চিকিৎসা ও পরিবারের সহায়তায় মিলবে মুক্তি

রাজধানী ধানম-ির একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন সাথী (ছন্মনাম)। চাকরিসূত্রে সমবয়সী মারুফের সঙ্গে তার পরিচয়। একদিন মারুফ তাকে বন্ধুদের আড্ডায় নিয়ে যান। সেখানে অন্যদের প্ররোচনায় প্রথমবার মাদক নেন সাথী। এরপর ধীরে ধীরে তিনি মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েন। ছয় মাসের মধ্যে মাদকের জন্য নিজেই মারুফের কাছে বায়না ধরতেন। অফিসের কাজে মনোযোগ কমে যায়, পরিবারকে টাকা পাঠানোও কমিয়ে দেন। বিষয়টি বুঝতে পেরে এক বান্ধবী তাকে জোর করে মনোরোগ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। চিকিৎসক তাকে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেন।

চিকিৎসকের নির্দেশনাগুলোর অন্যতম ছিল মাদক গ্রহণকারী সঙ্গী আর মাদক কারবারির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা। প্রয়োজনে মুঠোফোন নম্বর বদলে ফেলা। সামাজিক মাধ্যম ডিঅ্যাকটিভেট করে দেওয়া। মাদক নেয় না, এমন বন্ধুদের সঙ্গে থাকা। মাদক গ্রহণের স্থানগুলো এড়িয়ে চলা। নিয়মিত চিকিৎসক আর মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা। সবকিছু মানতে রাজি সাথী। মন থেকেই মাদক থেকে বের হয়ে আসতে চাইছিলেন তিনি। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা শুরু করেন। চিকিৎসক কিছু প্রয়োজনীয় ওষুধ দিলেন। সেগুলোও খেতে লাগলেন। কাছের মানুষ, সহকর্মী ও চিকিৎসকদের দেড় বছরের প্রচেষ্টায় সাথী এখন সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত। অফিসে মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক আলোচনার আয়োজনের দায়িত্বও পেয়েছেন তিনি। সাথী বলেন, হয়তো এটা সবার কাছে খুব স্বাভাবিক বিষয়। এই চিকিৎসার পুরো সময়টা কত কঠিন ছিল, কীভাবে সুস্থ হয়েছি, আমি জানি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের সঙ্গে প্রায়ই শহীদ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আড্ডা দিতেন নোলক (ছদ্মনাম)। বন্ধুরা উদ্যান থেকে মাদক কিনে সেবন করতেন। তারা নোলককেও প্ররোচিত করতেন। নোলক মাদক নিতে রাজি হননি। কিন্তু মাদকাসক্ত বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে আর কৌতূহল থেকে একদিন মাদক সেবন করেন। সেই থেকে নেশার জগতে হাত বাড়ান নোলক। এরপর থেকে হাতের কাছে যা পেয়েছেন, তা দিয়েই নেশা করতেন। নেশার টাকা জোগাড় করতে বাসার জিনিসপত্র চুরি করেছেন, এমনকি ছিনতাই-রাহাজানিতেও জড়িয়েছেন। ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক নেওয়ার প্রভাব ধীরে ধীরে সবার চোখে পড়ে। আড্ডা কিংবা কাজ- যেখানেই যেতেন, ঝিমাতেন। মায়ের সঙ্গে, বোনের সঙ্গে খারাপ আচরণ করতেন। একসময় পরিবার বুঝতে পারে, নোলক মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েছেন। নোলকও বুঝতে পারেন, এই নেশা তাকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু কীভাবে ফিরবেন, তা জানতেন না। ছেলে ও পরিবার যখন হতাশ, তখন একদিন নোলকের মায়ের চোখে পড়ে ‘চিকিৎসা ও পরিবারের সহায়তায় মাদকাসক্তকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব’ এমন একটি লেখা। ছেলেকে সুস্থ করার শেষ আশায় নোলককে একটি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে নিয়ে যান মা। নোলকের কথা শুনে সেখানকার চিকিৎসক আগেই জানতে চান, নোলক সত্যিই সুস্থ হতে চান কি না। তিনি সুস্থ হওয়ার ইচ্ছার কথা জানান। শুরু হয় নোলকের চিকিৎসা। সেখানে ছয় মাস থেকে পুরোপুরি সুস্থ হন নোলক। নোলকের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার ঘটনা বর্ণনা করেন তার মা। তিনি বলেন, ছেলের সুস্থতার অপেক্ষায় পুরো সময় ধৈর্য ধরে পাশে ছিলাম। আমার সহযোগিতা ও চিকিৎসায় ধীরে ধীরে বদলে যায় আমার ছেলের জীবন। 

