আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস

যে মানুষগুলো একদিন আমাদের আশ্রয় ছিলেন

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের  'আমার প্রিয় মানুষ' নিয়ে রচনা লিখতে দিলে অধিকাংশ শিশুই লেখে মা-বাবার কথা, কেউ কেউ দাদু-নানুর কথাও, তাদের নিয়ে গল্পের ঝুলি আর আনন্দের সব স্মৃতি তুলে ধরে। শৈশবের সেই নির্ভরতার মানুষগুলোই জীবনের কোনো এক বাঁকে এসে ঘরের সবচেয়ে অপাঙ্‌ক্তেয় সত্তায় পরিণত হন। আধুনিক নাগরিক জীবনের এর চেয়ে করুণ বৈপরীত্য আর কী হতে পারে! 

প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে শৈশব, কৈশোর, যৌবন ও প্রৌঢ়ত্ব পেরিয়ে মানুষ বার্ধক্যে উপনীত হয়। জীবন চক্রের সর্বশেষ ধাপ বা পরিণতি হলো বার্ধক্য বা প্রবীণত্ব । বাংলাদেশে সাধারণত ৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী জনগোষ্ঠীকে প্রবীণ নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হয়। এই অনিবার্য পরিণতিকে অস্বীকার করার সাধ্য কারও নেই। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতি, জনস্বাস্থ্যের প্রসার এবং উন্নত পুষ্টির বদৌলতে যখন মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে, তখনই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে এক নিষ্ঠুর সমাজবাস্তবতা। বাংলাদেশ একটি দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশ। একসময় তরুণ জনসংখ্যার দেশ বলে গর্ব করা এই সমাজে দ্রুত নগরায়নের ফলে যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারে রূপান্তর হচ্ছে, কর্মসূত্রে সন্তানদের শহরান্তর বা প্রবাসগমন, আর শহুরে ফ্ল্যাটের সংকুচিত আয়তন কেবল ঘরের পরিমাপই ছোট করেনি সঙ্গে ছোট হচ্ছে মানুষের  মনও। 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ষাটোর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা দেড় কোটির বেশি, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় নয় শতাংশের ওপরে। জনমিতিক হিসাব বলছে, ২০৩০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা দাঁড়াবে দুই কোটি কুড়ি লাখে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে তা পৌনে চার কোটি ছাড়িয়ে যাবে। অর্থাৎ আগামী আড়াই দশকের মধ্যে প্রতি পাঁচজনে একজন হবেন প্রবীণ নাগরিক। যে সমাজ এতদিন ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা তরুণ জনশক্তির প্রাচুর্য নিয়ে গর্ব করেছে, অচিরেই তা পরিণত হতে যাচ্ছে এক ‘প্রবীণপ্রধান সমাজে’। কিন্তু যে দ্রুততায় আমাদের সমাজ প্রবীণপ্রবণ হয়ে উঠছে, সেই অনুপাতে কি তৈরি হচ্ছে আমাদের সামাজিক, মানবিক কিংবা আইনি সক্ষমতা?

প্রতিবছর ১ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক প্রবীণ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ১৯৯০ সালে গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী ১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো দিবসটি পালিত হয়। বাংলাদেশও প্রতিবছর এই দিনে আলোচনা সভা, র‍্যালি ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি আয়োজন করে। কিন্তু এই আনুষ্ঠানিক আয়োজনের বাইরে এসে প্রবীণ দিবস আসলে প্রতিটি নাগরিক ও রাষ্ট্রের জন্য একটি কঠোর আয়না। সেই আয়নায় তাকালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কিভাবে একসময় পরিবার ও সমাজের আলোকবর্তিকা হিসেবে বিবেচিত প্রবীণ প্রজন্ম আজ কীভাবে ক্রমশ একা, অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত বোঝা হিসেবে প্রান্তিক হয়ে পড়ছেন। এই মানসিকতার বদলটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। প্রবীণদের প্রতি মানবিক আচরণ এখন আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের আলোচ্যসূচিতেও উঠে এসেছে। জাতিসংঘের কথায়, জীবনের সঙ্গে আমাদের ‘অতিরিক্ত’ বছর যোগ করা সম্ভব হয়েছে কিন্তু বাড়তি এই বছরগুলোতে জীবনের স্পন্দন যোগ করতে আমরা পারিনি।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে প্রণীত প্রবীণ দিবসের পূর্বে প্রবীণদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি 'সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬'একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সংবেদনশীল সংযোজন। যুগান্তকারী এই সংশোধনীর মাধ্যমে রক্তসম্পর্কীয় স্বজন ও স্বামী-স্ত্রীর ক্ষেত্রে সম্পত্তি দানের সময় দাতা নিজের আজীবন ভোগদখলের অধিকার সংরক্ষণের আইনি স্বীকৃতি পেয়েছেন। অর্থাৎ, সন্তানকে জমি বা বসতভিটা লিখে দিলেও মা-বাবা বেঁচে থাকা পর্যন্ত সেখান থেকে উচ্ছেদ হবেন না। আমাদের দেশে বহু মা-বাবা সারাজীবনের রক্ত পানি করা পরিশ্রমে গড়া একমাত্র আশ্রয়স্থলটি শুধুমাত্র বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে সন্তানের নামে লিখে দেন । কিন্তু দলিল সম্পন্ন হওয়ামাত্রই সেই সংসারে তাঁদের অস্তিত্ব অবাঞ্ছিত হয়ে ওঠে। ভালোবাসার মৌখিক প্রতিশ্রুতির যে কোনো মূল্য নেই, এই আইন অন্তত সেই তিক্ত সত্যকে স্বীকার করে দাতার প্রতি ন্যূনতম সুরক্ষার হাত বাড়িয়েছে।

তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, আইন প্রণয়ন আর অধিকার নিশ্চিতকরণ এক কথা নয়। নতুন এই বিধানে কিছু মৌলিক ধোঁয়াশা এখনো রয়ে গেছে। প্রথমত, ‘ভোগাধিকার’ বলতে কি কেবল প্রবীণের সেখানে বসবাসের অধিকার বোঝাবে, নাকি সেই সম্পত্তির ভাড়া, কৃষিজমির ফসল বা লভ্যাংশ গ্রহণের অধিকারও এর অন্তর্ভুক্ত থাকবে? দ্বিতীয়ত, গ্রহীতা সন্তান যদি মা-বাবাকে অন্ধকারে রেখে সম্পত্তিটি ব্যাংকে বন্ধক রেখে ঋণ নেন এবং সেই ঋণখেলাপির দায়ে ব্যাংক সম্পত্তি নিলামে তোলে, তখন প্রবীণ দাতার বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা কে দেবে? তৃতীয় এবং সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা হলো, প্রতিকারের দীর্ঘসূত্রতা। কোনো সন্তান যদি বলপ্রয়োগ করে অশীতিপর মা-বাবাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়, তবে সেই বয়সে দেশের দেওয়ানি আদালতের জটাজাল ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা পেরিয়ে কি বিচার পাওয়া সম্ভব? জীবনথাকার সময়কালীন ভোগাধিকারের রায় যদি প্রবীণের মৃত্যুর পরে পৌঁছায়, তবে সেই কাগজে মূলত শোকবার্তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কিছু না।

এরপূর্বেও ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’ সালে প্রণীত আইন প্রয়োগের অভিজ্ঞতা আমাদের খুব বেশি আশ্বস্ত করতে পারেনি। আইনটি বইয়ের পাতায় যুগান্তকারী হলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ অত্যন্ত সীমিত। এর পেছনে মূল কারণে হিসেবে দেখা যায়, কোনো বৃদ্ধ মা-বাবা সমাজ ও আত্মীয়স্বজনের লজ্জার ঊর্ধ্বে উঠে নিজের নাড়িছেঁড়া সন্তানের বিরুদ্ধে থানা-পুলিশ কিংবা আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন না। আইনি লড়াই পরিচালনের জন্য যে আর্থিক ও মানসিক সংগতিও প্রয়োজন তা তাঁদের থাকে না। তাই নতুন সম্পত্তি আইনের সুফল পেতে হলে কেবল দেওয়ানি আদালতের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। এক্ষেত্রে প্রয়োজন বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা দ্রুত সালিশি কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে দলিল, নামজারি ও খতিয়ানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভূমি রেকর্ডে জীবনকালীন ভোগাধিকারের শর্ত দ্ব্যর্থহীনভাবে লিপিবদ্ধ করতে হবে, যাতে তৃতীয় কোনো পক্ষ বা ব্যাংক এই শর্ত এড়িয়ে যেতে না পারে।

তবে আইনের পথ ছাড়াও বাস্তবে প্রবীণ জীবনের সংকট আরও গভীর ও করুণ। তাইতো আমাদের সংবাদপত্রে দেখতে হয়েছিল, ময়মনসিংহের নান্দাইলে আটাশি বছর বয়সী এক মাকে চোখ-মুখ বেঁধে নির্জন বিলে ফেলে যাওয়ার ঘটনা । দেখতে হয়েছিল, সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও শিক্ষাবিদ সন্তানদের মায়ের অস্বাস্থ্যকর, অবহেলিত ভাবে ফ্লাটে দিনাতিপাতের সংবাদ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিড়িও ফুটেজে দেখতে হয়েছে হাঁস -মুরগীর ঘরে ঠাঁই পাওয়া বৃদ্ধ মায়ের করুণ মুখচ্ছবি।  এগুলো সমাজের বিচ্ছিন্ন বা ব্যতিক্রম ঝটনা বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বস্তুত এগুলো বর্তমানে সামাজিক মননের এক মারাত্মক ব্যাধির বহিঃপ্রকাশ। এই অবক্ষয়ের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, নাগরিক সমাজ অনুভুতিহীণ হয়ে পড়ছে। যেসব ঘটনা একসময় বিবেককে নাড়া দিত, তা যেন আজ প্রাত্যহিকতায় পরিণত হয়েছে।

