ইসলামে অহিংসার শিক্ষা

ইসলাম শান্তি ও নিরাপত্তার ধর্ম। কারও প্রতি অন্যায় করা, কষ্ট দেওয়া বা ক্ষতি করা ইসলামের আদর্শ নয়। ইসলাম মানুষের প্রতি দয়া, সংযম, ক্ষমা ও ন্যায়বিচারের শিক্ষা দিয়েছে। এ জন্য অহিংসা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক শিক্ষাগুলোর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুসলিম সে, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ।’ (সহিহ বুখারি)

এই শিক্ষা শুধু শারীরিক আঘাত থেকে বিরত থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গালি দেওয়া, অপমান করা, কটূক্তি করা, মিথ্যা অপবাদ দেওয়া এবং অন্যের সম্মান নষ্ট করাও মানুষের ওপর এক ধরনের আঘাত। তাই প্রকৃত মুসলমান নিজের আচরণে অন্যের জন্য নিরাপত্তা ও স্বস্তি তৈরি করে।

মানুষের জীবনে রাগ আসা স্বাভাবিক। কিন্তু রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। রাগের কারণে মানুষ অনেক সময় এমন কথা বলে বা কাজ করে, যার জন্য পরে অনুতপ্ত হতে হয়। তাই ইসলাম রাগের মুহূর্তে প্রতিশোধ নেওয়ার পরিবর্তে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে উৎসাহিত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে। বরং শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (সহিহ বুখারি)

অহিংসার সঙ্গে ক্ষমার সম্পর্ক গভীর। প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা করে দেওয়া মানুষের মহৎ চরিত্রের পরিচয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ, কিন্তু যে ক্ষমা করে এবং সংশোধন করে, তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে।’ (সুরা শুরা ৪০)

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনেও ক্ষমা ও সহনশীলতার বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। তিনি অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন। তার প্রতি অপমান, নির্যাতন ও বিরোধিতা করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিশোধপরায়ণতা তার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য ছিল না। বরং তিনি মানুষকে ক্ষমা করেছেন এবং কল্যাণের পথে আহ্বান জানিয়েছেন।

অহিংসা মানে অন্যায়কে সমর্থন করা নয়। ইসলাম শান্তি ও দয়ার শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছে। কোনো নিরপরাধ মানুষের ওপর জুলুম হলে তার প্রতিকার করা প্রয়োজন। তবে প্রতিকারও ন্যায়সংগত হতে হবে। সীমালঙ্ঘন করা যাবে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার পরিত্যাগে প্ররোচিত না করে। তোমরা ন্যায়বিচার করো। এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।’ (সুরা মায়েদা ৮)

একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে ওঠে মানুষের পারস্পরিক আচরণের মাধ্যমে। সেখানে মানুষ অন্যের অধিকারকে সম্মান করবে, দুর্বলকে কষ্ট দেবে না, রাগের সময় নিজেকে সংযত করবে এবং ভুল হলে ক্ষমা চাইবে। ইসলাম এমন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য নৈতিক চরিত্রকে গুরুত্ব দিয়েছে।

একজন মুসলমানের কথা, আচরণ ও সিদ্ধান্তে যেন অন্য মানুষ নিরাপদ থাকে, এটাই ইসলামের আদর্শ। ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ, আর সমাজ থেকে বৃহত্তর মানবজীবনে এই শিক্ষা ছড়িয়ে পড়লে মানুষের মধ্যে হিংসা ও বিদ্বেষ কমবে এবং শান্তি ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পাবে।

লেখক : ইসলামি গবেষক