এ রকম আরও একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। যারা এক সময় মাদকে আসক্ত ছিলেন, পরে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র থেকে চিকিৎসাসেবা, কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপিসহ নানাভাবে মাদকমুক্ত হয়ে বর্তমানে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। তাদের পরামর্শ, মাদকসেবীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব বা সঙ্গ না করা এবং কৌতূহলবশতও মাদক গ্রহণ না করা। তবে কেউ মাদকে আসক্ত হয়ে পড়লে হতাশ না হয়ে পরিবারের সহায়তা ও যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে মাদকমুক্ত হয়ে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরা সম্ভব। চিকিৎসকরাও বলছেন, চিকিৎসা ও পরিবারের সহায়তার মধ্য দিয়ে একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে মাদকমুক্ত করা সম্ভব। 

এ প্রসঙ্গে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোহিত কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, মাদকাসক্তি নিরাময়যোগ্য। রোগীকে বাড়িতে রেখে চিকিৎসা করা যায় না, বরং নিরাময় কেন্দ্রে রেখে চিকিৎসা করা দরকার। মাদকাসক্ত ব্যক্তির মাদক ছাড়ার ইচ্ছা থাকতে হবে। চিকিৎসা শেষে কমপক্ষে দুই বছর যদি মাদক গ্রহণ না করেন, তবে ধরে নেওয়া যায় তিনি মাদকমুক্ত হয়েছেন। মাদকাসক্তির সঙ্গে মানসিক রোগের একটা সম্পর্ক আছে। মাদকাসক্ত ব্যক্তির মানসিক অনেকগুলো রোগের লক্ষণ দেখা যেতে পারে।

প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুসারে, দেশে বর্তমানে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৮২ লাখ। ২০১৮ সালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের গবেষণায় এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৬ লাখ। গবেষণা অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় ৬১ লাখ মানুষ গাঁজা ব্যবহার করেন। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, তরুণ বয়সেই মাদক ব্যবহারের সূচনা হচ্ছে। স্কুলশিক্ষার্থী থেকে শুরু করে কর্মজীবী, পেশাদার অপরাধী, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য-বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ আছে এ তালিকায়। এসব মাদকসেবীর অনেকে ছিনতাই, খুন, ধর্ষণসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছে। দেশে এত বেশিসংখ্যক মাদকাসক্ত থাকলেও তাদের চিকিৎসার জন্য নেই পর্যাপ্ত নিরাময় কেন্দ্র। সরকারি-বেসরকারি মিলে মাত্র ৩৯০টি নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রে বেড রয়েছে ৬ হাজার ৩২৯টি। চাহিদার তুলনায় শয্যা ও কেন্দ্রের চরম সংকট রয়েছে। বর্তমানে মাদকাসক্তের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। সে তুলনায় নিরাময় কেন্দ্রের সংখ্যা একেবারেই অপ্রতুল। ফলে বিপুলসংখ্যক মাদকাসক্ত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত। এদিকে নিরাময় কেন্দ্রগুলোর মধ্যে হাতেগোনা দু-একটি মানসম্মত। অধিকাংশই নামমাত্র চিকিৎসা দিয়ে বাণিজ্য করে থাকে। বেসরকারি পর্যায়ে চিকিৎসাব্যয় সাধ্যের বাইরে থাকায় অনেক দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা চিকিৎসাও নিতে পারছে না। তবে নতুন করে দেশে আরও আটটি সরকারি নিরাময় কেন্দ্র করা হচ্ছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে, দেশের সাত বিভাগীয় শহরে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট সাতটি এবং ঢাকায় ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট একটি সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র করার পরিকল্পনা রয়েছে। ১৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নিরাময় কেন্দ্রগুলো করার কথা রয়েছে। তবে এটি এখনো পরিকল্পনা পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন যুগ্ম সচিব (মাদক অধিশাখা) এ এফ এম এহতেশামূল হক।

