মাঠে গমের আবাদ হচ্ছে, উৎপাদনও হচ্ছে, প্রতি মৌসুমে সরকারি গুদামে গম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রাও থাকছে। কিন্তু পাঁচ বছর ধরে বাগাতিপাড়ার সরকারি খাদ্যগুদামে জমা পড়েনি এক ছটাক গমও। লক্ষ্যমাত্রা পূরণে মাইকিং, লিফলেট বিতরণসহ নানা প্রচারণা চালিয়েও কৃষকদের গুদামমুখী করতে পারছে না উপজেলা খাদ্য দপ্তর। ফলে বছরের পর বছর ধরে গম সংগ্রহ ছাড়াই চলছে সরকারি খাদ্য সংগ্রহ কার্যক্রম। অন্যদিকে গুদামে গম দিতে নানা শর্ত ও ঝামেলার পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে তুলনামূলক বেশি দামে সহজে গম বিক্রির সুযোগ থাকায় সরকারি গুদামে গম দিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন কৃষকরা। এভাবে বছরের পর বছর লক্ষ্যমাত্রা কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকছে।
উপজেলা খাদ্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের মে মাসে সর্বশেষ বাগাতিপাড়া খাদ্যগুদামে গম সংগ্রহ হয়েছিল। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে গম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, প্রচার-প্রচারণা ও কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে সভা-সেমিনার করা হলেও কোনো মৌসুমেই গম সংগ্রহ করতে পারেনি দপ্তর। চলতি মৌসুমে গত ৩ মে ২০২৬ থেকে ৯৩৬ মেট্রিক টন গম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে গম সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয় এবং গত ৩১ আগস্ট গম সংগ্রহের অভিযান শেষ হয়েছে। গমের দাম প্রতি কেজি ৩৬ টাকা (মণপ্রতি ১,৪৪০ টাকা) নির্ধারণ করা হলেও জটিল নিয়মনীতি ও বাজারদরের তারতম্যের কারণে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন চাষিরা।
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে বাগাতিপাড়ায় ৫ হাজার ২৯০ হেক্টর জমিতে গমের আবাদ হয়েছে। এ বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ২১ হাজার ৭৭১ মেট্রিক টন, আর প্রকৃত উৎপাদন হয়েছে ২১ হাজার ৬৮৯ মেট্রিক টন। এর আগের মৌসুমে উপজেলায় ৪ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে গমের আবাদ হয়েছিল, যেখানে উৎপাদন হয়েছিল ১৫ হাজার ৭২৫ মেট্রিক টন।
কৃষক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারি খাদ্যগুদামে গম না আসার প্রধান কারণ বাজারদর ও সরকারি শর্তের কঠোরতা। বর্তমানে উন্মুক্ত বাজারে প্রতি মণ গম বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৪৮০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায়, যা সরকারি দামের চেয়ে মণপ্রতি অন্তত ৪০-৫০ টাকা বেশি। এ ছাড়া গুদামে গম বিক্রি করতে হলে আর্দ্রতার মাত্রা সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশের মধ্যে রাখতে হয়। অথচ বাজারে ১৮ শতাংশ আর্দ্রতা থাকলেও ব্যবসায়ীরা সহজেই গম কিনে নিচ্ছেন। চাষিদের অভিযোগ, গুদামে গম নিয়ে গেলে কুলি খরচ, গাড়িভাড়া ও পরিমাপের ঝামেলায় মণপ্রতি আরও প্রায় ৫০ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়। ফলে লোকসান ও হয়রানি এড়াতে অধিকাংশ কৃষক খোলা বাজারেই গম বিক্রি করে দিচ্ছেন।
উপজেলার যোগীপাড়া গ্রামের কৃষক আলাউদ্দিন বলেন, ‘সরকারি গুদামে গম দিতে গেলে নানা নিয়মকানুন ও ঝামেলা থাকে। বাজারে ব্যবসায়ীরা বাড়ি থেকেই গম কিনে নেন এবং দামও তুলনামূলক ভালো পাওয়া যায়। আবার গুদামে গম নিয়ে যাওয়ার পরিবহন খরচও আছে। ’
উপজেলার চকমহপুর গ্রামের কৃষক নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘গুদামে গম না দেওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে দামের পার্থক্য। তার ওপর গুদামে পরিবহন খরচ, কুলি খরচ, গমের আর্দ্রতা যাচাইসহ নানা রকম ঝামেলা পোহাতে হয়। ’
উপজেলার মালঞ্চি বাজারের ব্যবসায়ী সোহেল রানা বলেন, ‘বর্তমানে প্রতি মণ গমের বাজারদর প্রায় ১ হাজার ৪৮০ টাকা থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। সরকারি ক্রয়মূল্য বাজারমূল্যের চেয়ে কম হওয়ায় কৃষকরা গুদামে গম বিক্রিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এ ছাড়া ব্যবসায়ীরা সরাসরি কৃষকের বাড়ি থেকে গম সংগ্রহ করায় তাদের পরিবহন খরচও বাঁচছে। বেশি দাম ও ঝামেলামুক্ত বিক্রির সুযোগ থাকায় কৃষকরা খোলা বাজারকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন।’
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ডা. ভবসিন্ধু রায় বলেন, ‘কৃষকরা যেখানে তাদের উৎপাদিত গমের ভালো দাম পাবেন, স্বাভাবিকভাবেই সেখানে বিক্রি করবেন। চলতি বছর উপজেলায় গম উৎপাদনের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা প্রায় পূরণ হয়েছে। কৃষকরা ভালো দাম পেলে সরকারি খাদ্যগুদামেও গম সরবরাহ করবেন বলে আমরা আশা করছি।’
উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (চলতি দায়িত্ব) লাভলী খাতুন বলেন, ‘সরকারিভাবে গম সংগ্রহের নির্দেশনা পাওয়ার পর কৃষকদের নিয়ে উপজেলা পরিষদে মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। পাশাপাশি মাইকিং ও লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে প্রচারণাও চালানো হয়েছে। তবে তার মতে, সরকারি ক্রয়মূল্য বাজারদরের চেয়ে কম হওয়ায় কৃষকরা গুদামে গম সরবরাহে আগ্রহী হচ্ছেন না।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শামসুল ইসলাম বলেন, ‘তিনি নতুন আসায় বিষয়টি তার জানা ছিল না। তিনি আশ্বাস দেন, খোঁজখবর নিয়ে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে। ভবিষ্যতে কৃষকবান্ধব ব্যবস্থা ও বাস্তবসম্মত মূল্য নির্ধারণ করা হলে সরকারি গুদামে গম সরবরাহ বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।’