টার্গেট ১৮ দেশের বাজার

আমেরিকা ২০২৫ সালে ২৪ বিলিয়ন ডলারের ফার্নিচার পণ্য আমদানি করেছিল। এ চাহিদার অধিকাংশই পূরণ করেছে চায়না, ভিয়েতনাম, কানাডা, মেক্সিকো এবং মালয়েশিয়া। যেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের হিস্যা ছিল মাত্র ৫ দশমিক ৮৬ মিলিয়ন ডলার। বড় এই বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে বাংলাদেশ। মূলত দেশটিতে এসব পণ্য পাঠাতে নির্ধারিত মান সনদ (জিসিসি) এবং মার্কিন ভোক্তা পণ্য নিরাপত্তা কমিশনের রীতি অনুযায়ী তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পণ্য পরীক্ষার শর্ত রয়েছে তা পূরণের সক্ষমতা দেশের রপ্তানিকারকদের নেই। তবে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক রপ্তানির বড় গন্তব্য আমেরিকা।

শুধু ফার্নিচার নয়, এর পাশাপাশি দেশটিতে বাচ্চাদের খেলনা, ওষুধ, ফ্রিজ ও বাইসাইকেলের বিশাল বাজার রয়েছে। এ চিত্র আমেরিকাতেই নয়, তৈরি পোশাকের বাইরে সারা বিশে^ই আরও অন্তত ৫০টির বেশি পণ্যে রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশের আয় বৃদ্ধি এবং রপ্তানিতে তৈরি পোশাকনির্ভরতা কমাতে পণ্য ও বাজার উভয় ক্ষেত্রেই বৈচিত্র্য আনতে সমন্বিত কৌশল প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এ লক্ষ্যে বিশ্বের ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক গন্তব্যের বাজার সম্ভাবনা, বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা, প্রতিযোগী দেশগুলোর অবস্থান এবং বাংলাদেশের করণীয় বিশ্লেষণ করে পৃথক বাজারভিত্তিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কৌশল প্রণয়ন করা হচ্ছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যেসব দেশের বাজারকে নতুন পণ্যের রপ্তানি গন্তব্য হিসেবে অনুসন্ধান শুরু করেছে তার মধ্যে রয়েছে কোরিয়া, চায়না, মালয়েশিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, ইউএই, ইরান, তুরস্ক, কানাডা, ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত এবং রাশিয়ার মতো বড় বড় অর্থনীতির দেশ।

তৈরি পোশাকের বাইরে এসব বাজারে ওষুধ, ফার্নিচার, খেলনা, বাইসাইকেল, রেফ্রিজারেটর, ফুটওয়্যার, চা, ফল, সবজি, ইলেকট্রনিক্স পণ্য, চামড়াজাত পণ্য, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হালাল খাদ্য, উচ্চমূল্যের পোশাক পণ্য, হিমায়িত বা তাজা মাছ, পাট ও পাটজাত পণ্য, সিরামিকস, প্লাস্টিক পণ্য উল্লেখযোগ্য।

জানা গেছে, উল্লিখিত দেশগুলোতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়োজিত ইকোনমিক মিনিস্টার এবং কমার্শিয়াল কাউন্সেলরদের রপ্তানি বহুমুখীকরণে জন্য সম্ভাবনাময় পণ্য, রপ্তানি বাজারের চিত্র, রপ্তানি বাড়াতে বাধা বিশ্লেষণ এবং বড় প্রতিযোগী দেশগুলোর বিস্তারিত জানাতে বলা হয়েছিল। তাদের পাঠানো তথ্য সমন্বয় করে গতকাল সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে একটি কর্মশালার আয়োজন করা হয়। এতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান সভাপতিত্ব করেন। উপস্থিত ছিলেন বিজিএমইএ, ফ্লেক্সা, সিপিডি, ওয়ালটন গ্রুপ, বাংলাদেশ এগ্রোপ্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশন এবং ফার্মাসিউটিক্যালস সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতের প্রতিনিধিরা। যারা রপ্তানি সম্প্রসারণে তাদের প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। এ ছাড়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা কর্মশালায় অংশ নেন।

এ সময় বাণিজ্য সচিব আতাউর রহমান বলেন, রপ্তানিকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করতে পণ্য ও বাজার দুটিরই বৈচিত্র্যকরণে সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ উদ্দেশ্যে নির্বাচিত ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি গন্তব্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেশভিত্তিক প্রোফাইল এবং বাস্তবায়নযোগ্য কৌশল প্রস্তুত করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন বাণিজ্যিক উইং থেকে সংশ্লিষ্ট বাজারগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি, রপ্তানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাধা, বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় পণ্য এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব তথ্য সমন্বয় করে প্রতিটি দেশের জন্য পৃথক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হবে।

