নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ১১ মাসে রাকসুর যত উদ্যোগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনের পর গত ১১ মাসে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ১৬টি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে রাকসুর মহিলা বিষয়ক বিভাগ। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতটি একাডেমিক ভবনে স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন স্থাপন, মাতৃত্বকালীন সময়ে উপস্থিতির বাধ্যবাধকতা শিথিল, কেন্দ্রীয় মসজিদে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য অযুখানা ও ওয়াশরুম নির্মাণ এবং ছাত্রী হলগুলোতে স্বাস্থ্যসামগ্রী সরবরাহ উল্লেখযোগ্য।

এ ছাড়া নারী শিক্ষার্থীদের জন্য আরও ১০টি কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে মহিলা বিষয়ক বিভাগ।

বিভাগটির উদ্যোগে বা সমন্বয়ে নারী শিক্ষার্থীদের হিজাব-নিকাব ব্যবহারের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ক্যাফেটেরিয়ায় নারী শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক কক্ষও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা ও সচেতনতার অংশ হিসেবে ছাত্রী হলগুলোতে ফার্স্ট এইড বক্স, রক্তচাপ মাপার মেশিন ও ওজন মাপার মেশিন সরবরাহ করা হয়েছে।

এ ছাড়া মহিলা জিমনেশিয়াম, স্টেডিয়াম ও বিএনসিসিতেও ফার্স্ট এইড বক্স বিতরণ করা হয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য ও ক্যান্সার সচেতনতা নিয়ে সেমিনার ও ক্যাম্পেইনের আয়োজন করা হয়েছে। বিশ্ব হিজাব দিবস উপলক্ষে হিজাব বিতরণ কর্মসূচিও পালন করা হয়েছে।

নিরাপত্তা ও অন্যান্য সুবিধার ক্ষেত্রে আবাসিক হল এলাকায় স্পিড ব্রেকার স্থাপন করা হয়েছে। ক্রীড়া বিভাগের সমন্বয়ে মহিলা জিমনেশিয়াম চালু করা হয়েছে। পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ বিভাগের সমন্বয়ে ক্যাম্পাসে ফার্মেসি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নারী শিক্ষার্থীদের জন্য স্থায়ী মসজিদ কমপ্লেক্স নির্মাণের কাজও শুরু হয়েছে।

নারী শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন প্রয়োজনের কথা বিবেচনায় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতটি একাডেমিক ভবনে স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। আয়োজন করা হয়েছে নারী উদ্যোক্তা মেলা, মেলা-ভিত্তিক ফটো কনটেস্ট এবং ‘নারীর কলমে জুলাই’ স্মৃতিলিখন প্রতিযোগিতা। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা সিরাজী একাডেমিক ভবনের পেছনের দরজাও পুনরায় খুলে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

তবে আরও ১০টি কার্যক্রম এখনো চলমান রয়েছে। এর মধ্যে একাডেমিক ভবনগুলোতে প্রয়োজনীয় কমনরুম ও পর্যাপ্ত নারীবান্ধব ওয়াশরুম নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা ও সাক্ষাৎ করা হয়েছে। ছাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য প্রয়োজনীয় রুটে বাস ট্রিপ চালুর বিষয়েও আলোচনা চলছে।

ক্যাম্পাসে ই-কার পুনরায় চালুর প্রক্রিয়াও চলমান। নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় স্থানে পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা ও সিসিটিভি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সাইবার থ্রেট ও সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ে কর্মশালা আয়োজনের অনুমতির জন্য আবেদন করা হয়েছে।

কৃতী নারী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা আয়োজনের অনুমতির জন্যও আবেদন করা হয়েছে। ‘নারীর কলমে জুলাই’ প্রতিযোগিতায় পাওয়া লেখাগুলো বই আকারে প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে। ছাত্রীদের জরুরি সহায়তায় কুইক রেসপন্স টিম গঠনের উদ্যোগ এবং ছাত্রী হল এলাকায় সুপারশপসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য সুবিধা বাস্তবায়নের প্রচেষ্টাও চলছে। একই সঙ্গে ছাত্রীদের প্রয়োজনীয় একাডেমিক ও দৈনন্দিন সুবিধা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করছে মহিলা বিষয়ক বিভাগ।

মহিলা বিষয়ক বিভাগের কার্যক্রম নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিয়া আক্তার। তিনি বলেন, একাডেমিক ভবনগুলোতে স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন স্থাপন নারী শিক্ষার্থীদের জন্য খুবই উপকারী হয়েছে। জরুরি সময়ে সহজেই প্রয়োজনীয় ন্যাপকিন সংগ্রহ করা যাচ্ছে। এতে স্বস্তি ও নিরাপত্তা অনুভব করছেন তারা।

সাদিয়া আক্তারের মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলোর একটি হলো মাতৃত্বকালীন সময়ে নারী শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির বাধ্যবাধকতা শিথিল করা। তার ভাষায়, একজন নারী শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ও মাতৃত্বকে সমন্বয় করার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ।

বিভিন্ন কার্যক্রমের সুফল শিক্ষার্থীরা পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন রাকসুর সহ-মহিলা বিষয়ক সম্পাদক সামিয়া জাহান। তিনি বলেন, মাতৃত্বকালীন উপস্থিতির বাধ্যবাধকতা শিথিল, একাডেমিক ভবনে স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন স্থাপন, কেন্দ্রীয় মসজিদে অযুখানা ও ওয়াশরুম নির্মাণ, স্পিড ব্রেকার স্থাপন এবং নারী উদ্যোক্তা মেলাসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের সুফল শিক্ষার্থীরা পাচ্ছেন।

তবে কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনিক কাজের দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে বলেও জানান তিনি। সামিয়া জাহান বলেন, গত ১১ মাস ধরে মেডিকেল ও পরিবহনের জনবল সংকটের বিষয়টি জানানো হলেও এখনো কার্যকর সমাধান হয়নি। একাডেমিক ভবনের কমনরুম, নারীবান্ধব ওয়াশরুম, আলোকসজ্জা ও সিসিটিভি নিয়েও যোগাযোগ করা হয়েছে, তবে নির্দিষ্ট বাস্তবায়ন পরিকল্পনা পাওয়া যাচ্ছে না।

প্রশাসনের সহযোগিতা থাকলে নারী শিক্ষার্থীবান্ধব আরও ভালো একটি ক্যাম্পাস উপহার দেওয়া সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন রাকসুর মহিলা বিষয়ক সম্পাদক সাইয়েদা হাফসা। তিনি বলেন, মহিলা বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই ক্যাম্পাসে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতের চেষ্টা করছেন তারা। এরই মধ্যে কিছু গঠনমূলক ও প্রয়োজনীয় কাজ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল ও পরিবহন সেক্টরের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না।

ভবিষ্যতে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা আরও নিশ্চিত করতে কাজ করার কথা জানিয়েছেন রাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) মোস্তাকুর রহমান জাহিদ। তিনি বলেন, রাকসুর ইশতেহারের প্রতিটি বিভাগ তাদের দায়িত্ব বাস্তবায়নে কাজ করেছে। এর মধ্যে মহিলা বিষয়ক বিভাগ অন্যতম। মাতৃত্বকালীন সময়ে নারী শিক্ষার্থীদের শ্রেণি কার্যক্রমে উপস্থিতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং সাতটি একাডেমিক ভবনে স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন স্থাপনসহ গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম তারা বাস্তবায়ন করেছে। রাকসুর সামগ্রিক কার্যক্রমে নারী শিক্ষার্থীদের গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।