দক্ষিণের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হতে পারে কুয়াকাটা

পরিকল্পিত উন্নয়ন, সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ, আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা ও পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে পটুয়াখালীর কুয়াকাটাকে কেন্দ্র করে দক্ষিণাঞ্চলে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক বিকাশের বড় সুযোগ তৈরি হতে পারে। সম্ভাবনা, চলমান উন্নয়ন, নতুন বিনিয়োগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কুয়াকাটাকে ঘিরে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

একই সৈকতে দাঁড়িয়ে ভোরের প্রথম আলোয় সমুদ্রের বুক থেকে সূর্যের উদয় এবং বিকেলে দিগন্তের ওপারে সূর্য হারিয়ে যাওয়ার দৃশ্য কুয়াকাটার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।

তবে কুয়াকাটার পর্যটন সম্ভাবনা শুধু সৈকতকেন্দ্রিক নয়। লেম্বুরবনের ম্যানগ্রোভ, গঙ্গামতির চর, ঝাউবন, লাল কাঁকড়ার বিচরণ, বিস্তীর্ণ বালুচর ও বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশি এ অঞ্চলের পর্যটন সম্ভাবনাকে করেছে বহুমাত্রিক।

এর পাশাপাশি পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার সোনার চর, চর হেয়ার, চর বিজয়, চর তুফানিয়া, ক্রাব আইল্যান্ড ও জাহাজমারা সমুদ্রসৈকতের মতো গন্তব্যও পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এসব দ্বীপ, চর ও সৈকতকে পরিকল্পিতভাবে পর্যটন নেটওয়ার্কে যুক্ত করা গেলে কুয়াকাটাকে ঘিরে গড়ে উঠতে পারে বিস্তৃত উপকূলীয় পর্যটন বলয়।

পর্যটন ব্যবসায়ী ও পরিবেশকর্মী মো. নেছার উদ্দিন হাওলাদার বলেন, কুয়াকাটার চর হেয়ার, সোনার চর, চর তুফানিয়া কিংবা এ ধরনের যেকোনো একটি দ্বীপকে পরিকল্পিতভাবে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা গেলে মালদ্বীপের মতো বিশ্ব পর্যটকদের আকৃষ্ট করা সম্ভব। এসব দ্বীপে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি রয়েছে বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল, বন, বন্যপ্রাণী, সামুদ্রিক মৎস্য ও সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য।

তিনি বলেন, উপকূল থেকে বিচ্ছিন্ন এসব দ্বীপকে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে পরিকল্পিতভাবে সাজানো গেলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়ানো সম্ভব। তবে পর্যটন উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। দ্বীপভিত্তিক পর্যটনকে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নিতে পারলে কুয়াকাটাকে ঘিরে দক্ষিণাঞ্চলে আন্তর্জাতিক মানের একটি পর্যটন বলয় গড়ে তোলা সম্ভব।

কুয়াকাটা ট্যুর গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শামীম রেজা বলেন, একটা সময় ছিল যখন শুধু স্থানীয় পর্যটকেরা আসতেন। বর্তমানে দেশ-বিদেশের বহু পর্যটক কুয়াকাটা ভ্রমণে আসছেন। জেলার দ্বীপগুলোর নির্জন প্রকৃতি, বিস্তীর্ণ বালুচর, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, জেলেদের জীবনযাত্রা ও নৌভ্রমণের অভিজ্ঞতা পর্যটকদের জন্য ভিন্নধর্মী আকর্ষণ তৈরি করছে।

কুয়াকাটা রাখাইন মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান মিরাজ বলেন, রাখাইন সম্প্রদায়ের শত বছরের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি, পোশাক, হস্তশিল্প ও জীবনযাত্রাকে কেন্দ্র করে এ মার্কেট গড়ে উঠেছে। স্থানীয় তাঁতিদের হস্তশিল্প প্রদর্শনী, ঐতিহ্যবাহী খাবার, সাংস্কৃতিক পরিচিতি এবং প্রশিক্ষিত স্থানীয় গাইডের মাধ্যমে পর্যটকেরা কুয়াকাটার ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানার সুযোগ পাচ্ছেন।

হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম এ মোতালেব শরীফ বলেন, বর্তমানে এখানে ‘ডে-ট্যুরিস্ট’ বা একদিনের পর্যটক বেশি। পর্যটকদের দু-তিন দিন ধরে রাখতে কুয়াকাটা থেকে নৌপথে সুন্দরবন, ফাতরাবন, সোনার চর, চর বিজয় ও ক্রাব আইল্যান্ডের মতো গন্তব্যে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব ভ্রমণব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। এতে পর্যটকদের অবস্থানের সময় বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় নৌযান, গাইড, খাবার ও আবাসন খাতের মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান বাড়বে।

তিনি আরও বলেন, এসব দ্বীপ ও চর পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল। তাই পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণ, নৌযান চলাচল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পর্যটক প্রবেশের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ন রেখে পরিকল্পিতভাবে দ্বীপভিত্তিক পর্যটন গড়ে তোলা গেলে কুয়াকাটা হতে পারে দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তৃত উপকূলীয় পর্যটনের মূল প্রবেশদ্বার।

ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটার (টোয়াক) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, পর্যটকদের চাহিদা বাড়ায় কুয়াকাটায় বিভিন্ন মানের আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ গড়ে উঠেছে। বড় বিনিয়োগের পাশাপাশি ভিআইপি মানের হোটেলও নির্মিত হচ্ছে, যা নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করছে।

তবে কুয়াকাটার ভবিষ্যৎ শুধু অবকাঠামো নির্মাণের ওপর নির্ভর করে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। পরিচ্ছন্ন সৈকত, নিরাপদ পরিবেশ, দক্ষ গাইড, বিশুদ্ধ পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঠিক সমন্বয় প্রয়োজন। স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারলে উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে।

পর্যটনের পাশাপাশি কুয়াকাটার অর্থনীতির আরেকটি বড় ভিত্তি মৎস্যসম্পদ ও কৃষি। আলীপুর ও মহিপুর মৎস্যবন্দরকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন শত শত ট্রলার ও হাজারো মানুষের কর্মব্যস্ততা চলে। বঙ্গোপসাগরভিত্তিক এ মৎস্য খাতকে ‘ফিশারিজ ট্যুরিজম’-এর আওতায় এনে পর্যটকদের তাজা সামুদ্রিক মাছের স্বাদ, মৎস্যবন্দর পরিদর্শন ও জেলেদের জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচিত করানোর সুযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে পাখিরমারাসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষি উৎপাদন ও সবজি বাজারও পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে টেকসই বহুমুখী অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

স্থানীয় কৃষিপণ্য, সামুদ্রিক মাছ, রাখাইন হস্তশিল্প, খাবার ও নৌভ্রমণকে পর্যটনসেবার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে এর সুফল ছড়িয়ে পড়তে পারে স্থানীয় উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে।

প্রকৃতি, পরিবেশ, স্থানীয় কৃষি-মৎস্যসম্পদ এবং শত বছরের রাখাইন ঐতিহ্যের এমন বৈচিত্র্যময় মেলবন্ধনে কুয়াকাটা শুধু অবসর বিনোদনের পর্যটনকেন্দ্র নয়, বরং দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

এ বিষয়ে কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আরিফুজ্জামান বলেন, কুয়াকাটাকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার ও প্রশাসন কাজ করছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট করতে পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন, পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে সমুদ্রসৈকতের পাশাপাশি নদী, বন, দ্বীপ, মৎস্যসম্পদ ও রাখাইন সংস্কৃতিকে ঘিরে বহুমাত্রিক পর্যটন বিকাশের পরিকল্পনা রয়েছে। পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পর্যটনের মাধ্যমে কুয়াকাটাকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরাই লক্ষ্য।