লাইসেন্সের জটিলতায় দুর্দশায় ময়মনসিংহের হাজারো কুমির

ময়মনসিংহের ভালুকায় বাণিজ্যিকভাবে কুমির পালনের জন্য ২০০৪ সালে মালয়েশিয়া থেকে ৭৫টি কুমির আনা হয়েছিল। উপজেলার হাতিবেড় গ্রামে ১৩ দশমিক ৪০ একর জমির ওপর গড়ে তোলা হয় দেশের প্রথম কুমির খামার ‘রেপটাইলস ফার্ম লিমিটেড’। দ্রুত সাফল্য পেলেও কুমির ও এর মূল্যবান অংশ বিক্রি করতে গিয়ে নানা জটিলতায় পড়ে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রকল্পটি চালুর এক দশক পর প্রথম চালানে প্রায় ৪৫০টি কুমিরের চামড়া বিদেশে রপ্তানি করা হয়। এতে দেশে আসে আড়াই লাখ ডলার। একসময় ‘ডলারের ডিমপাড়া’ হিসেবে পরিচিত এই কুমিরগুলোর বর্তমান চিত্র অবশ্য ভিন্ন। নিয়মিত খাবার, পরিচর্যা ও চিকিৎসার অভাবে খামারের কুমিরগুলো এখন দুর্দশায় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। লাইসেন্স না থাকায় কুমিরের চামড়া ও মাংস রপ্তানিও করা যাচ্ছে না।

দেশের প্রথম কুমির খামারটি গড়ে তোলেন লেখক ও উদ্যোক্তা মুশতাক আহমেদ এবং মেজবাউল হক নামে দুই যুবক। ২০০৩ সালে খামার তৈরির প্রস্তুতি শুরু হলেও পরের বছর মালয়েশিয়া থেকে কুমির আমদানি করা হয়।

প্রকল্প শুরুর পর কুমিরের মূল্যবান অংশ বিক্রি নিয়ে জটিলতায় পড়লে ২০১২ সালে মুশতাক ও মেজবাউল তাদের শেয়ার হস্তান্তর করেন। চাপে পড়ে রেপটাইলস ফার্মের শেয়ার বিতর্কিত ব্যবসায়ী পি কে হালদারের কাছে বিক্রি করার অভিযোগও রয়েছে। খামারটি বন্ধক রেখে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিলেন পি কে হালদার। ২০১৯ সালে ভারতে গ্রেপ্তার হন তিনি। এরপর ঋণের টাকা আদায়ে লিজিং প্রতিষ্ঠানটি ফার্মটি বিক্রি করে দেয়।

এর আগে ২০১৪ সালে ৪৩০টি, ২০১৫ সালে ৪০০টি, ২০১৬ সালে ২০০টি, ২০১৮ সালে ২২৬টি এবং সর্বশেষ ২০১৯ সালে ২৫১টি কুমিরের চামড়া জাপানে রপ্তানি করা হয়। রপ্তানি শুরুর প্রথম পাঁচ বছরে ফার্মটি থেকে মোট ১ হাজার ৫০৭টি চামড়া রপ্তানি হয়। প্রতিটি চামড়ার দাম ছিল ৫০০ থেকে ৬০০ ডলার।

দ্বিতীয় দফায় মালিকানা পরিবর্তনের পর ২০২০ সাল থেকে কুমিরের চামড়া রপ্তানির আর কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। একই সময়ে খামারটিতে অব্যবস্থাপনা, অবহেলা ও খামখেয়ালিপনার অভিযোগ ওঠে। এতে কুমিরগুলোর ওপরও নেমে আসে অযত্ন ও অবহেলা।

২০২২ সালে উচ্চ আদালতের নির্দেশে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংসহ কুমির খামার পরিচালনার জন্য ছয় সদস্যের একটি পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালে নিলামের মাধ্যমে খামারের জমি ও কুমির ৩৮ কোটি ২০ লাখ টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয়। খামারটি কিনে নেয় উদ্দীপন নামে একটি এনজিও।

উদ্দীপনের কর্মকর্তাদের দাবি, খামারটি কেনার পরও লাইসেন্স নবায়ন করা সম্ভব হয়নি। ফলে কোনো কুমিরের চামড়া বিক্রি বা রপ্তানি করা যাচ্ছে না। উল্টো প্রতিটি কুমিরের জন্য বছরে ১ হাজার টাকা করে সরকারি রাজস্ব, কর্মীদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য খরচ বহন করতে গিয়ে সংস্থাটিকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

