দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জোরালো অভিযানের মধ্যেও চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা থামছে না। গত দুই দিনের ব্যবধানে নগরের খুলশী থানা এলাকায় মো. হৃদয় নামে এক কিশোর গ্যাং সদস্য খুন এবং বাকলিয়ায় দুই সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলিতে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের অংশ নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর খুলশী থানার ওয়্যারলেস কলোনির ৪ নম্বর গলিতে মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত নেতা ওয়াকিল হোসেন বগার অফিসে মো. হৃদয়কে ডেকে নেয় কামরুল নামে আরেক কিশোর। বগার অফিস থেকে বের হওয়ার পরপরই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা হৃদয়কে ছুরিকাঘাত করে। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। হৃদয় হত্যাকাণ্ডে কামরুলসহ ছয়জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে বলে জানিয়েছেন খুলশী থানার ওসি মো. আবদুর রহিম।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, খুলশীর ওয়্যারলেস কলোনিতে ‘ফাইভ স্টার’ ও ‘সেভেন স্টার’ নামে দুটি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। নিহত হৃদয় ফাইভ স্টার গ্রুপের সদস্য ছিল। সপ্তাহখানেক আগে দুই গ্রুপের মধ্যে সিনিয়র-জুনিয়র নিয়ে কথাকাটাকাটির জেরে হৃদয়কে ছুরিকাঘাত করে ‘সেভেন স্টার’ গ্রুপের সদস্যরা। ফাইভ স্টার গ্রুপের সদস্যরা খুলশী থানা যুবদলের আহ্বায়ক হেলাল উদ্দিনের অনুসারী বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
অপরদিকে ‘সেভেন স্টার’ গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন পুলিশকে পেটানোর হুমকিদাতা ও ২৩ মামলার আসামি স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত নেতা ওয়াকিল হোসেন বগা এবং তার ভাই রকিবুল হোসেন। দুই গ্রুপের বড়ভাই হিসেবে পরিচিত ওয়াকিল হোসেন বগা, তার ভাই রকিবুল ইসলাম এবং হেলাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে এলাকায় অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি, জায়গা দখল, মাদক ব্যবসা ও কিশোর গ্যাং পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। তবে তিনজনই এসব অভিযোগ সংবাদমাধ্যমের কাছে অস্বীকার করেছেন।
পরিবারের ভাষ্য, নিহত হৃদয় বাবার সঙ্গে ভ্যানে করে সবজি বিক্রি করত। তার বাবা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। গত মঙ্গলবার দুপুরে বাসায় ভাত খাওয়ার সময় বগার অফিসে ডেকে নিয়ে হৃদয়কে খুন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে তার পরিবার।
এদিকে গত ২৭ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে নগরের বাকলিয়া থানাধীন সৈয়দ শাহ রোডে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বহিষ্কৃত যুবদল কর্মী মুরাদ ও জসিম উদ্দিন গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে অর্ধশতাধিক কিশোর গ্যাং সদস্যও যোগ দেয়। দুই পক্ষের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপ, কয়েকটি বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দ শোনা যায়। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য, সংঘর্ষের ওই ঘটনার মূলহোতা ‘মুরাদ বাহিনীর’ প্রধান মো. মুরাদ। তার বিরুদ্ধে নগরের বিভিন্ন থানায় মাদক, অস্ত্রসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগে ১৬টি মামলা রয়েছে। গত মঙ্গলবার রাতে মুরাদকে তিন সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার অন্য দুজন হলেন সুমন ও রুহুল আমিন।
এদিকে কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের চলমান বিশেষ অভিযানের অংশ হিসেবে গত সোমবার দিবাগত রাতে ১৭টি থানা এলাকায় ৪৪৫ জনকে আটক করা হয়। অপরাধে সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় ১৫২ জনের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম।
কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাতসহ অন্যান্য অপরাধের বিষয়ে নগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, ‘চুরি, ছিনতাই, মাদক, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে এসব অপরাধী গোষ্ঠীর নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরও আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।’
পুলিশ নিয়মিত অপরাধীদের তালিকা হালনাগাদ করে এবং সেই অনুযায়ী নিয়মিত গ্রেপ্তার অভিযান চলছে বলেও জানান সিএমপির শীর্ষ এই কর্মকর্তা।
গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, কিশোররা এখন আর কেবল বিচ্ছিন্ন দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন গ্যাং চাঁদাবাজি, মাদক ও সহিংসতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে এলাকা দখল, ভাড়াটে লাঠিয়াল হিসেবে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে জমি দখলের কাজেও। কিছু কিছু চক্রে কিশোরদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রাপ্তবয়স্করা, যারা এলাকায় ‘বড়ভাই’ হিসেবে পরিচিত।
কিছু গ্যাং কেবল চাঁদাবাজিতে সীমাবদ্ধ নেই। তাদের কেউ কেউ আন্ডারওয়ার্ল্ড বা অপরাধজগতেও জড়িয়ে পড়ছে। কিশোর অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে এবং মাদক কারবারি, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনার জন্য পুলিশ সদর দপ্তর থেকে গতকাল বুধবার নতুন করে একটি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সিএমপির একটি সূত্র।
জানা গেছে, গত মঙ্গলবারের এক সভায় পুলিশের অতিরিক্ত আইজি সাইদুর বলেন, ‘কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী জড়িত কি না, তা খুঁজে বের করতে হবে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কেবল গ্রেপ্তার করে কিশোর গ্যাং নির্মূল করা সম্ভব নয়। তাদের যারা সংগঠিত করে, টাকা-পয়সা দেয় কিংবা নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের অনেকেই ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে।’
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, বিভিন্ন অপরাধে কিশোরদের যারা ব্যবহার করে, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের পক্ষ থেকেও জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে। কিশোররা এলাকায় বড়ভাইদের নামে বিভিন্ন গ্যাংয়ে যুক্ত হচ্ছে। মাদক ব্যবসা, অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে তারা।
সবশেষ গতকাল বুধবার পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে পুলিশের তৎপরতা জোরদার হয়েছে। গত সোমবার কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর ও নোয়াখালীতে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে ১ হাজার ৩১০ জনকে আটক করেছে পুলিশ। এর মধ্যে অন্তত ৭৩০ জনকে পরে তাদের অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বাকিদের অপরাধে সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।