আতাউর রহমান খান বলেন, বাজার বিশ্লেষণের জন্য একটি নির্দিষ্ট ম্যাট্রিক্স অনুসরণ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দেশে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির অংশ, নির্দিষ্ট পণ্যে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশ, প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বৃদ্ধির উপায় এবং বাজার সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ এসব বিষয় এতে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। বিশ্লেষণের মাধ্যমে সম্ভাবনাময় নতুন পণ্য চিহ্নিত করার পাশাপাশি বিদ্যমান পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং নতুন বাজারে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।

কর্মশালায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, রপ্তানি বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে শুধু পণ্য নয়, সেবা রপ্তানিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তি, দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতি এবং সক্ষমতাবর্ধক সেবা খাতের উন্নয়নের পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সারদের বিকাশে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

তিনি দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ সাধনের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে উৎপাদন ও সেবা খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে ভৌগোলিক নৈকট্য ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে বাংলাদেশের পণ্য ও সেবা রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ জোরদার করার পরামর্শ দেন তিনি।

বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, ইলেকট্রনিকস, কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি ও অন্যান্য সেবা খাতকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা তৈরির উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়ে মতামত তুলে ধরেন কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা।

জানা গেছে, এই বাজারগুলোতে শুধু নতুন পণ্যের প্রসারে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নজর দিচ্ছে না। বরং বড় বড় প্রতিযোগী যারা আছে তাদের সঙ্গে কীভাবে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করা যায় সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ এই বাজারগুলোতে বড় প্রতিযোগী দেশের তালিকায় রয়েছে চায়না, ভিয়েতনাম, ভারত, ইতালি, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া এবং জার্মানির মতো বড় প্রতিযোগী দেশগুলো।

এর মধ্যে ১৮টি দেশের বাজারেই বড় পরিসরে রপ্তানি করে চায়না। ভিয়েতনাম ১৪টিতে, ভারত ১১টিতে, ইতালি ৮টিতে, তুরস্ক ৭টিতে, ইন্দোনেশিয়া ৬টিতে, কম্বোডিয়া এবং জার্মানি ৫টি গন্তব্যে বড় রপ্তানি করে যাচ্ছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, এলডিসি উত্তরণের পর বৈশি^ক বাণিজ্যে বাংলাদেশের সামনে যে চ্যালেঞ্জ আসবে তাকে মোকাবিলা করার জন্য সরকার এই পরিকল্পিত কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এ জন্য নতুন বাজারে প্রবেশাধিকার তৈরির জন্য যেখানে যেমন পরিকল্পনা প্রয়োজন তা নির্ধারণ করা হচ্ছে। প্রয়োজনে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি, সেপা, মানদ- পূরণে সার্টিফিকেশনের ঘাটতি পূরণ, বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো, শুল্ক চুক্তির মতো পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

এসব কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে পণ্য এবং এর নকশায় বৈচিত্র্য আনা, পণ্য উৎপাদনে কমপ্লায়েন্স ও সার্টিফিকেশন পদ্ধতি প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ, অবকাঠামো ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ, বাজার বিশ্লেষণ ও ব্র্যান্ডিংয়ে গুরুত্ব দেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। কারণ নিয়মিত পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সিন্থেটিক ও টেকনিক্যাল পোশাক, উন্নত চামড়াজাত পণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য এবং হালকা প্রকৌশল পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি ও রপ্তানি বাড়ানো প্রয়োজন।

জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য বিভিন্ন দেশের চাহিদা অনুযায়ী মোটাদাগে চামড়াশিল্পের পরিবেশগত ও টেকসই মানদ- সনদ, রাসায়নিক পদার্থের নিবন্ধন, মূল্যায়ন, অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণ সনদ, মার্কিন খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসনের অনুমতিপত্র, যুক্তরাজ্যের ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা পণ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার সনদ, বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার উত্তম উৎপাদন পদ্ধতির অনুমোদন, ইরানের মান ও শিল্প গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সনদ ও হালাল সনদ গ্রহণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এসব বাজারে প্রতিযোগিতা করতে গেলে বিভিন্ন দেশের চাহিদা অনুযায়ী এসব মানদ- পূরণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিতে যাচ্ছে। এর মধ্যে কিছু পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে আগামী এক বছরের মধ্যে, দ্বিতীয় ধাপে সেপা, অগ্রাধিকারমূল্য চুক্তির মতো কাজগুলো এক থেকে তিন বছরের মধ্যে এবং আগামী তিন থেকে সাত বছরের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে।

এ ছাড়া কর্মপরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের জন্য দেশভিত্তিক অগ্রাধিকারও নির্ধারণ করা হচ্ছে। এজন্য ১৮টি দেশকে আবার অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে তিনটি ভাগে রেখে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, জাপানের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার একটি অর্থনৈতিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। বর্তমান সরকার দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সম্প্রতি অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা) স্বাক্ষর করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির জন্য সরকার ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছে। এসব চুক্তি দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে রপ্তানির সুযোগও বাড়াবে বলে মনে করছে সরকার।