ইলিশের চেয়েও দামী হচ্ছে ইলিশের ডিম

পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে ইলিশের ডিম। বর্তমানে তাজা ইলিশের ডিম প্রতি কেজি ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা এবং নোনা ইলিশের ডিম ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে এই দামেও চাহিদা অনুযায়ী ডিম পাচ্ছেন না ক্রেতারা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরবরাহ কম থাকায় বেড়েছে দাম।

ইলিশের ডিমের বাজার মূলত মৌসুমনির্ভর। জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ইলিশের ডিমের চাহিদা ও সরবরাহ বেশি থাকে। তবে চলতি মৌসুমে ডিমওয়ালা ইলিশের সরবরাহ তুলনামূলক কম হওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী ডিম সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

গত ২৯ জুলাই চাঁদপুরের বড়স্টেশন মাছঘাটে প্রতি কেজি ইলিশের ডিম ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ে প্রতি কেজি ইলিশের ডিমের দাম ছিল ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি অনলাইনে ইলিশের ডিম বিক্রি ও প্রচার-প্রচারণা বাড়ায় দেশের বিভিন্ন স্থানেও এর চাহিদা বাড়ছে।

ফিশ ভ্যালির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাসেল হাওলাদার বলেন, সেপ্টেম্বরে সাধারণত ডিমওয়ালা ইলিশের প্রাপ্যতা বাড়ে। তবে এবার চাহিদার তুলনায় ডিমওয়ালা ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে কম। বিভিন্ন সোর্সিং পয়েন্ট থেকে ইলিশ সংগ্রহ করা হলেও প্রতিটি মাছে সমপরিমাণ ডিম পাওয়া যায় না। ফলে চাহিদা থাকলেও সবসময় পর্যাপ্ত ডিম সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।

কুয়াকাটা মা শুটকি এন্টারপ্রাইজের পরিচালক সোহেল মাহমুদ বলেন, নোনা ইলিশের ডিমেরও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু জেলেদের কাছ থেকে চাহিদার তুলনায় অনেক কম ডিম পাওয়া যাচ্ছে। সাধারণত ১০-১৫ জোড়া নোনা ডিমে এক কেজি হয়। কখনো ১০ জোড়াতেও এক কেজি হতে পারে।

তিনি জানান, ভরা মৌসুমে শুধু একটি দোকানেই প্রায় দুই মণ বা ৮০ কেজি নোনা ডিমের চাহিদা থাকে। অথচ জেলেদের কাছ থেকে সব মিলিয়ে ২০ থেকে ৩০ কেজির বেশি সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। ফলে সরবরাহ ঘাটতিতে দাম বেড়েছে।

মৎস্যবন্দর মহিপুরের আতিক ফিশ পয়েন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু হাসনাত আতিক বলেন, আলিপুর-মহিপুর মৎস্যবন্দর থেকে তাজা ইলিশ সংগ্রহ করে মাছ কাটার পর ডিম আলাদা করা হয়। সাধারণত চার থেকে পাঁচটি, কখনো পাঁচ থেকে ছয়টি ইলিশের ডিমে এক কেজি হয়। এসব ডিম প্রতি কেজি ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

তিনি বলেন, স্থানীয় ক্রেতাদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পর্যটকরাও ইলিশের ডিম কিনছেন। অনলাইনের মাধ্যমেও দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব ডিম সরবরাহ করা হচ্ছে।

তবে ইলিশের ডিমের বাণিজ্যিক চাহিদা ও দাম বাড়ায় প্রজননক্ষম মা ইলিশ আহরণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা। তাঁদের মতে, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ডিম ছাড়ার সুযোগ না পেলে ইলিশের প্রাকৃতিক প্রজনন ব্যাহত হতে পারে।

অ্যাকশন ফান্ডের অর্থায়নে পরিচালিত ডাব্লিউসিএস ও ওয়ার্ল্ডফিশের সমন্বয়ে বাস্তবায়িত ‘সুস্থ সাগর’ প্রকল্পের গবেষণা সহকারী মো. বখতিয়ার রহমান বলেন, ইলিশের ডিমের চাহিদা ও বাজারমূল্য বাড়ার কারণে ডিমওয়ালা ইলিশ আহরণ বেড়ে গেলে তা উদ্বেগের বিষয় হতে পারে। বিশেষ করে প্রজনন মৌসুমে প্রজননক্ষম মা ইলিশ ধরা হলে মাছগুলো ডিম ছাড়ার সুযোগ হারায়। এতে ইলিশের প্রাকৃতিক প্রজনন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে মৎস্যসম্পদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তিনি বলেন, ইলিশের ডিমের বাণিজ্যিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি প্রজননক্ষম মা ইলিশ সংরক্ষণ এবং প্রজনন মৌসুমে আইন মেনে মাছ আহরণ নিশ্চিত করা জরুরি।

কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. জহিরুন্নবী বলেন, আগে ইলিশের ডিম বিক্রির প্রচলন তেমন ছিল না। তবে বর্তমানে অনলাইনে ইলিশ বিক্রির পাশাপাশি মাছের পেট থেকে ডিম সংগ্রহ করে বিক্রি করা হচ্ছে। বাজারে এসব ডিমের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। অনলাইনে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার কারণে দিন দিন ক্রেতার চাহিদা বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে ইলিশের জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে।

তিনি বলেন, পটুয়াখালী, কলাপাড়া, মহিপুর ও মৎস্য অবতরণকেন্দ্রগুলোতে তুলনামূলকভাবে এ প্রবণতা কম। কারণ, ইলিশের প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশের ডিম ছাড়ার সময় সরকার ঘোষিত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকে। এ সময় মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে প্রচার-প্রচারণা, নজরদারি ও অভিযান পরিচালনা করা হয়।

ডিম সংগ্রহের উদ্দেশ্যে সারাদেশে ব্যাপকভাবে মা ইলিশ শিকার শুরু হলে ভবিষ্যতে ইলিশের সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

পবিপ্রবি ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রাজীব সরকার বলেন, বর্তমানে অসাধু ব্যবসায়ীদের একটি অংশ অধিক মুনাফার আশায় প্রজননক্ষম মা ইলিশের ডিম সংগ্রহ করে অনলাইনে বিক্রি করছে। এভাবে প্রজননক্ষম মা ইলিশের ডিম নির্বিচারে সংগ্রহ ও বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করা ইলিশের স্বাভাবিক প্রজনন, বংশবিস্তার এবং ভবিষ্যৎ উৎপাদনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোর, কার্যকর ও নিয়মিত নজরদারি ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দেন তিনি। বিশেষ করে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ইলিশের ডিম বিক্রির কার্যক্রম শনাক্ত করে তা বন্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

একই সঙ্গে ভোক্তাদেরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ইলিশের ডিম কিনে যাতে অবৈধ ও ক্ষতিকর বাণিজ্য উৎসাহিত না হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ইলিশ বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পদ। প্রজননক্ষম মা ইলিশের ডিম সংগ্রহ ও অনলাইনে বিক্রির প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতে ইলিশের স্বাভাবিক প্রজনন ব্যাহত হয়ে উৎপাদন কমে যেতে পারে। তাই ইলিশের প্রজনন ও বংশবিস্তার নিশ্চিত করতে সচেতনতা, কঠোর নজরদারি এবং কার্যকর আইন প্রয়োগের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।