চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত মৌলভীবাজার জেলার সাত উপজেলায় রয়েছে মোট ৯২টি চা-বাগান। দেশের সর্বাধিক চা উৎপাদন হয় এ জেলায়। শুধুমাত্র দেশের সর্বাধিক চা উৎপাদনকারী জেলা হিসেবে নয়, মৌলভীবাজারের পরিচিতি পর্যটন নগর হিসেবেও। এ জেলায় রয়েছে প্রাকৃতিক পর্যটনের অপার সম্ভবনা।
জেলাটি ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও। বৈচিত্রময় সংস্কৃতির জেলা মৌলভীবাজারে রয়েছে জাতীয় উদ্যান, সংরক্ষিত বনাঞ্চল, হ্রদ, পাহাড়, টিলা, জলপ্রপাত, সবুজাভ চা বাগান, মিনি চিড়িয়াখানাসহ প্রায় শতাধিক মনোমুগ্ধকর পর্যটন স্পট।
এসব পর্যটন স্পটের মধ্যে অন্যতম আকর্ষন হলো চা-বাগানের জলাধার, হ্রদ বা লেক। শুষ্ক মৌসুমে চা-গাছের জন্য প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে জেলার ৯২টি চা বাগানের প্রতিটিতেই খনন করা হয়েছে একাধিক বিশালাকার একাধিক জলাধার। চা বাগানের সুউচ্চ টিলার ভাজে ভাজে খনন করা এসব জলাধার শরৎকালে লাল, সাদা শাপলা আর পদ্মে থাকে ভরপুর। চা-বাগানের এসব জলাধার ঘিরে জেলার পর্যটন শিল্প হচ্ছে সমৃদ্ধ। প্রতিদিনই
হাজারো পর্যটকের আগম ঘটে এসব জলাধার বা লেকে। যদিও এসব জলাধারে গমন করতে হলে সংশ্লিষ্ট চা বাগান কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া আবশ্যক।
মৌলভীবাজারের ৯২টি চা-বাগানের জলাধারের মধ্যে কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর চা-বাগানের মাধবপুর লেক, শ্রীগোবিন্দপুর চা-বাগান লেক, শমসেরনগর নগর চা-বাগানের ক্যামেলিয়া লেক, পাত্রখোলা চা-বাগান লেক, রাজনগর উপজেলার উত্তরভাগ চা-বাগানের বরতল লেক, মাথিউরা চা বাগান লেক, শ্রীমঙ্গল উপজেলার রাজঘাট চা-বাগানের রাজঘাট লেক, ভাড়াউড়া চা-বাগান লেক, শংকর টিলা লেক, ভুরভুরিয়া চা-বাগানের চম্পা লেক, কালিঘাট চা-বাগান লেক, বড়লেখা উপজেলার পাথারিয়া চা-বাগানের বেকি লেক, কুলাউড়া উপজেলার হিংগাজিয়া চা-বাগান লেক প্রভৃতি ছোট-বড় জলাধার বা লেক ইতোমধ্যে দেশব্যাপী ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে।
চা-বাগানের লেকগুলো একদিকে শুষ্ক মৌসুমে চা-গাছ বাঁচিয়ে রাখতে পানি সরবরাহের একমাত্র মাধ্যম অন্যদিকে বাগানের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করছে। এছাড়াও মৌলভীবাজার জেলা ভ্রমণে আসা দেশি-বিদেশী পর্যটকদের তনোমন ভরিয়ে দিচ্ছে চা-বাগানের অপার সৌন্দর্যময় লেকগুলো।
অনেক পর্যটক চা-বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি বাগানের টিলার ভাজে ভাজে কৃত্রিমভাবে খননকৃত লেকের সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভিড় করেন লেকগুলোতে। তবে জেলার সব চা-বাগানের লেক পর্যটক এবং সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত নয়। বাগান কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে এসব লেকে ভ্রমণ করা যায়।
নরষিংদী জেলা থেকে মৌলভীবাজার জেলা ভ্রমণে সপরিবারে আগত পর্যটক ইয়াসিন মোল্লা বলেন, ‘আমি পরিবারসহ আগেও মৌলভীবাজার জেলায় এসেছি। এ জেলাটির সৌন্দর্য সব সময় আমার মনকে প্রশান্তিতে ভরিয়ে দেয়। এবারও আসলাম এবং আলাদা এক স্বাদ নিলাম। এবার অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর চা বাগানের কয়েকটি লেকে গিয়েছি। শুনেছি এসব লেকে প্রতি বছর শীত মৌসুমে পাখিদের কিচির-মিচির শব্দে মুখরিত থাকে। ইচ্ছে আছে শীতের শেষদিকে আবারও আসার। তবে অধিকাংশ চা বাগান কর্তৃপক্ষ এসব মনোমুগ্ধকর লেকে প্রবেশে কড়াকাড়ি আরোপ করেন। বুঝিয়ে বললে লেক এলাকায় প্রবেশ করতে দেন কর্তৃপক্ষ। আমি মনে করি পর্যটনের অপার সম্ভবনাময় জেলা মৌলভীবাজারের পর্যটনশিল্পে চা বাগানের লেকগুলোও ভূমিকা রাখতে পারে। তাই চা-বাগানের সকল লেকগুলোতে পর্যটক প্রবেশ উন্মুক্ত করে দেওয়া প্রয়োজন।
উদাহরণ স্বরূপ কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর চা বাগান লেক সকলের জন্য উন্মুক্ত। এ লেকে যাবার পর প্রথমেই গাড়ি বা মোটরসাইকেল পার্কিং ফি পরিশোধ করতে হয়। এতে বাগানের আয় হচ্ছে। আর এ লেকে অনেক বেকার শ্রমিক খাবারের
দোকানসহ বিভিন্ন মনোহারী পন্যের দোকান দিয়ে বসেছেন। এতে অনেক বেকার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে এবং তাদের পরিবার অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী হচ্ছে।’
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি এলাকা থেকে আগত পর্যটক মো. রফিক বলেন, ‘আমি জীবনে প্রথমবারের মতো মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলে ভ্রমণে এসেছি। এখানে এসে সাদ্দামের চায়ের দোকানে চা পানের পর পাশের চম্পা লেকে গেলাম। চা বাগানের ভেতরে অসাধারণ এই লেকটি প্রকৃতির এক অপরূপ সৃষ্টি। এ স্থানটি না দেখলে আমার প্রথমবারের মতো শ্রীমঙ্গল ভ্রমণ যে অস্পূর্ণই থেকে যেত।’
ঢাকা মিরপুর এলাকার বাসিন্দা মোবাইল ফোন সেট ব্যবসায়ী আমির আলী বলেন, ‘আমি ব্যবসার প্রয়োজনে দেশের বিভিন্ন জেলায় যাই। মৌলভীবাজার জেলায়ও বেশ কয়েকবার এসেছি। মৌলভীবাজারে আসলেই চা বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ না করে ফিরে যাই না। প্রতিবারই কোন না কোন চা বাগানে গিয়ে চা বাগানের মনোমুগ্ধর লেকগুলোর পানিতে পা ভিজিয়েছি। প্রায় সবগুলো লেকই লাল বা সাদা শাপলায় পরিপূর্ণ। উঁচু নিচু চায়ের টিলা এবং লেকগুলোর মনকাড়া সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করে।’