মাঠের লড়াইয়ে ট্রফি জয়ের উল্লাস আর রেকর্ড বুক রাঙানোর গৌরব, সবকিছুই এখন ঢাকা পড়ে গেল এক অন্ধকার আর্থিক কেলেঙ্কারির আড়ালে। ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক তদন্তের অবসান ঘটিয়ে প্রিমিয়ার লিগ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে আনা সমস্ত গুরুতর অভিযোগের সত্যতা।
প্রায় নয়টি মৌসুম ধরে ফিন্যান্সিয়াল ফেয়ার প্লের চোখ ফাঁকি দিয়ে ৯০০ মিলিয়নেরও বেশি পাউন্ডের ভুয়া চুক্তি করার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে ইতিহাদের ক্লাবটি। এদিকে লিগ কর্তৃপক্ষের এমন ঘোষণাকে অত্যন্ত ‘বিস্মিত ও হতাশাজনক’ হিসেবে দেখছে সিটিজেনরা।
শতকোটি পাউন্ডের ভুয়া চুক্তি ও গোপনীয়তার জাল
২০০৮ সালে শেখ মনসুর বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের মালিকানাধীন আবুধাবি ইউনাইটেড গ্রুপ ম্যানচেস্টার সিটি অধিগ্রহণের পর থেকেই ক্লাবটি বিশ্ব ফুটবলের একচ্ছত্র শক্তিতে পরিণত হয়। কিন্তু এই রূপকথার উত্থানের পেছনে লুকিয়ে ছিল অন্ধকার এক আর্থিক কারসাজি। স্বাধীন কমিশনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯-১০ থেকে ২০১৭-১৮ মৌসুম পর্যন্ত দীর্ঘ ৯ বছরে প্রায় ৯০০ মিলিয়নেরও বেশি পাউন্ডের ভুয়া বাণিজ্যিক চুক্তি বা 'শাম কন্ট্রাক্ট' সাজিয়েছিল ক্লাবটি।
মূলত কৃত্রিম উপায়ে ক্লাবটির রাজস্ব বা আয় বাড়িয়ে দেখানো এবং খরচ কমিয়ে উয়েফা ও প্রিমিয়ার লিগের ফিন্যান্সিয়াল ফেয়ার প্লে (এফএফপি) নিয়মের বেড়াজাল থেকে বাঁচার জন্যই এই গোপন স্কিম তৈরি করা হয়েছিল। কমিশনের রায়ে আরও অত্যন্ত কঠোর ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, ক্লাবের হয়ে সাক্ষ্য দিতে আসা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছেন এবং তদন্তকে বাধাগ্রস্ত করতে তারা অসদুপায় অবলম্বন করেছিলেন।
নয় বছরের অনিয়ম ও প্রিমিয়ার লিগের বিস্ফোরক রায়
২০১৮ সালে ফুটবল লিকস থেকে ফাঁস হওয়া কিছু ইমেল ও গোপন নথিপত্র থেকেই ম্যান সিটির এই আর্থিক দুর্নীতির কলকলানি প্রথম প্রকাশ্যে আসে। এরপর প্রিমিয়ার লিগ কর্তৃপক্ষ দীর্ঘ তদন্ত শেষে তিন বছরেরও বেশি সময় আগে সিটির বিরুদ্ধে ১১৫টিরও বেশি গুরুতর অভিযোগ আনে। দীর্ঘ ৪২ দিনের ম্যারাথন শুনানি শেষে স্বাধীন কমিশন তাদের ৪০ পাতার মূল সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেছে এবং প্রিমিয়ার লিগ তা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে। সেখানে সবগুলো অভিযোগেই দোষী সাব্যস্ত হয়েছে সিটিজেনরা।
এই রায়ের পর প্রিমিয়ার লিগের প্রধান নির্বাহী রিচার্ড মাস্টার্স এক আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় এটিকে লিগের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এবং তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে অভিহিত করেছেন। প্রিমিয়ার লিগের দাপ্তরিক ফোরামে দেওয়া বক্তব্যে মাস্টার্স বলেন, ‘এই মূল সিদ্ধান্তটি সেই সময়ের ঘটনাগুলোর সত্যতা প্রমাণ করে, যা ম্যানচেস্টার সিটিতে ঘটেছিল। এটি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছে যে ক্লাবটি কীভাবে প্রায় এক দশক ধরে নিয়মিতভাবে প্রিমিয়ার লিগের নিয়মগুলো ভঙ্গ করেছে। এটি ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে এই মামলা পরিচালনা করার প্রিমিয়ার লিগের সিদ্ধান্তকেও শতভাগ সঠিক বলে প্রমাণ করেছে।’
আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি ও সিটির কঠোর অবস্থান
প্রিমিয়ার লিগের এই কঠোর রায়ের পর স্বভাবতই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ম্যানচেস্টার সিটি কর্তৃপক্ষ। ক্লাবটি এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে তারা এই রায়ে অত্যন্ত বিস্মিত ও হতাশ। তাদের দাবি, তারা সম্পূর্ণ নির্দোষ এবং এই অভিযোগগুলো খণ্ডন করার মতো তাদের হাতে অকাট্য ও অপরিবর্তনীয় প্রমাণের বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে।
ক্লাবের প্রধান নির্বাহী ফেরান সোরিয়ানো কর্মীদের উদ্দেশে একটি অভ্যন্তরীণ ভিডিও বার্তায় ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান যে পুরো বিষয়টি একটি মিথ্যা ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
সেই ভিডিও বার্তায় সিটির অবস্থান পরিষ্কার করে সোরিয়ানো বলেন, ‘এত দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রক্রিয়া চলার কারণে আমাদের নিজেদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া দরকার যে, প্রিমিয়ার লিগের সম্পূর্ণ মামলাটিই একটি মাত্র মিথ্যা অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে তৈরি—যেখানে বলা হয়েছে মালিকের ব্যক্তিগত অর্থ কোনো না কোনোভাবে আবুধাবির কিছু স্পনসরের মাধ্যমে গোপনে ক্লাবে ঢুকানো হয়েছে। এটি মোটেও সত্য নয়। প্রিমিয়ার লিগ কমিশনকে এমন অকাট্য প্রমাণ দেওয়া হয়েছে যা প্রমাণ করে যে এটি কখনো ঘটেনি এবং ঘটতেও পারত না।’
ক্লাবটি এই রায়ের বিরুদ্ধে আগামী শুক্রবারের মধ্যে আপিল করার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং আইনি লড়াইয়ে তারা যে একচুলও ছাড় দেবে না, তা স্পষ্ট করে দিয়েছে।
শাস্তির খড়্গ ও ফুটবলে সম্ভাব্য সুদূরপ্রসারী প্রভাব
রায় ঘোষণা করা হলেও সিটির বিরুদ্ধে চূড়ান্ত শাস্তি কী হবে, তা নির্ধারণের জন্য খুব শীঘ্রই একটি আলাদা শুনানির আয়োজন করা হবে। তবে অপরাধের মাত্রা এতটাই গুরুতর যে ক্লাবটির ওপর বড় অঙ্কের পয়েন্ট কাটা থেকে শুরু করে লিগ থেকে অবনমন বা বহিষ্কারের মতো চরম শাস্তিও আসতে পারে।
এই পরিস্থিতির গভীরতা নিয়ে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত ইউরোপিয়ান ফুটবল ক্লাব সাধারণ সভার সমাপনীতে ব্রিটিশ ক্রীড়া মন্ত্রী লিসা ন্যান্ডি বিবিসির সঙ্গে আলাপকালে অত্যন্ত স্পষ্ট মন্তব্য করেন। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ব্রিটিশ ক্রীড়া মন্ত্রী বলেন, ‘এটি কেবল ম্যানচেস্টার সিটি ভক্তদের জন্যই নয়, প্রিমিয়ার লিগ ফুটবলের সমস্ত ভক্তদের জন্যই অত্যন্ত উদ্বেগের একটি বিষয়। প্রিমিয়ার লিগ আমাদের মুকুটের একটি অমূল্য রত্ন। খেলার প্রতিযোগিতামূলক পবিত্রতা বজায় রাখার স্বার্থেই আমাদের এই তদন্ত দ্রুত এবং নিরপেক্ষভাবে সমাপ্ত হতে দেখতে হবে।’
অন্যদিকে, লন্ডনের চার্চ কোর্ট চেম্বার্সের ক্রীড়া আইন বিশেষজ্ঞ ইয়াসাইন প্যাটেল এই পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করে বলেছেন, প্রিমিয়ার লিগের বিরুদ্ধে প্রথম রাউন্ডে জয় এলেও এখন আইনি লড়াইয়ের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হতে চলেছে, যেখানে সিটি তাদের সমস্ত আইনি শক্তি নিয়ে লড়বে। সব মিলিয়ে, আগামী শুক্রবার আপিলের সময়সীমা শেষ হওয়া এবং পরবর্তী শাস্তির ঘোষণা আসার অপেক্ষায় এখন গোটা ফুটবলবিশ্ব।