কন্যাশিশুরা নিরাপদ নয়!

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ৭ বছরের কন্যাশিশু মাহিদা, একই বয়সী জামালপুরের মরিয়ম বুশরা ও বাগেরহাটের মুসলিমাদের না জানি কত সম্ভাবনাময় জীবন ছিল; কিন্ত এই মায়াবী মুখগুলো এখন স্মৃতির পাতায়। এই সেপ্টেম্বরেই ওই তিন কন্যাশিশু মানুষ নামক নরপশুদের পৈশাচিক আক্রমণ ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছে। দেশজুড়ে এ মাসেই গণমাধ্যমে প্রকাশিত এমন ঘটনার সংখ্যা কমপক্ষে ৫টি। যে বয়সে শিশুদের দৃষ্টিজুড়ে সব বিষয়ে কৌতূহল, মনে অদম্য ইচ্ছে জানার সে বয়সেই ওইসব কচিপ্রাণ নিষ্ঠুরতার বলি হয়ে চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেছে। আকাশে-বাতাসে এখন শুধুই ওদের মা-বাবা ও স্বজনদের আর্তনাদ-আহাজারি ভেসে বেড়ায়। এই রাষ্ট্র, আইন, পুলিশ, সমাজ এমনকি পরিবারও তাদের বেড়ে উঠার উপযোগী নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারেনি। সাধারণভাবেই প্রশ্ন উঠে, দেশে কি কন্যাশিশুরা নিরাপদ নয়! 

আজ বুধবার জাতীয় কন্যাশিশু দিবস। আমাদের সমাজে যাতে নারীরা ভেদাভেদ বা বৈষম্যের শিকার না হন, সেদিকে লক্ষ্য রেখে জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্য নিয়ে ২০০০ সাল থেকে প্রতি বছর ৩০ সেপ্টেম্বর জাতীয় কন্যাশিশু দিবস পালিত হয়ে আসছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত বাংলাদেশে কমপক্ষে ১১৮ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং ধর্ষণের পর বা ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে ১৭ কন্যাশিশুকে হত্যা করা হয়েছে। কেবল আগস্ট মাসেই ৩৬ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয় এবং ১ কন্যাশিশুসহ দুজনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। সেপ্টেম্বর মাসে কমপক্ষে ৫ জন কন্যাশিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে গত ৮ মাসে ৩৬ কন্যাশিশু বিভিন্ন ঘটনায় হত্যার শিকার হয়েছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ড. মাখদুমা নার্গিস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে কন্যাশিশু নির্যাতন চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে গেছে। যৌননিপীড়ন ছাড়াও, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত শত্রুতা থেকেও কন্যাশিশুরা হত্যা ও গুমের শিকার হচ্ছে। সার্বিকভাবে দেশে শিশুদের ওপর নির্যাতন ও নিষ্ঠুরতা বেড়েছে।’

মহিলা পরিষদের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে নির্যাতনের শিকার হওয়াদের মধ্যে ১ হাজার ২৩৪ জন কন্যা ও ১ হাজার ৫৭৪ জন নারী। সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে যৌন সহিংসতার ক্ষেত্রে। গত বছরে দেশে মোট ৭৮৬ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ৫৪৩ জন কন্যাশিশু ও ২৪৩ জন নারী।

সংগঠনটি গণমাধ্যম থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করে এবং নারী ও কন্যাশিশুর সুরক্ষায় বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে থাকে। পরিষদের তথ্য থেকে জানা গছে, ২০২৫ সালে ধর্ষণের ঘটনাগুলোর মধ্যে ১০৪ জন কন্যা ও ৭৫ জন নারীসহ ১৭৯ জন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ ছাড়া ১৮ জন কন্যা ও ১৩ জন নারীসহ ৩১ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে এবং পাঁচজন কন্যা ও দুই নারীসহ সাতজন ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যা করেছে। একই সময়ে ১৪৭ জন কন্যা ও ৪১ জন নারীসহ ১৮৮ জন ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছেন। যৌননিপীড়নের শিকার হয়েছেন ১৬৯ জন, যার মধ্যে ১১২ জন কন্যা। উত্ত্যক্তের শিকার হয়েছে ৫৫ জন। এ কারণে একজন কন্যা ও তিনজন নারীসহ চারজন আত্মহত্যা করেছেন। সাইবার সহিংসতার শিকার হয়েছে ছয় কন্যাসহ ১৯ জন।

ড. মাখদুমা নার্গিস বলেন, এই যে এত অপরাধ ঘটছে তার অন্যতম একটি কারণ হলো সাম্প্রতিক সময়ের মব সংস্কৃতি। এ কারণে সমাজের অনেক সৎ ও নীতিবান দেশপ্রেমিক মানুষ চুপ হয়ে গেছেন। তারা আর এখন কথা বলেন না। এই পরিস্থিতি একটি সমাজ ও দেশের জন্য ভয়াবহ। তিনি বলেন, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যখন নিয়ন্ত্রণে থাকে না তখন এই অবস্থা তৈরি হয়। এ ছাড়া, নারী সুরক্ষার বিরুদ্ধে ধর্মান্ধদের বিভিন্ন মন্তব্য; যেমন বাল্যবিয়ে ও বহুবিবাহ এগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ায় অপরাধীদের দৌরাত্ম্য আগের চেয়ে বেড়েছে। অপরাধীরা এখন বেপরোয়া। ভিকটিম ব্লেমিংও এ ব্যাপারে দায়ী।