মাদকাসক্তদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া নিরাময় কেন্দ্রগুলোর একটি আহ্ছানিয়া মিশন। সংস্থাটির পাঁচটি মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে নারী ও পুরুষের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। তথ্যমতে, গত ২০ বছরে প্রতিষ্ঠানটিতে চিকিৎসাসেবা নিয়েছে ২ হাজার ৭৮৯ জন রোগী। এর মধ্যে মাদকাসক্ত ২ হাজার ১৪২ জন ও মানসিক সমস্যায় ৬৪৭ জনকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত সুস্থতার হার ৭৫ শতাংশ। তবে এসব রোগীর মধ্যে ২৯ দশমিক ৮ শতাংশ ইয়াবা ও ৩৩ দশমিক ৮ শতাংশ গাঁজা সেবনকারী। সংস্থাটি বলছে, দিন দিন গাঁজা ও ইয়াবা সেবনকারীর সংখ্যা বাড়ছে। পারিবারিকভাবে সচেতনতা বাড়ানো উচিত। মাদকাসক্তির লক্ষণ দেখামাত্রই সঠিক কাউন্সেলিং করা জরুরি।  

ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের সিনিয়র সাইক্লোজিস্ট (স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টর) রাখী গাঙ্গুলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, মাদকাসক্তি কোনো নৈতিক ব্যর্থতা নয়; এটি একটি জটিল মানসিক ও আচরণগত স্বাস্থ্য সমস্যা। মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে ‘শেষ হয়ে যাওয়া মানুষ’ নয়, পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। সঠিক চিকিৎসা, পারিবারিক সহায়তা ও ধারাবাহিক মনোসামাজিক সহযোগিতার মাধ্যমে সুস্থ জীবনে ফেরা সম্ভব।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অর্থায়নে করা এক গবেষণায় দেখা যায়, শহরে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেশি হলেও গ্রামাঞ্চলে এর বিস্তার দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলা ও বড় শহরের আশপাশে মাদক সরবরাহ ও ব্যবহারের ঝুঁঁকি বেশি। ৬০ শতাংশের বেশি মাদক ব্যবহারকারী ১৮ বছর বয়সের আগেই প্রথম মাদক নেয়। প্রধান কারণ বন্ধুদের প্রভাব, কৌতূহল, পারিবারিক অশান্তি ও মানসিক চাপ। মাদকাসক্তদের বড় অংশ চিকিৎসা বা পুনর্বাসন সেবা নেয় না। যারা নেয়, তাদের অনেকেই ধারাবাহিক সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় পুনরায় মাদক গ্রহণের ঝুঁকিতে থাকে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের দেশে জনসংখ্যার আধিক্যের কারণে মাদকাসক্তের সংখ্যাও বেশি। মাদকে আসক্ত বৃহৎ সংখ্যক মানুষের  চিকিৎসাসেবার জন্য বেসরকারি ৩৮৬টি এবং সরকারিভাবে চারটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে। এটি আরও বৃদ্ধি করা হচ্ছে। তবে কেউ যেন মাদক না নেয়সেটি পরিবারকেই খেয়াল রাখতে হবে। পরিবার সবচেয়ে বড় শিক্ষালয়, চিকিৎসাকেন্দ্র। চাহিদা থাকায় মাদকের সরবরাহ বাড়ছে। নেশার প্রতি আসক্তি না জন্মালে চাহিদাও কমে আসবে।

আসক্তি পুনরুদ্ধার দিবস আজ : মাদকাসক্তি থেকে চিকিৎসা ও পরিবারের সহায়তায় সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার বার্তা সামনে রেখে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিত হয় আন্তর্জাতিক রিকভারি দিবস বা আসক্তি পুনরুদ্ধার দিবস)। প্রতি বছর ৩০ সেপ্টেম্বর দিবসটি পালিত হয়। বাংলাদেশেও মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র, সামাজিক সংগঠন ও বিভিন্ন এনজিওর উদ্যোগে দিনটি পালন করে। আহ্ছানিয়া মিশন মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রসহ বেশ কয়েকটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র ও এনজিও দিবসটি পালন করবে।