জামালপুর সিংহজানি খাদ্যগুদাম ঘিরে নানা অভিযোগ, তদন্তের মুখে কর্মকর্তা

জামালপুর শহরের সিংহজানি খাদ্যগুদামের সংরক্ষণ ও চলাচল কর্মকর্তা (এসএমও) ইসরাত আহমেদ পাপেলের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে অনিয়ম, মিল মালিকদের কাছ থেকে ঘুষ দাবিসহ সরকারি খাদ্যশস্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের একাধিক অভিযোগ উঠেছে।

কর্মস্থলে নিয়মিত উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন। পাশাপাশি ব্যক্তিগত আচরণ ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সম্প্রতি তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন ময়মনসিংহের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক। ফলে তদন্তে কী পাওয়া যায় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরবর্তী সময়ে কী ব্যবস্থা নেয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, ময়মনসিংহে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করায় ইসরাত আহমেদ নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত থাকেন না। সপ্তাহে কয়েক দিন ব্যক্তিগত গাড়িতে করে দেরিতে অফিসে আসেন এবং দিনের কাজ শেষে ময়মনসিংহে ফিরে যান—এমন দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন। গত ২৪ সেপ্টেম্বর সিংহজানি খাদ্যগুদামে সরেজমিনে গিয়ে ইসরাত আহমেদকে অফিসে পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে তার অনুপস্থিতির কারণ জানতে চাইলে কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেননি, তিনি ছুটিতে আছেন কি না।

বিষয়টি জানতে চাইলে জেলার ভারপ্রাপ্ত খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আসাদুজ্জামান খান বলেন, ওই দিন ইসরাত আহমেদ অফিসে আসেননি—এ বিষয়টি তিনি জানতেন। তবে তিনি নিয়মিত অফিসে অনুপস্থিত থাকেন—এমন তথ্য তার জানা নেই। তিনি আরও বলেন, ওই দিন ইসরাত আহমেদ কোনো ছুটিও নেননি। ব্যক্তিগত গাড়িতে করে অফিসে আসা-যাওয়া করেন—এ বিষয়টিও তিনি জানেন বলে জানান।

সিংহজানি খাদ্যগুদামে সরকারি ধান-চাল সংগ্রহকে কেন্দ্র করে ঘুষ দাবির অভিযোগও করেছেন কয়েকজন মিল মালিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন অভিযোগ করেন, গুদামে চাল সরবরাহের সময় প্রতি টনে ৮০০ টাকা করে দিতে হয়। টাকা না দিলে চালের মান নিয়ে আপত্তি তুলে চাল ফেরত পাঠানো কিংবা বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।

এদিকে, সিংহজানি খাদ্যগুদাম ঘিরে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হলো ২০২৬ সালের ২২ এপ্রিল প্রায় ১৫ মেট্রিক টন সরকারি চালসহ একটি ট্রাক আটকের ঘটনা। র‍্যাব-১৪ জামালপুর শহরের ডাকপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে চালবোঝাই ট্রাকটি জব্দ এবং চালককে আটক করে। র‍্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, চালগুলো সিংহজানি খাদ্যগুদাম থেকে শেরপুরের একটি অটোরাইস মিলে নেওয়া হচ্ছিল। পরে এ ঘটনায় মামলা হয়।

তবে এ ঘটনায় কোনো অনিয়মের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেন এসএমও ইসরাত আহমেদ। তিনি জানান, তার গুদাম থেকে ওই চাল বের হয়নি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তার কাছে রয়েছে।

জামালপুরের ভারপ্রাপ্ত জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকও জানান, ঘটনাটি তদন্তের জন্য কমিটি করা হয়েছিল। তবে চালকের কাছ থেকে সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে তথ্য না পাওয়ায় কাউকে দায়ী করা যায়নি বলে তিনি দাবি করেন।

গুদাম-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের বোরো মৌসুমে সিংহজানি খাদ্যগুদামে চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১২ হাজার ৪৩০ মেট্রিক টন, যা পূরণ হয়েছে। ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ হাজার ৫৫০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ১৭৮ মেট্রিক টন অবশিষ্ট ছিল।

এর আগের ২০২৫ সালের বোরো মৌসুমে চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৩ হাজার ৫৩৭ মেট্রিক টন। সংগ্রহ করা হয় ১১ হাজার ৯০৫ মেট্রিক টন। ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ৪৪৫ মেট্রিক টন, যা পূরণ হয়েছিল।

এই দুই মৌসুমের সংগ্রহ কার্যক্রমে নিম্নমানের চাল গ্রহণ, পুরোনো বস্তা গ্রহণ এবং মিলারদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন।

ইসরাত আহমেদ পাপেলের ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ার কথাও প্রতিবেদকের কাছে এসেছে। এর মধ্যে একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকার সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগও রয়েছে।

তবে ইসরাত আহমেদ এ অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন। তার ভাষ্য, ওই নারী আগে তার পরিচিত ছিলেন এবং তার স্বামী অসুস্থ থাকায় তিনি তাকে টাকা ধার দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ওই পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ছড়ানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

ময়মনসিংহের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের নির্দেশে এসব অভিযোগসহ ইসরাত আহমেদের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিষয়টি ২৯ সেপ্টেম্বর আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আশরাফুল আলম নিশ্চিত করেছেন।

ইসরাত আহমেদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাকে গফরগাঁওয়ের ‘আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ইসরাত আহমেদ দাবি করেছেন, সংগঠনটি অরাজনৈতিক এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

এর আগে ২০২৫ সালের সরকারি বোরো ধান-চাল সংগ্রহ উদ্বোধন অনুষ্ঠানেও আওয়ামী লীগের স্থানীয় এক নেতার উপস্থিতির বিষয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। ওই অনুষ্ঠানে ইসরাত আহমেদও উপস্থিত ছিলেন।

ইসরাত আহমেদের ব্যক্তিগত গাড়ি, ময়মনসিংহ শহরে ফ্ল্যাট এবং গফরগাঁওয়ে বাড়িসহ বিভিন্ন সম্পদের তথ্য উল্লেখ করে তার সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।

এ বিষয়ে ইসরাত আহমেদ বলেন, গাড়ি ও বাড়িসহ এসব সম্পদ তার বাবার করা এবং বাবার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হিসেবে তিনি সেগুলো ব্যবহার করছেন।

তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো লিখিত প্রমাণ প্রতিবেদকের কাছে উপস্থাপন করেননি অভিযোগকারীরা।

একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে অনিয়ম, ঘুষ গ্রহণ, খাদ্যশস্য সংগ্রহে অনিয়ম এবং ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে একাধিক অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের নির্দেশে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে কী তথ্য উঠে আসে এবং অভিযোগগুলোর কোনটি সত্যতা পায়, সেটিই এখন মূল বিষয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আবার তদন্তে অভিযোগের সত্যতা না মিললে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগেরও অবসান ঘটবে।