এই সামগ্রিক সংকটের মধ্য প্রবীণ নারীদের বাস্তবতা আরও বহুগুণে জটিল ও স্পর্শকাতর। পিতৃতান্ত্রিক পারিবারিক কাঠামো, আজীবন গৃহকর্মে শ্রম দেওয়ার পরও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার অভাব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রান্তিক অবস্থান তাঁদের চরম পরনির্ভরশীল করে রাখে। প্রকৃতির নিয়মে পুরুষের চেয়ে নারীদের গড় আয়ু তুলনামূলক বেশি হওয়ায় অধিকাংশ প্রবীণ নারীকে জীবনের শেষ সময় কাটাতে হয় নিঃসঙ্গ, বিধবা এবং ক্ষমতাহীন অবস্থায়। জলবায়ু বিপর্যয়, পারিবারিক ভাঙন কিংবা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসে পড়ে এই সম্বলহীন প্রবীণ নারীদের ওপরই। রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো লিঙ্গসমতার কথা বারবার বললেও সামাজিক সুরক্ষার নীতিগুলোতে প্রবীণ নারীদের এই নীরব হাহাকার খুব কমই প্রতিফলিত হয়।

এই মানবিক ও সামাজিক দুর্যোগ থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে; প্রথমত, ইউনিয়ন পরিষদ ও স্থানীয় প্রশাসন পর্যায়ে প্রবীণদের অভিযোগ নিষ্পত্তির একটি সহজ, সম্মানজনক ও সংবেদনশীল আনুষ্ঠানিক পথ তৈরি করতে হবে, যাতে ঘরের বিরোধ নিয়ে তাঁদের আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে না হয়। দ্বিতীয়ত, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে দিবাযত্ন কেন্দ্র ও প্রবীণ নিবাসের পরিসর বাড়াতে হবে। তবে তা পারিবারিক বন্ধনের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং পরিবারকে সক্রিয় সহায়তা দেওয়ার কাঠামো হিসেবে। তৃতীয়ত, স্বাস্থ্যসেবায় জেরিঅ্যাট্রিক মেডিসিন বা প্রবীণদের বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছানো অপরিহার্য।

তবে সবচেয়ে বড় দায়িত্বটা আসলে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক নয়, নৈতিক দায়িত্ব। শিক্ষা পাঠ্যক্রমে এবং পারিবারিক পরিসরে দায়িত্ববোধের উন্মেষ ঘটাতে হবে। সন্তান যেন শৈশব থেকেই অনুধাবন করতে পারে, মা-বাবার দেখাশোনা কোনো দয়া বা অনুকম্পা নয়, এটি অলঙ্ঘনীয় নৈতিক ঋণ। সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রে ইতিবাচক অবদানের জন্য যেমন পুরস্কৃত করা হয়, তেমনি সন্তান হিসেবে দায়িত্বশীল আচরণকে সামাজিকভাবে পুরস্কৃত করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা দরকার। যাতে সবাই এমন নৈতিক আচরণ চর্চায় উৎসাহিত হয়। 

পরিশেষে বলা যায়, যে মানুষগুলো নিঃস্বার্থভাবে নিজেদের যৌবন বিসর্জন দিয়ে আমাদের একটি বাসযোগ্য জীবন উপহার দিয়েছেন, তাঁদের জীবনের সায়াহ্নে আমরা কি ন্যূনতম মানবিক মর্যাদাটুকু দিতে পারছি? এই আত্মোপলব্ধির উত্তর কোনো আদালতের ফাইলে নেই । পাশাপাশি এটাও সত্য যে, আইন কোন বাবা-মায়ের সন্তানকে অন্তর থেকে মানবিক করতে পারবে না। তবে চরম দায়িত্বহীনতা ও অনৈতিকতার মূল্য যে কত চড়া হতে পারে, তা নিশ্চিত করার দায় কোন মানবিক রাষ্ট্র এড়িয়ে যেতে পারে না।

লেখক : স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ। গবেষক  ও শিক্ষক।  
Nazmunrumi17@gmail.com