তিনি বলেন, যতটা প্রকাশ হচ্ছে বা গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা দেখি তা দিয়ে দেশে নারী বা কন্যাশিশু নির্যাতনের চিত্র বোঝা সম্ভব নয়। প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ। অনেকে (ব্যক্তি ও পরিবার) নির্যাতিত হয়েও মান-সম্মান ও প্রভাবশালীদের ভয়ে প্রকাশ করে না। অর্থাৎ নীরব সহিংসতা আরও বেশি।

ড. মাখদুমা বলেন, ‘এখন বিচার কিনতে হয়। একটা সাধারণ বা গরিব পরিবারের শিশু নির্যাতনের শিকার হলে অভিভাবকের বিচার ক্রয়ের সামর্থ্য থাকে না। এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রভাবশালীদের বিচারের নামে প্রহসন ঘটানোর মতো উদাহরণও রয়েছে। দেশে নারী ও শিশু অধিকার সুরক্ষায় একাধিক আইন থাকলেও কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা বিধানে স্পষ্ট করে কিছু বলা নেই। এ ছাড়া, বিচারিক প্রক্রিয়া দীর্ঘতর হওয়ার কারণেও শিশুদের ওপর নিষ্ঠুরতা বৃদ্ধি পেয়েছে।’

তিনি বলেন, গত মে মাসে পল্লবীতে শিশু রামিসা ধর্ষণের পর হত্যার পৈশাচিক ঘটনা সারা দেশসহ বিশ্বের বিবেকবান মানুষদের অন্তরে রক্তক্ষরণ করেছে।

এদিকে, গত ২৬ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে শিশু মাহিদা আক্তারকে (৭) ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ উঠেছে। ময়নাতদন্তে মিলেছে ধর্ষণের আলামত। জানা গেছে, ধর্ষণের ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও শ্বাসরোধের কারণে মাহিদার মৃত্যু হয়। মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, প্রতিবেশী জাহিদুল মেয়েটিকে ধর্ষণ ও শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। ২৬ সেপ্টেম্বর বাগেরহাটের মোল্লাহাটে সাত বছরের শিশু মুসলিমা খাতুনকে গলা কেটে হত্যার ঘটনা ঘটে।  ঘটনার পর ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী সন্দেহভাজন এক ব্যক্তির বাড়িতে ও পানবরজে আগুন দেয়। পুলিশ এ হত্যাকান্ডে জড়িত সন্দেহে প্রতিবেশী এক ব্যক্তি (জাহাঙ্গীর) ও তার দুই ছেলেসহ মোট তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। এর আগে গত ১০ সেপ্টেম্বর জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলাধীন সিধুলী ইউনিয়নে চর লোটাবর গ্রামের শিশু মরিয়ম বুশরা (৭) স্থানীয় সিধুলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয়। তিন দিন পর ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, বুশরাকে ধর্ষণের পর গলায় ওড়না পেঁচিয়ে হত্যা করা হয় এবং ঘাতক তার মরদেহ ঘরের মেঝেতে পুঁতে রাখে। এ ঘটনায় একই এলাকার জামিনুর ইসলাম (৩২) নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানায়, অভিযুক্ত ব্যক্তি আদালতে হত্যাকান্ডের কথা স্বীকার করেছেন।

এদিকে, ছেলেশিশুর পাশাপাশি কন্যাশিশুর হারিয়ে যাওয়া কিংবা নিখোঁজ বা গুম হওয়ার ঘটনাও দেশে কম নয়। সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হারিয়ে যাওয়া শিশু নিয়ে কর্মরত মুনঅ্যালার্ট (মিসিং আর্জেন্ট ইনফরমেশন অ্যালার্ট)-এর তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে সক্রিয় থাকা ২৫৪টি নিখোঁজ অ্যালার্টের মধ্যে ৩৭জন কন্যাশিশু রয়েছে। পরিবার এখনো তাদের খুঁজছে।

নিখোঁজ হওয়া শিশুদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীতে ৭ বছরের এক শিশুকে ২৬ জানুয়ারি নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পর তার মৃতদেহ ১ ফেব্রুয়ারি একটি পরিত্যক্ত ঘর থেকে অর্ধগলিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছিল এবং তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া, গত মার্চে নরসিংদীর মাধবদীতে ১৫ বছর বয়সী আমেনা আক্তারের মরদেহ ফসলের ক্ষেত থেকে উদ্ধার করা হয়। তিনি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। পুলিশ ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে তদন্ত করে।

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী কন্যাশিশুদের ওপর সংঘটিত অপরাধের ধরনের মধ্যে রয়েছে, ধর্ষণচেষ্টা, দৈহিক নির্যাতন, আঘাত, অঙ্গহানি ও ধর্ষণের পর হত্যা। পুলিশের তথ্যে এসব অপরাধের শিকার শিশুদের বয়স ৫ থেকে শুরু করে ১৫-১৬ বছর পর্যন্ত।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা মহানগর পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে বলেন, এই অপরাধগুলো তদন্তে গিয়ে আমরা ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় মোবাইল ব্যবহার করে রিলস্ দেখা ও উত্তেজক পোস্ট দেখার প্রবণতাকেও একটি অন্যতম কারণ হিসেবে পেয়েছি।

তিনি বলেন, ফেসবুকে অ্যাকাউন্টধারীর আচরণগত বিধিনিষেধ না থাকায় বিকৃত মনমানসিকতা একটি ব্যাধি হিসেবে রূপ নিচ্ছে। এই বিকৃত মানসিকতাই অপরাধপ্রবণতা তৈরি করে এবং সহজে শিশুরা এর টার্গেটে পরিণত হচ্ছে। আইনি প্রক্রিয়ায় এটি প্রমাণ করা চ্যালেঞ্জিং।