা ও সংস্কৃতির সংরক্ষণ আশু আবশ্যক। সেদিক থেকে বর্তমান গ্রন্থটি দারুণভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক জাতিগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে আরও সুচারুভাবে উপস্থাপন করেছে। 

বারোটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত এই গবেষণাগ্রন্থে পাত্রদের ইতিহাস, নৃতাত্ত্বিক পরিচয়, ভাষা, সংস্কৃতি, শব্দভাণ্ডার, লোকসাহিত্য এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার নানা অনালোচিত দিক তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রথম অধ্যায়েই গবেষণার উদ্দেশ্য, পরিধি, সময়কাল, বিষয়বস্তু ও অধ্যায় বিভাজন সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। ‘পাত্র নৃগোষ্ঠীর পরিচয়’ শীর্ষক দ্বিতীয় অধ্যায়ে পাত্র জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরে পাঠকের কাছে তাদের সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তৃতীয় অধ্যায়ে পাত্র সম্প্রদায়কে নিয়ে পূর্ববর্তী গবেষণা, গ্রন্থ, প্রবন্ধ এবং দেশ-বিদেশে প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণাকর্ম পর্যালোচনা করা হয়েছে। এসব রচনায় পাত্রদের নামকরণ, ধর্ম, পেশা, নৃতাত্ত্বিক পরিচয়, ভাষা, বসতিস্থান ও আর্থ-সামাজিক অবস্থাসহ তাদের জীবন ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক আলোচিত হয়েছে।

ভাষা ও সংস্কৃতির পারস্পরিক সম্পর্ককে তাত্ত্বিকভাবে অনুধাবনের জন্য চতুর্থ অধ্যায়ে নৃভাষাবিজ্ঞানের সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য, পরিসর ও বিকাশের ইতিহাস আলোচনা করা হয়েছে। প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে নৃভাষাবিজ্ঞান চর্চার বিকাশ এবং বাংলাদেশে এর ধারাবাহিকতা তুলে ধরা হয়েছে পঞ্চম অধ্যায়ে।

পাত্রদের ভাষার কাঠামো ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ এই গ্রন্থের অন্যতম প্রধান বিষয়। ‘পাত্র ভাষা বিশ্লেষণ’ শীর্ষক অধ্যায়ে এ পাত্র ভাষার ধ্বনিতাত্ত্বিক, রূপতাত্ত্বিক, বাক্যতাত্ত্বিক ও অর্থতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ভাষা যে একটি জনগোষ্ঠীর যোগাযোগের মাধ্যমের পাশাপাশি তার পরিচয়, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বেরও গুরুত্বপূর্ণ বাহন—এ বিষয়টিই এখানে বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। নবম অধ্যায়ে পাত্র সমাজের স্বতন্ত্র সংস্কৃতি, জীবনাচরণ, সামাজিক রীতিনীতি, বিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের বিভিন্ন দিক অনুসন্ধান করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় দশম অধ্যায়ে ভাষা ও সংস্কৃতির নিবিড় সম্পর্কের আলোকে পাত্র ভাষার শব্দভাণ্ডার বিশ্লেষণ করা হয়েছে। জীবনাচরণ, সামাজিক সৌজন্যবোধ, গোত্র ও জ্ঞাতিগোষ্ঠী, বিবাহ, গৃহনির্মাণ, খাদ্য ও পানীয়, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং মৃতের সৎকারসহ পাত্রদের নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত শব্দের তাৎপর্য ও সাংস্কৃতিক ব্যঞ্জনা এ অধ্যায়ে তুলে ধরা হয়েছে।

পাত্র সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ তাদের লোকসাহিত্য। একাদশ অধ্যায় : ‘পাত্রদের লোকসাহিত্য’তে পাত্রদের সমৃদ্ধ মৌখিক সাহিত্য, লোকজ ঐতিহ্য এবং দৈনন্দিন জীবন ও সামাজিক পরিমণ্ডলে এর প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পাত্র ভাষার নিজস্ব সম্পদ হিসেবে এসব লোকসাহিত্য সংরক্ষণ ও বিকাশের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে মৌখিক চর্চার পাশাপাশি এর লিখিত রূপ সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষে দ্বাদশ অধ্যায় : ‘পাত্র সম্প্রদায় উন্নয়নে সুপারিশমালা’তে পাত্রদের শিক্ষা, চিকিৎসা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, নিরাপত্তা ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধাসহ সামগ্রিক জীবনমান উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের মধ্যে পাত্র ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি ক্রমহ্রাসমান আগ্রহের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। 

এ ছাড়া চারটি পরিশিষ্টে পাত্র ভাষার রূপমূল তালিকা, পাত্র ভাষার বিভিন্ন ধরনের বাক্য, বেশকিছু আলোকচিত্র ও পাত্র ভাষার নমুনা উপস্থাপিত হয়েছে। 

বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পাত্রদের রয়েছে স্বতন্ত্র ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারা। তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণাকর্মের অভাব দীর্ঘদিনের। সেই শূন্যতা অনেকাংশেই বর্তমান গ্রন্থটি পূরণ করতে পেরেছে।