চারজনের কাঁধে ১২ হাজার খামারি, প্রাণিসম্পদ দপ্তরে জনবল সংকট

খামারির সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির সংখ্যাও বাড়ছে। তবে সে অনুযায়ী বাড়েনি প্রাণিসম্পদ দপ্তরের জনবল। ফলে সীমিত জনবল দিয়ে বছরের পর বছর সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতাল।

দপ্তরে অনুমোদিত ১১টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ছয়জন। এর মধ্যে দুজন ডেপুটেশনে থাকায় বাগাতিপাড়া দপ্তরে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র চারজন। প্রায় পাঁচ বছর ধরে জনবল সংকটের মধ্যেই চলছে দপ্তরের কার্যক্রম।

প্রাণিসম্পদ দপ্তর সূত্রে জানা যায়, উপজেলার পাঁচ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় ছোট-বড় প্রায় ১২ হাজার খামারি রয়েছেন। এসব খামারির চিকিৎসা, রোগ প্রতিরোধ, টিকাদান, খামার ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ ও সম্প্রসারণমূলক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় জনবল কম থাকায় মাঠপর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।

সূত্র আরও জানায়, অনুমোদিত ১১টি পদের বিপরীতে বর্তমানে ছয়জন কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে ড্রেসার পদে কর্মরত আসাদুজ্জামান প্রায় ছয় মাস ধরে রাজশাহীতে ডেপুটেশনে রয়েছেন। অন্যদিকে ভেটেরিনারি ফিল্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট পদে কর্মরত একজন প্রায় এক বছর ধরে ঢাকায় ডেপুটেশনে রয়েছেন। ফলে কাগজে-কলমে ছয়জন কর্মরত থাকলেও বাগাতিপাড়া দপ্তরে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন চারজন। অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাদের নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে।

স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিনের জনবল সংকটের কারণে প্রাণিসম্পদ দপ্তরের মাঠপর্যায়ের সেবার পরিধি কাঙ্ক্ষিতভাবে বাড়ছে না। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে পশু অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা, পরামর্শ ও রোগ প্রতিরোধমূলক সেবা পেতে অনেক সময় সমস্যায় পড়তে হয়। জনবল বাড়ানো হলে নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন, টিকাদান ও রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম আরও জোরদার হবে বলে মনে করেন তারা।

জনবল সংকটের প্রভাব পড়েছে দপ্তরের বিভিন্ন মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমেও। সরকারি টিকাদান কর্মসূচি, রোগ প্রতিরোধ, খামারিদের পরামর্শ প্রদান, বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেবা, উঠান বৈঠক ও সম্প্রসারণমূলক কার্যক্রম নিয়মিতভাবে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। জরুরি কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে সীমিত জনবল দিয়ে দ্রুত পরিস্থিতি মোকাবিলাও কঠিন হয়ে পড়ে।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. রোকনুজ্জামান বলেন, দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ উপসহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (সম্প্রসারণ) পদে দীর্ঘদিন ধরে জনবল সংকট রয়েছে। একজনকে পদায়ন করা হলেও তিনি প্রায় এক বছর ধরে ঢাকায় ডেপুটেশনে রয়েছেন। ফলে মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণ কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যা হচ্ছে। জনবল সংকটের কারণে সরকারি টিকাদান কর্মসূচি নির্ধারিতভাবে বাস্তবায়ন করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

তিনি বলেন, অনেক সময় স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে টিকাদানের কাজ পরিচালনা করতে হলেও সরকারি প্রশিক্ষিত জনবল না থাকায় কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।

ডা. রোকনুজ্জামান আরও জানান, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৭০ থেকে ৮০ জন খামারি ও পশুপালক চিকিৎসা ও পরামর্শের জন্য উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে আসেন। কিন্তু সীমিত জনবল দিয়ে সবার কাছে দ্রুত ও মানসম্মত সেবা পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে খামারিদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে রোগ প্রতিরোধ, পরামর্শ প্রদান, উঠান বৈঠক ও সম্প্রসারণমূলক কার্যক্রম অনেকটা ব্যাহত হচ্ছে।

তবে কৃত্রিম প্রজনন (এআই) কার্যক্রমে বর্তমানে তেমন কোনো সমস্যা নেই বলে জানান তিনি। এ খাতে প্রয়োজনীয় জনবল থাকায় সেবাটি স্বাভাবিকভাবে চলমান রয়েছে।

জরুরি রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে পরিস্থিতি মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে ডা. মো. রোকনুজ্জামান বলেন, অর্ধেকেরও কম জনবল দিয়ে কাজ করা অত্যন্ত কঠিন। তারপরও বিদ্যমান জনবল নিয়েই তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। জনবল সংকট নিরসনে মহাপরিচালকের কাছে লিখিতভাবে বিষয়টি জানানো হয়েছে। দ্রুত শূন্য পদগুলো পূরণ করা হলে জনগণের দোরগোড়ায় আরও কার্যকরভাবে প্রাণিসম্পদ সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।

উপজেলার সোনাপাতিল মহল্লার ছাগল খামারি আনোয়ার বলেন, তার একটি ছাগলের খামার রয়েছে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের কাঙ্ক্ষিত সেবা তারা পাচ্ছেন না। দপ্তরের কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালিত হলে খামার সম্প্রসারণে তারা আরও উৎসাহিত হতেন।

মুরাদপুর এলাকার গরুর খামারি আনিসুর রহমান বলেন, উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের সেবায় তারা পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন। সরকারের উচিত দ্রুত জনবল সংকট দূর করে দপ্তরের কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা, যাতে খামারিরা সময়মতো প্রয়োজনীয় সেবা পান।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. রোকনুজ্জামান আরও বলেন, তিনি বাগাতিপাড়ার প্রাণিসম্পদ খাতকে আরও এগিয়ে নিতে চান। উপজেলার প্রতিটি বাড়ি একটি মডেল খামারে পরিণত হবে এবং প্রতিটি পরিবার অর্থনৈতিক উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে, এমনটাই তার আশাবাদ।