মহাভৃঙ্গরাজে পিঙ্গল শিখীপর্ণ

পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে পিদিম ফাউন্ডেশনের পরামর্শক হিসেবে ‘সম্পদ-সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন উৎপাদন পদ্ধতির মাধ্যমে পোলট্রি উপখাতে টেকসই প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিতকরণ’ শীর্ষক উপ-প্রকল্পের ভিত্তি-জরিপ তদারকির জন্য গত ২৩ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার মল্লিকবাড়ি এলাকায় গেলাম। সকাল ৮টায় ঢাকা থেকে রওনা হয়ে ভালুকা বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছতেই বেলা ১১টা। ওখানে আগে থেকেই বন্ধুসহ অপেক্ষা করছিল গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ অনুষদের

তৃতীয় বর্ষের ছাত্র সাবিল পাঠান। তিনি ভালুকারই সন্তান। তারা মোটরসাইকেলে আমার গাড়ির আগে আগে থেকে ছয় থেকে সাত কিলোমিটার দূরের পিদিম ফাউন্ডেশনের শাখা অফিসে নিয়ে গেল। ওখানে অপেক্ষা করছিলেন সম্রাট নন্দী নামে এক কর্মকর্তা। অফিসে পৌঁছেই সম্রাটকে গাড়িতে তুলে খামার পরিদর্শনে গেলাম।

প্রথমেই একটি লেয়ার বা ডিমপাড়া মুরগির খামার পরিদর্শন করলাম। এরপর একে একে চারটি ব্রয়লায় বা মুরগির খামার দেখলাম। এখানকার গ্রামীণ রাস্তার দুপাশে প্রচুর মাছের খামার। এ ছাড়া আখ ও ধানক্ষেত এবং হলুদ ও কলাবাগানের কমতি নেই। রাস্তার দুপাশের চমৎকার গ্রামীণ পরিবেশ। বহুদিন পর গ্রামীণ পরিবেশে এলাম। গাড়ি যখন পত্রঝরা বনের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলল তখন মনটা ভালো হয়ে গেল। এখানে এখনো যে বন টিকে আছে তাতেই আশ্চর্য হলাম। গাড়ি চলতে চলতে মল্লিকবাড়ি থেকে আরও সাত থেকে আট কিলোমিটার দূরে ডাকাতিয়া ইউনিয়নের ছিটাল পাড়া গ্রামে এসে থামল। এটিই ভালুকার শেষ গ্রাম। এখানে একটি লেয়ার, দুটি ব্রয়লার ও একটি কোয়েল-তিতির খামার পরিদর্শন শেষে খামারের মালিক মোখলেছুর রহমানের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যেই না গাড়িতে উঠতে যাব অমনি গাড়ির পাশে মহাভৃঙ্গরাজ লতা দেখে দাঁড়িয়ে পড়লাম।

লতা গাছগুলো হলুদ রঙের চমৎকার ফুলে ছেয়ে আছে। আর ফুলে ফুলে রস খেয়ে বেড়াচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির প্রজাপতি। কি পাহাড়, কি সমতলভূমি, কি ঢাকা বিমানবন্দর, যেখানেই এ গাছ দেখেছি সেখানেই যেন প্রজাপতির মেলা! সম্রাটকে বললাম, কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিন। আমি এই সুন্দর পতঙ্গগুলোর সঙ্গে অন্তত মিনিট পনের সময় কাটাই। এদের মধ্যে খয়ের বা পিঙ্গল বর্ণের মাঝারি আকারের একটি প্রজাপতির ডানা মেলা ছবি তুলতে গিয়ে ঘামে নেয়ে উঠলাম। প্রচ- রোদ আর গরমে গায়ের শার্ট পুরোপুরি ভিজে গেল। ডানা মেলা অবস্থায় পতঙ্গটির ছবি তুলে গাড়িতে উঠলাম।

ভালুকার ডাকাতিয়া ইউনিয়নের ছিটাল পাড়া গ্রামের কাকের মোড়ে দেখা এই পতঙ্গটি এদেশের সচরাচর দৃশ্যমান ও স্বল্প ঝুঁকিসম্পন্ন প্রজাপতি পিঙ্গল শিখীপর্ণ। পশ্চিমবঙ্গে উষুম নামে পরিচিত। ইংরেজি নাম খবসড়হ চধহং। নিম্ফালিডি গোত্রের প্রজাপতিটির বৈজ্ঞানিক নাম ঔঁহড়হরধ ষবসড়হরধং। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এ পতঙ্গটির দেখা মিলে।

পিঙ্গল শিখীপর্ণ মাঝারি আকারের প্রজাপতি। প্রসারিত অবস্থায় সামনের দুই ডানার বিস্তার ৪৫-৬০ মিলিমিটার। ডানাসহ দেহের ওপরটা গাঢ় বাদামি ও নিচটা হলদে-বাদামি। সামনের ডানার ওপরের প্রান্তে চারটি করে খয়েরি আড়াআড়ি ঢেউ খেলানো রেখা রয়েছে। এ ছাড়া প্রতি ডানায় দুটি করে ময়ূরের পেখম পালকে যেরকম চোখ থাকে তেমন চোখের মতো ফুটকি দেখা যায়। তবে এসব চোখের রঙ হয় উজ্জ্বল লেবু-হলুদ। পেছনের ডানার নিচের প্রান্তেও এ রকম চোখের মতো ফুটকি ও রেখা রয়েছে। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে অনেকটা একই রকম হলেও বর্ণ পুরুষের থেকে ফ্যাকাশে।

বন কিংবা সমতলভূমি, দেশের সর্বত্রই প্রজাপতিটিকে দেখা যায়। সচরাচর ভূমির কাছাকাছি দৃঢ়, দ্রুত ও সোজাভাবে উড়ে। দ্রুত ডানা ঝাপটায়। ফুলের রস বেশ পছন্দ।

কাঁটাজন্তি, লাল বেরেলা, কোস্টা ইত্যাদি প্রজাপতিটির পোষক গাছ। স্ত্রী প্রজাপতি এসব গাছের পাতার নিচের দিকে একটি করে ছোট ও সবুজ পিপা আকৃতির ডিম পাড়ে। ডিমগুলোর গায়ে লম্বালম্বি খাঁজ বা রেখা থাকে। ডিম ফুটে শুককীট বের হতে প্রায় তিন দিন লাগে। সদ্য ফোটা নলাকার ও ফ্যাকাশে কালো রঙের শুককীটের দেহে হালকা নীলচে আভা থাকে। শুককীটের গায়ে কাঁটা ও মাথার পেছনে কমলা রঙের বলয় দেখা যায়। কোনোভাবে বিরক্ত হলে বা বিপদের সম্মুখীন হলে এটি নিজেকে গুটিয়ে বলের মতো করে ফেলে। শুককীট ১২-১৯ দিনে পাঁচবার খোলস পাল্টে মূককীটে পরিণত হয়। সচরাচর মাটির কাছে ঘন পাতার আড়াতে শুককীট মূককীটে পরিণত হয়। ছোট্ট ও শক্ত গঠনের মূককীটের পিঠ রুক্ষ। বাদামি বর্ণের বিভিন্ন শেড ও রেখায় আবৃত থাকায় এটি আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে চমৎকারভাবে মিলেমিশে থেকে শত্রুর হাত রক্ষা পায়। মূককীটের খোলস কেটে ৬-১৫ দিন পর পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতি বের হয়ে আসে। জীবন চক্র সম্পন্ন হতে মাত্র ২০-৩৫ দিন সময় লাগে।

লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