মজুদদারি, প্রতারণা ও পরকালের দায়ভার

ব্যবসা-বাণিজ্যে লাভ করা বৈধ। লাভের জন্য মানুষের অধিকার নষ্ট করা ইসলামে অনুমোদিত নয়। মজুদদারি, প্রতারণা ও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নেওয়া অন্যায়। দুনিয়াতে কেউ প্রভাব বা ক্ষমতার জোরে অন্যের অধিকার কেড়ে নিতে পারলেও পরকালে তাকে এর হিসাব দিতে হবে।

অন্যায়ভাবে সম্পদ অর্জনের অনুমতি দেয়নি ইসলাম। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।’ (সুরা নিসা ২৯) মজুদদারি সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মজুদদারি করে, সে অপরাধী।’ (সহিহ মুসলিম)

স্বাভাবিক ব্যবসার প্রয়োজনে পণ্য সংরক্ষণ করা আর বাজারে সংকট তৈরি করে বেশি দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় পণ্য আটকে রাখা এক বিষয় নয়। বিশেষ করে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কৃত্রিমভাবে আটকে রাখলে তার প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের ঘরে গিয়ে পড়ে।

ব্যবসায় লাভ থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু লাভের জন্য প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া যাবে না। পণ্যের মান গোপন করা, ভেজাল দেওয়া, ওজনে কম দেওয়া কিংবা নিম্নমানের পণ্য ভালো বলে বিক্রি করা ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘ধ্বংস তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়।’ (সুরা মুতাফফিফিন ১)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। (সহিহ মুসলিম)

বর্তমান বাজারব্যবস্থায় প্রতারণার ধরনও বদলেছে। শুধু ওজনে কম দেওয়া নয়, পণ্যের গায়ে ভুল তথ্য দেওয়া, নিম্নমানের পণ্য ভালো বলে চালানো, কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে দাম বাড়ানো কিংবা ক্রেতার অসহায়তার সুযোগ নেওয়া একই ধরনের অনৈতিকতার মধ্যে পড়ে।

দ্রব্যমূল্যের চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ে সীমিত আয়ের মানুষের ওপর। আয় একই থাকলেও বাজার খরচ বাড়তে থাকে। তখন সংসারের অনেক প্রয়োজনের মধ্যে বেছে নিতে হয় কোনটি আগে পূরণ করা হবে। কারও সন্তানের পড়াশোনার খরচ কমে যায়, কেউ চিকিৎসা পিছিয়ে দেন, কেউ নিজের প্রয়োজন বাদ দিয়ে পরিবারের খরচ চালান।

এ পরিস্থিতিতে বাজারের সঙ্গে জড়িত সবার দায়িত্ব রয়েছে। ব্যবসায়ীকে ন্যায্যভাবে ব্যবসা করতে হবে। মজুদদারি বা কারসাজির অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। একই সঙ্গে গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের মতো মৌলিক সেবার সংকট কমানোও জরুরি। এসব খাতে সমস্যা হলে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়ে।

মানুষের সম্পদের সঙ্গে তার অধিকার জড়িত। কেউ যদি অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করে, শুধু দুনিয়াতে তার বিচার না হওয়ায় বিষয়টি শেষ হয়ে যায় না। ইসলামের শিক্ষা হলো, মানুষের অধিকার পরকালেও হিসাবের বিষয় হবে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রকৃত নিঃস্ব ব্যক্তির কথা বলেছেন। এমন ব্যক্তি কেয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও জাকাত নিয়ে আসবে। কিন্তু সে মানুষের ওপর জুলুম করেছে, কারও সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করেছে, কাউকে অপমান করেছে বা অন্যভাবে অধিকার নষ্ট করেছে। তখন তার নেক আমল ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের দিয়ে দেওয়া হবে। নেকি শেষ হয়ে গেলে তাদের গুনাহ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। (সহিহ মুসলিম)

লেখক : ধর্মীয় নিবন্ধকার