আর্জেন্টিনা ফুটবল দল ইতিমধ্যেই ঢুকে পড়েছে এক সম্পূর্ণ নতুন ও চ্যালেঞ্জিং অধ্যায়ে। সেই চ্যালেঞ্জটা এখন সবারই জানা। কীভাবে পূরণ হবে জাদুকরের শূন্যতা? লিওনেল মেসিকে ছাড়া কীভাবেই বা গুছিয়ে উঠবে আলবিসেলেস্তেরা। তবে সেই ১০ নম্বর জার্সির মানুষটিকে মাঠের বাইরে থেকে হুবহু প্রতিস্থাপন করা যে কোনোভাবেই সম্ভব নয়, তা খুব ভালোভাবেই জানেন কোচ লিওনেল স্কালোনিও।
অবশ্য মেসিকে ছাড়া নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে মার্তিনেজ-আলভারেজরা যে বিন্দুমাত্র ছাড় দিচ্ছে না, তার প্রমাণ মিলল বলিভিয়ার বিপক্ষে ৪-০ গোলের বড় জয়ে। কর্দোভায় এই দুর্দান্ত জয়ের পর ম্যাচ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে হাজির হয়ে স্কালোনি কথা বলেছেন দলের তারুণ্যনির্ভর কৌশল, রক্ষণভাগের শক্তি এবং মেসি-পরবর্তী যুগে দলের স্থায়ী পরিচয় বজায় রাখার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে।
মেসি-পরবর্তী যুগের রূপরেখা
মেসিকে ছাড়া সত্ত্বেও দলের খেলার ধরন ও দর্শন অটুট রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করে সংবাদ সম্মেলনে স্কালোনি বলেন, ‘মেসি অপূরণীয়। আমরা একই দৃষ্টিভঙ্গি, পজেশন ফুটবল এবং পাসিংয়ের মাধ্যমে একসঙ্গে গোলের বন্দরে পৌঁছানোর উপায় খুঁজে নেব। তার সঙ্গে থাকলে সবকিছু বদলায়, কিন্তু আমাদের দলের মূল পরিচয় একই থাকে। আর চ্যালেঞ্জ হলো এইভাবেই খেলা চালিয়ে যাওয়া।’
নির্দিষ্ট কোনো ছক বা ফরমেশনে আটকে না থেকে স্কোয়াডের ফুটবলারদের পজিশন ও সামর্থ্যকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন কোচ। ট্যাকটিক্যাল নমনীয়তা নিয়ে প্রেস কনফারেন্সে স্কালোনি আরও যোগ করেন, ‘আমরা নির্দিষ্ট কোনো সিস্টেমের চেয়ে খেলোয়াড়দের দক্ষতা যাচাই করার চেষ্টা করছি, কারণ আমাদের নিজেদের একটি সুনির্দিষ্ট ও ঝালিয়ে নেওয়া খেলার স্টাইল রয়েছে।’
তরুণদের সুযোগ ও সিনিয়রদের দায়িত্ববোধ
ম্যাচের আগে জাতীয় সংগীত গাওয়ার সময় তরুণদের চোখে-মুখে ফুটে ওঠা উচ্ছ্বাস কোচের মনেও গভীর দাগ কেটেছে। সেই আবেগঘন মুহূর্ত স্মরণ করে সংবাদমাধ্যমে কোচ বলেন, ‘জাতীয় সংগীতের শুরুর মুহূর্তে আমি খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম, কারণ আমরা তরুণদের গান গাইতে শুনতে পাচ্ছিলাম। বোঝা যাচ্ছিল ওরা কত কম বয়সী, আর এটাই আমাদের জন্য পজিটিভ দিক। এই তরুণদের উপভোগ করতে দেখাটা খুব চমৎকার ছিল।’
জাতীয় দলের হয়ে নতুন মুখদের মাঠে নামানোর অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে কোচ জানান যে এই ক্ষণটি কতটা সম্মানের ও রোমাঞ্চকর। নতুনদের অভিষেক প্রসঙ্গে স্কালোনি জানান, ‘যেকোনো কোচের জন্যই কোনো খেলোয়াড়কে ডেব্যু করানো রোমাঞ্চকর, আর জাতীয় দলের কোচের জন্য সেটা আরও বেশি। এই জার্সি পরে মাঠে নামার পেছনে তাদের মুখের অভিব্যক্তি আর দায়িত্ববোধ দেখলেই বোঝা যায় তারা কতটা বিশেষ মর্যাদার অধিকারী।’
দল সফল হওয়ার পর সিনিয়র ফুটবলারদের মধ্যে কোনো অহংকার বা আলস্য কাজ করেনি, বরং তাদের ইতিবাচক মনোভাব তরুণদের জন্য সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। ‘ওরা সবাই আনন্দের অনুভূতি নিয়ে ক্যাম্পে আসে, তাদের ওপর কোনো চাপ থাকে না। তারা এসে বলতে পারত যে আমরা দুটি বিশ্বকাপ খেলেছি, একটি জিতেছি, কোপা আমেরিকা জিতেছি, তাই এখন একটু আরাম করি। কিন্তু তেমনটা মোটেও হয়নি। কোচ যা বলবেন, তার চেয়েও বড় প্রভাব পড়ে সিনিয়রদের এই মনোভাবের ওপর।’
রক্ষণভাগের শক্তি ও ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স মূল্যায়ন
দলের ব্যাকলাইনে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর নেতৃত্ব ও পারফরম্যান্স সবসময়ই দলকে বাড়তি ভরসা জোগায়। বিশ্বমানের এই ডিফেন্ডারকে নিয়ে মূল্যায়ন করতে গিয়ে স্কালোনি মন্তব্য করেন, ‘ক্রিস্টিয়ান রোমেরো বিশ্বের অন্যতম সেরা সেন্টার-ব্যাক। যখন সে ফর্মে থাকে, তখন সেরা না হলেও তার খুব কাছাকাছি থাকে। সে একজন বিশেষ খেলোয়াড়, নিখুঁত পাসিংয়ের ক্ষমতা আছে তার। মাঠের লড়াইয়ে কখনো কখনো তার পা একটু ভারী হয়ে যায়, তবে একজন দুর্দান্ত ফুটবলার হওয়ার পাশাপাশি সে দলের অধিনায়ক এবং ইতিহাসের অংশ হতে চলেছে। তার আচরণ অবশ্যই অনুকরণীয় হতে হবে, এবং সে সেটা বোঝে।’
বদলি হিসেবে নেমে সুযোগ কাজে লাগিয়ে স্কোরশিটে নাম লেখানো হোসে লোপেজের পরিশ্রম ও নিবেদনও কোচের প্রশংসা কুড়িয়েছে। ‘আমরা তাকে নিয়ে ভীষণ খুশি। সে যখনই নামে, নিজের ছাপ ফেলে। সে নিয়মিত সুযোগ তৈরি করে, প্রেস করে এবং দারুণ উপস্থিতি জানান দেয়। সে দ্বিতীয় স্ট্রাইকার, মূল স্ট্রাইকার বা ফলস উইঙ্গার, যেকোনো পজিশনে খেলতে পারে। তার দুর্দান্ত আচরণের জন্য আমরা তার প্রতি সন্তুষ্ট।’