বন বিভাগের অনুমতি না মিলায় কুমির রপ্তানি বন্ধ

বাণিজ্যিকভাবে মালয়েশিয়া থেকে ৭৫টি কুমির এনে ময়মনসিংহের ভালুকার হাতিবেড় গ্রামে দুই দশক আগে গড়ে তোলা হয় এই সরীসৃপ খামার। ১৩ দশমিক ৪০ একর জমির ওপর এই খামার গড়ে রেপটাইলস ফার্ম লিমিটেড। দ্রুত সাফল্য পেলেও বিক্রি করতে গিয়ে বাধে বিপত্তি। সেই সংকট কাটিয়ে এক দশক পর প্রথম চালানে বিদেশ যায় প্রায় ৪৫০ চামড়া। দেশে আসে আড়াই লাখ ডলার। সেই ‘ডলারের ডিমপাড়া’ কুমিরগুলোর কপালে এখন শুধুই দুর্দশা। লাইসেন্স না পাওয়ায় রপ্তানি করা যাচ্ছে না কুমিরের চামড়া, মাংস ও অন্যান্য উপাদান।

দেশে প্রথম কুমির খামারটি করেছিলেন স্বপ্নবাজ লেখক ও উদ্যোক্তা মুশতাক আহমেদ (প্রয়াত) এবং মেজবাউল হক নামে দুই যুবক। ২০০৩ সালে প্রস্তুতি শুরু করলেও কুমির আমদানি করেন পরের বছর।

প্রকল্প চালুর পর এই সরীসৃপের মূল্যবান অংশ বিক্রি করা নিয়ে জটিলতায় পড়লে ২০১২ সালে শেয়ার হস্তান্তর করেন মুশতাক ও মেজবাউল। চাপে পড়ে রেপটাইলস ফার্মের শেয়ার বিতর্কিত ব্যবসায়ী পি কে হালদারের কাছে বিক্রি করার অভিযোগও রয়েছে। খামারটি বন্ধক রেখে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণ নিয়েছিলেন পি কে হালদার। ২০১৯ সালে ভারতে গ্রেপ্তার হন এই বিতর্কিত ব্যবসায়ী। এরপর ঋণের টাকা তুলতে ফার্মটি বিক্রি করে দেয় লিজিং প্রতিষ্ঠান। এর আগেই ২০১৪ সালে ৪৩০, ২০১৫ সালে ৪০০, ২০১৬ সালে ২০০, ২০১৮ সালে ২২৬ ও সর্বশেষ ২০১৯ সালে ২৫১টি কুমিরের চামড়া রপ্তানি করা হয় জাপানে। রপ্তানি শুরুর প্রথম পাঁচ বছরে ফার্মটি থেকে ১ হাজার ৫০৭টি চামড়া রপ্তানি করা হয়। যার প্রতিটির দাম ছিল ৫০০ থেকে ৬০০ ডলার। দ্বিতীয় দফায় হাত বদল হলে ২০২০ সাল থেকে অব্যবস্থাপনা, অবহেলা ও খামখেয়ালিপনায় কুমিরের চামড়া রপ্তানির তথ্য নেই। প্রাণীগুলোর ওপর নেমে আসে অযতœ ও অবহেলা।

২০২২ সালে উচ্চ আদালতের নির্দেশে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংসহ কুমির খামার পরিচালনায় গঠন করা হয় ছয় সদস্যের পরিচালনা পর্ষদ। এই কমিটি ২০২৩ সালে নিলামের মাধ্যমে খামারের জমি ও কুমির ৩৮ কোটি ২০ লাখ টাকায় বিক্রি করে দেয়। কিনে উদ্দীপন নামে একটি এনজিও।

 বেসরকারি এই সংস্থার কর্মকর্তাদের দাবি, খামারটি কিনলেও নবায়ন করা যায়নি লাইসেন্স। এতে বিক্রি করা যায়নি কোনো চামড়া। উল্টো প্রতিটি কুমিরের জন্য বার্ষিক ১ হাজার টাকা করে সরকারি রাজস্ব, ২০ জন কর্মীর বেতন-ভাতাসহ আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতে হিমশিম খায় উদ্দীপন। এখন মাত্র ১০ কর্মী দিয়ে এত বিশাল খামার শুধু পাহারা দেওয়া হচ্ছে, যতœ বলতে তেমন কিছুই হচ্ছে না। কুমিরগুলোর খাবার খরচ হচ্ছে মাসে ৩/৪ লাখ টাকা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, খামারটির যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা। ভেঙে গেছে কুমিরের পুকুরের পাড়, নিয়মিত দেওয়া হচ্ছে না খাবার। স্বাস্থ্যসেবা তো দূরের কথা। এসব বিষয়ে কথা বলতে চাইলে মুখ খুললেন না খামারের কোনো কর্মী। তাদের একটাই কথা, গণমাধ্যমে কথা বলতে কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা আছে। এমনকি কোনো প্রাণীর মৃত্যু হয়েছে কি না, সেটিও জানালেন না কেউ।

২০২৩ সালের মে মাসে রেপটাইল ফার্মে ছোট-বড় মিলে ৩ হাজার ৭০০টি কুমিরের তথ্য দিয়েছিল ফার্ম কর্তৃপক্ষ। ছয় বছরে কোনো কুমিরের চামড়া রপ্তানির তথ্য নেই। তিন বছর পর এসেও দেওয়া হচ্ছে একই তথ্য। ওই সময় ৪০০ কুমিরের চামড়া রপ্তানি উপযোগী ছিল। পরিবর্তন আসেনি সেই সংখ্যাতেও। এমতাবস্থায় তাদের এ তথ্য নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। আসলেই রপ্তানি হয়নি, না গোপনে বিক্রি করা হচ্ছে, নাকি অবহেলা অযতেœ কুমির মারা যাচ্ছে সেসব প্রশ্নের জবাব চাইতে গেলে মুখ খুলতে রাজি হননি খামারের কোনো কর্মকর্তা। অথচ জন্মের তিন বছরেই রপ্তানি উপযোগী হয় প্রতিটি কুমির।

কুমির প্রকল্পের ম্যানেজার ডাক্তার আবু সাইম মো. আরিফ জানান, কুমিরে চামড়া, মাংস, দাঁত কোনো কিছুই ফেলনা না। বিদেশে এগুলোর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

বন বিভাগের অনুমতি পেলে ৪ শত কুমিরে চামড়া রাপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা যাবে।

উদ্দীপনের ব্যাবস্থাপনা পরিচালক ইস্তেয়াক হাসান জানান, আমরা জমিসহ কুমিরগুলো কিনে নিয়েছি। লাইসেন্স তাদের নামে ছিল। আমরা লাইসেন্সের আবেদন করেছি। লাইসেন্স পেলে আমরা কুমিরে চামড়া ও মাংস রপ্তানি করতে পারব।

সংরক্ষক (বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চল) ছানাউল্যা পাটওয়ারীর কাছে লাইসেন্সের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, উদ্দীপনের লোকজন আমার কাছে আসছিল। ওই সময়ে তাদের ফার্মটি হস্তান্তরের সঠিক কাগজপত্রসহ লাইসেন্সের আবেদন করতে বলা হয়েছিল। উদ্দীপনের লাইসেন্স না থাকলেও প্রাণীগুলো অবৈধ নয়, যেহেতু রেপটাইলস ফার্মের নামে লাইসেন্সে আছে।