কোন বোলারের ভয়ে বদলে গিয়েছিল গেইলের খেলা?

বাইশ গজে বোলারদের জন্য এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম ছিল ক্রিস গেইল। কিন্তু ইতিহাস গড়া সেই ক্যারিবিয়ান দানবও যে কোনো বোলারের সামনে এসে নিজের চিরচেনা আক্রমণাত্মক রূপ গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন, তা হয়তো অনেকেরই কল্পনার বাইরে ছিল। 

সেই বোলারের নামটা লাসিথ মালিঙ্গা, এবার হয়তো প্রসঙ্গটা মেলাতে পারবেন আপনিও। তার নিখুঁত স্লিং অ্যাকশন ও ধূর্ত স্লোয়ারের জালে কীভাবে আটকে পড়েছিলেন ইউনিভার্স বস, এবার নিজেই তার এক অকপট ও চমকপ্রদ স্বীকারোক্তি দিয়েছেন বিস্ফোরক এই ওপেনার। 

বিশ্বের বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে ৪,৯৬৫ রান, ছয়টি সেঞ্চুরি এবং রেকর্ড ৩৫৭টি ছক্কার মালিক গেইল নিজের দিনে যেকোনো বোলিং আক্রমণ গুঁড়িয়ে দিতে পারতেন। ২০১৩ সালে ব্যাঙ্গালুরুর চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে অপরাজিত ১৭৫ রানের বিধ্বংসী ইনিংস কিংবা মাত্র ৩০ বলে সেঞ্চুরির রেকর্ড আজও অমর হয়ে আছে। 

কিন্তু এই অপ্রতিরোধ্য ব্যাটারকেই যখন মালিঙ্গার মতো বোলারদের মোকাবিলা করতে হতো, তখন তার কৌশল সম্পূর্ণ বদলে যেত। আইপিএলে মুম্বাই ইন্ডিয়ানসের জার্সিতে ১২২ ম্যাচে ১৭০ উইকেট নেওয়া মালিঙ্গার স্লিং অ্যাকশন ও ডেথ ওভারের ইয়র্কার সবসময়ই ছিল ব্যাটারদের জন্য এক দুঃস্বপ্ন। এদিকে জাতীয় দলের জার্সিতেও এই সাবেক তারকার অবদান অসামান্য। তিন ফরম্যাট মিলিয়ে ৩৪০ ম্যাচে তার উইকেট সংখ্যা ৫৪৬। 

সম্প্রতি ‘মিডউইক স্টোরিজ’ পডকাস্টে ভারতীয় সাবেক তারকা হরভজন সিংয়ের সঙ্গে আলাপকালে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন বোলারের নাম প্রকাশ করতে গিয়ে গেইল মালিঙ্গার নামটা উচ্চারণ করেন। তার অদ্ভুত অ্যাকশন ও নিখুঁত ডেলিভারির দ্যুতি নিয়ে গেইল বলেন, ‘সে সময় সেটি মালিঙ্গা ছিল (সবচেয়ে কঠিন বোলার), তার সেসময়ের অ্যাকশনটার কথা তো জানেনই। মানে, সে আমাকে আউট করতে পারেনি, কিন্তু ওই অ্যাকশনের বোলারকে সামলানো অত্যন্ত কঠিন ছিল। তার মুখোমুখি হওয়ার জন্য আমি নিজের শরীরকে নির্দিষ্ট কোনো অবস্থানেই ঠিকমতো নিতে পারতাম না।’ 

মালিঙ্গার স্লোয়ার ডেলিভারি যে তাকে পুরোপুরি বিভ্রান্ত করত, সে কথাও অকপটে স্বীকার করেছেন গেইল। হাত থেকে বল পড়ার সময় তা বুঝতে না পারার অসহায়ত্ব প্রকাশ করে গেইল আরও বলেন, ‘আর তার স্লোয়ার বল চেনার কোনো উপায়ই আমার ছিল না, এতটাই ধূর্ত ও বিভ্রান্তিকর ছিল সেটা। টি-টোয়েন্টি খেলোয়াড় হিসেবে সে আমার জন্য ভীষণ কঠিন এক বোলার ছিল।’ 

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, মারকাটারি ব্যাটিংয়ের জন্য বিশ্বজোড়া খ্যাতি পাওয়া গেইল মালিঙ্গার বিপক্ষে নিজের স্বাভাবিক খেলা থেকে সম্পূর্ণ সরে এসেছিলেন। ইগো বা মারমুখী মানসিকতা বাদ দিয়ে কীভাবে কেবল উইকেটে টিকে থাকার লড়াই করতেন, তা ব্যাখ্যা এই সাবেক ক্যারিবীয় তারকা জানান, ‘তাই আমি বলতাম, শোন, আমি তো বাঁচার চেষ্টা করছি, তাই না? আমি কেবল তাকে ব্লক করার চেষ্টা করতাম, যা ইউনিভার্স বসের জন্য বেশ অস্বাভাবিক এক ব্যাপার। তবে আমি তাকে ব্লক করার বা সিঙ্গেল নিয়ে স্ট্রাইক বদলানোর চেষ্টা করতাম এবং এরপর অন্য বোলারদের ওপর চড়াও হতাম। কোনো বোলারকে যদি আমি বুঝতেই না পারি, তবে নিরাপদ পথে থেকে একটু বুদ্ধিদীপ্ত ক্রিকেট খেলার চেষ্টা করতাম।’ 

পরিসংখ্যানও গেইলের এই বক্তব্যের নিখুঁত সত্যতা প্রমাণ করে। ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের লড়াইয়ে মালিঙ্গার বিপক্ষে ৭২ বল খেলে মাত্র ৫৭ রান করতে পেরেছেন গেইল। তার সাধারণ স্ট্রাইক রেটের তুলনায় যা মাত্র ৭৯.২। এই দীর্ঘ লড়াইয়ে তিনি আটটি চার মারলেও মালিঙ্গার বিপক্ষে একটিও ছক্কা হাঁকাতে পারেননি। ৭২টি বলের মধ্যে ৪২টি ডট বল দিয়ে গেইলকে পুরোপুরি হাতপায়ে বেঁধে রেখেছিলেন মালিঙ্গা। 

যদিও মালিঙ্গা তাকে মাত্র একবারই (২০১৫ সালে) আউট করতে পেরেছেন, তবুও পরিসংখ্যান সাক্ষী দেয় যে গেইল কখনোই মালিঙ্গার বিপক্ষে আধিপত্য বিস্তার করতে পারেননি।

আধুনিক টি-টোয়েন্টির ফ্ল্যাট পিচ ও ছোট সীমানার যুগে যেখানে ব্যাটারদের জয়জয়কার, সেখানে মারমুখী গেইলকে কেবল রক্ষণাত্মক হতে বাধ্য করা, মালিঙ্গা ও গেইলের এই দ্বৈরথটি ছিল নিখুঁত শক্তি বনাম দক্ষতার এক অনন্য লড়াই।