উপাচার্য ইস্যুতে চুয়েটে অনড় অবস্থানে দুই পক্ষ 

সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলতে একটি পক্ষ চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে (চুয়েট) অচল রাখতে চায় বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম। তিনি দাবি করছেন, বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা হচ্ছে এবং খুব শিগগিরই তিনি ক্যাম্পাসে ফিরবেন। তবে শিক্ষার্থীরা বলছেন, তারা অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে স্বীয় পদে পুনর্বহাল চান। তাকে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত শাটডাউন কর্মসূচি চলবে।

সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে ‘দেশ রূপান্তর’-এর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম।

চলতি বছরের ২৭ জুলাই চুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু ২১ সেপ্টেম্বর রাতে তাকে সরিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ার পর থেকেই ক্যাম্পাসে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। ওই রাতেই বিক্ষোভ মিছিল করেন কয়েক শ শিক্ষার্থী। পরদিন ২২ সেপ্টেম্বর সকালে উপাচার্যের পদ থেকে অধ্যাপক আবু সায়েমকে অপসারণের প্রতিবাদে এবং তাকে পুনর্বহালের দাবিতে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। টানা সাত দিন ধরে চলা এই আন্দোলনের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেন শিক্ষকরাও। দুদিন ধরে তারা সর্বাত্মক কর্মবিরতি কর্মসূচি পালন করছেন।

নতুন উপাচার্য ড. শেখ শরীফুল আলম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় একটি বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গা। এখানে ভিন্নমত থাকবেই, এটা খুবই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। চুয়েটে এই ভিন্নমত আসছে তথ্যের ঘাটতি অথবা আস্থার অভাব থেকে। এর সমাধান পেতে চাইলে দরকার উন্মুক্ত ও উদার মন-মানসিকতা নিয়ে আলোচনা। এ ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষক বা ছাত্রসমাজ যদি আলোচনার পথ উন্মুক্ত করত, তবে খুব দ্রুত আমরা একটি সমাধানে পৌঁছাতে পারতাম। আজ আমাদের তৃতীয় কর্মদিবস নষ্ট হল। ছাত্রদের বিভিন্ন গ্রুপ, ব্যাচভিত্তিক প্রতিনিধি ও ক্লাবের প্রতিনিধিরা আমার সঙ্গে এসে দেখা করে গেছেন। তারা আন্দোলনের শুরুতেও ছিলেন। আমি তাদের আশ্বস্ত করতে পেরেছি যে, একাডেমিক কার্যক্রম খুব সুন্দরভাবেই চলবে। আজ অনেক জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলেছি, তাদের মনোভাব ইতিবাচকই মনে হয়েছে। তারা দ্রুত ক্লাসে ফিরতে চান।’

তিনি বলেন, ‘চুয়েট বাংলাদেশের একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্র চাইলে যেকোনো যোগ্য ব্যক্তিকেই নিয়োগ দিতে পারে। এখানে আইনগত কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। তা ছাড়া আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন কমিটিতেও যুক্ত আছি।’ 

ছাত্র-শিক্ষকই যোগাযোগ অনেকেই যোগাযোগ করলেও কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা না যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ড. শেখ শরীফুল আলম বলেন, ‘যারা আমার কাছে আসছেন, তারা সাধারণ শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে একধরনের দ্বিধা বা লাজুকতা কাজ করে। তারা মনে করছেন মিডিয়ার সামনে দাঁড়ালে তাদের কোনো একটি পক্ষের বলে মনে করা হতে পারে। সঠিক অবস্থানে থেকেও একটি পক্ষের হয়ে যাওয়া কিংবা পরবর্তীতে 'ট্যাগিং'-এর ভয় থেকে তারা সামনে আসছেন না। তবে তারা আমাকে সমর্থন জানিয়ে যাচ্ছেন এবং অভিনন্দন জানিয়ে ক্যাম্পাসে যাওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করছেন।’

চলমান আন্দোলনের মধ্যেই তিনি ক্যাম্পাসে যাবেন কি না জানতে চাইলে ড. শেখ শরীফুল আলম বলেন, ‘আমি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে আসতে চাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অংশীজন আছেন, প্রশাসনিক বিষয়ও আছে। আমরা সবার সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা করছি। আমরা মোটামুটি একটি ভালো পর্যায়ে আছি। আশা করছি অতি দ্রুত সব পক্ষকে আস্থায় নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারব।’

সরকারের বিভিন্ন পর্যায় এবং মন্ত্রণালয়ের সাথে আমার সাথে নিয়মিতই যোগাযোগ হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তারা আমাকে আশ্বস্ত করেছে যে, চলমান সমস্যা নিরসনে কাজ চলছে।’

সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলতে একটা পক্ষ চুয়েট অচল রাখতে চায় জানিয়ে ড. শেখ শরীফুল আলম বলেন, ‘আন্দোলনের ধরন দেখে মনে হয়, একটি পক্ষ ক্যাম্পাসে অচলাবস্থা তৈরি করতে চাচ্ছে যাতে সরকার বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে। তাদের মূল উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক নয়, সরকারকে বিব্রত করতেই এই ধরনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। সরকার কাকে কখন কোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেবে, তা একেবারেই সরকারের নিজস্ব বিষয় এবং রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নির্বাচিত একটি সরকার একজনকে উপাচার্য নিয়োগ দিয়েছে, তাঁকে যোগ্য মনে করেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।’

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘ক্যাম্পাস থেকে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ আমাকে জানিয়েছে যে, তারা আন্দোলন থেকে সরে আসতে চায়। কিন্তু তাদের ভেতরে ভয় বা আশঙ্কা কাজ করছে যে, আন্দোলনের কারণে মিডিয়ায় তাদের ছবি চলে এসেছে; এতে নতুন প্রশাসন তাদের ওপর প্রশাসনিক বা একাডেমিক শাস্তি আরোপ করবে কি না। প্রতিষ্ঠানপ্রধান হিসেবে আমি বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবেই দেখতে চাই। শিক্ষার্থীদের শাস্তি দেওয়া আমার কাজ নয়, আমার কাছে সবাই সমান। আমার প্রধান কাজ একাডেমিক কার্যক্রম সমুন্নত রাখা। আমি শিক্ষার্থীদের অভয় দিয়ে বলতে চাই, কেউই একাডেমিক বা প্রশাসনিক দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।’

এদিকে অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে স্বীয় পদে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত শাটডাউন কর্মসূচি চলবে বলে পুনর্ব্যক্ত করেছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।

যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী আহনাফ শাহরিয়ার অর্ণব বলেন, আমাদের আন্দোলন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়। আমাদের একমাত্র দাবি সায়েম স্যারকে পুনর্বহাল করা। নতুন উপাচার্যের সঙ্গে আমাদের কোনো আলোচনা হয়নি। আমরা সায়েম স্যারকেই উপাচার্য হিসেবে চাই এবং এই দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কমপ্লিট শাটডাউন চলবে।

চুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে আমরা এখন পর্যন্ত কোনো সংলাপে বসার আহ্বান পাইনি। সরকার কিংবা সংশ্লিষ্ট কোনো অংশীজন—যেমন ইউজিসি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা আচার্যের দপ্তর—কোনো পক্ষ থেকেই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি।

নতুন উপাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তার সঙ্গে আমাদের কোনো আলোচনা হয়নি।’