খামারটিতে আগে ২০ জন কর্মী থাকলেও বর্তমানে মাত্র ১০ জন কর্মী দিয়ে বিশাল এই খামার পাহারা দেওয়া হচ্ছে। কুমিরগুলোর খাবার বাবদ মাসে প্রায় ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে। তবে নিয়মিত পরিচর্যার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সরেজমিনে খামারটিতে দেখা যায়, বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ময়লা-আবর্জনা। কুমিরগুলোর পুকুরের পাড়ও ভেঙে গেছে। নিয়মিত খাবার দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থাও সন্তোষজনক নয় বলে দেখা যায়। এসব বিষয়ে কথা বলতে চাইলে খামারের কোনো কর্মী মন্তব্য করতে রাজি হননি। তাদের দাবি, গণমাধ্যমে কথা বলার বিষয়ে কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এমনকি খামারে কোনো কুমির মারা গেছে কি না, সে বিষয়েও কেউ তথ্য দেননি।

২০২৩ সালের মে মাসে রেপটাইলস ফার্ম কর্তৃপক্ষ ছোট-বড় মিলিয়ে ৩ হাজার ৭০০টি কুমির থাকার তথ্য দিয়েছিল। এরপর ছয় বছরেও কোনো কুমিরের চামড়া রপ্তানির তথ্য পাওয়া যায়নি। তিন বছর পরও কুমিরের সংখ্যা ও রপ্তানি পরিস্থিতি নিয়ে একই তথ্য দেওয়া হচ্ছে। তখন ৪০০টি কুমিরের চামড়া রপ্তানির উপযোগী ছিল বলে জানানো হয়েছিল। এখনো সেই সংখ্যার পরিবর্তন হয়নি।

এ অবস্থায় খামারে থাকা কুমিরের প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কুমিরের চামড়া আদৌ রপ্তানি হয়নি, নাকি গোপনে বিক্রি করা হচ্ছে, কিংবা অবহেলা ও অযত্নে কুমির মারা যাচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে খামারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। অথচ একটি কুমির জন্মের তিন বছর পরই রপ্তানির উপযোগী হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, ২০১৯ সালে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনের দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৪ নম্বরে বলা হয়েছে, বিধিমালার অধীন লাইসেন্স ছাড়া কোনো খামারি কুমির লালন-পালন, খামার স্থাপন কিংবা আমদানি-রপ্তানি করতে পারবেন না। একই অধ্যায়ের ৭-এর ১ নম্বরে বলা হয়েছে, লাইসেন্স পাওয়ার পর পজিশন সার্টিফিকেট ছাড়া কোনো খামারি নিজের মালিকানায় বা দখলে কুমির রাখতে পারবেন না।

বন বিভাগের কুমির লালন-পালন নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি কুমিরের জন্য বছরে ১ হাজার টাকা পজিশন ফি নির্ধারিত রয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ফি কুমির পালনের ব্যবসার অন্যতম প্রতিবন্ধকতা।

কুমির প্রকল্পের ব্যবস্থাপক চিকিৎসক আবু সাইম মো. আরিফ বলেন, কুমিরের চামড়া, মাংস ও দাঁত কোনো কিছুই ফেলনা নয়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এসবের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বন বিভাগের অনুমতি পাওয়া গেলে ৪০০ কুমিরের চামড়া রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।

উদ্দীপনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইস্তেয়াক হাসান বলেন, তারা জমিসহ কুমিরগুলো কিনে নিয়েছেন। আগের মালিকের নামে লাইসেন্স ছিল। তারা নতুন করে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছেন। লাইসেন্স পাওয়া গেলে কুমিরের চামড়া ও মাংস রপ্তানি করা সম্ভব হবে।

লাইসেন্সের বিষয়ে জানতে সংরক্ষক (বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চল) ছানাউল্যা পাটওয়ারীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ফাইল না দেখে এ বিষয়ে কিছু বলা সম্ভব নয়। উদ্দীপনের লোকজন তার কাছে এসেছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, ফার্ম হস্তান্তরের সঠিক কাগজপত্রসহ লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে তাদের বলা হয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, উদ্দীপনের লাইসেন্স না থাকলেও কুমিরগুলো অবৈধ নয়। কারণ কুমিরগুলো রেপটাইলস ফার্মের নামে থাকা লাইসেন্সের আওতায় রয়েছে।