রোনালদোকে ছাড়াই পর্তুগালের দাপট, জয়ের হ্যাটট্রিক

ফুটবল বিশ্বে যখন ওই একটি মাত্র নাম নিয়ে নানা গুঞ্জন ও বিতর্কের ঝড় বইছে, ঠিক তখনই মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে সব শঙ্কা পেছনে ফেলে দুর্দান্ত এক বার্তা দিল পর্তুগাল। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে ছাড়াই কোপেনহেগেনে উয়েফা নেশনস লিগের ম্যাচে ডেনমার্ককে ৪-২ গোলে উড়িয়ে দিয়ে টানা তিন জয়ে গ্রুপ ‘এ৪’-এর শীর্ষস্থান আরও সুদৃঢ় করল টুর্নামেন্টের বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। 

ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবলের পসরা সাজিয়ে বসা পর্তুগাল ১৩ মিনিটেই ডেডলক ভেঙে এগিয়ে যায়। গনসালো রামোসের সঙ্গে ওয়ান-টু এক্সচেঞ্জ করে প্রতিপক্ষের রক্ষণ চিরে ডি-বক্সে ঢুকে দারুণ ফিনিশিংয়ে বল জালে পাঠান জোয়াও কানসেলো। তবে ঘরের মাঠে ছেড়ে কথা বলেননি ডেনিশরা। ২৩ মিনিটে জোয়াকিম ম্যালের পাস থেকে চমৎকার এক কার্ল শটে স্কোরলাইন ১-১ করেন মিকেল ড্যামসগার্ড।

সমতায় ফিরে স্বাগতিকরা স্বস্তি পাওয়ার চেষ্টা করলেও, তার স্থায়ীত্ব ছিল মোটে তিন মিনিট। ২৫ মিনিটে ব্রুনো ফার্নান্দেজের নিখুঁত পাস থেকে বল পেয়ে ঠান্ডা মাথায় নিচু শটে ব্যবধান ২-১ করেন এসি মিলান ফরোয়ার্ড রামোস। কোচের আস্থার প্রতিদান দিয়ে গত চার দিনের মধ্যে এটি ছিল তার দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক গোল। প্রথমার্ধের বাকি সময় নুনো মেন্দেস ও রামোস গোলের সুযোগ পেলেও ব্যবধান বাড়াতে পারেননি। 

বিরতির পর ঘুরে দাঁড়ানোর বার্তা নিয়ে মাঠে নামে ডেনমার্ক। ৫৩ মিনিটে ড্যামসগার্ডের পাস থেকে বল পেয়ে গোলরক্ষক দিওগো কস্তাকে বোকা বানিয়ে নিখুঁত চিপ শটে সমতা ফেরান নাপোলি ফরোয়ার্ড রাসমুস হয়লুন্দ। গোল করার পর ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বিখ্যাত ট্রেডমার্ক সেলিব্রেশন করে গ্যালারিতে বাড়তি উন্মাদনা ছড়িয়ে দেন তিনি।

হয়লুন্দের সেই সমতাসূচক গোলের পরই খেলায় সত্যিকারের গতি পায় পর্তুগাল। ৬৭ মিনিটে ব্রুনো ফার্নান্দেজের বাড়ানো নিখুঁত ক্রসে উর্ধ্বে লাফিয়ে উঠে দুর্দান্ত হেডে বল জালে জড়িয়ে ব্যবধান ৩-২ করেন পিএসজির মিডফিল্ডার ভিতিনহা। আর ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে (৮৭ মিনিটে) বদলি হিসেবে নামা জোয়াও ফেলিক্স দিওগো দালোতের পাস থেকে ক্লিনিক্যাল ফিনিশিংয়ে দলের চতুর্থ গোল নিশ্চিত করলে জয় নিশ্চিত হয়ে যায় পর্তুগালের।

এই রোমাঞ্চকর জয়ের নেপথ্যে অবশ্য দলের ভেতরে কাজ করেছে উত্তাল এক পরিস্থিতি। ম্যাচের আগে দলের অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড রোনালদোর হঠাৎ ক্যাম্প ছেড়ে চলে যাওয়ার ঘটনা ফুটবল দুনিয়ায় বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দেয়। নরওয়ের বিপক্ষে পুরো ম্যাচ বেঞ্চে কাটিয়ে ডেনমার্ক ম্যাচের স্কোয়াডেও তাকে শুরুর একাদশে রাখা হবে না, কোচ হোর্হে জেসুসের এমন পূর্বঘোষণার পরই দল ছাড়েন আল-নাসর ফরোয়ার্ড। 

দলের শৃঙ্খলা ও নিজের নীতি নিয়ে ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে জেসুস সোজাসাপ্টা ভাষায় জানান, “একটি অত্যন্ত উচ্চমানের জয়, যেখানে দল চার গোল করেছে এবং আমার মতে পারফরম্যান্স ছিল দারুণ এক স্ট্যান্ডার্ডের, যা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া যায় না। অন্য যা কিছু ঘটেছে, তার চেয়ে এটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ...সবার জন্য নিয়ম এক। এটি এমন একটি পদ্ধতি যা আমি আমার পুরো কোচিং ক্যারিয়ারে মেনে চলেছি এবং ভবিষ্যতেও মেনে চলব।”

দলের ভেতরে কোনো ভাঙন বা অশান্তি তৈরি হয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে স্পোর্ট টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জেসুস আরও দৃঢ়ভাবে বলেন, “গ্রুপকে আমার সঙ্গে থাকা থেকে বিরত রাখতে পারে এমন কোনো কিছু নেই। আমি প্রশ্নটি বুঝতে পারছি। তবে গুরুত্বপূর্ণ হলো আমাদের কাজটা করা। যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, সেগুলো দলটিকে বিভক্ত করেনি, আলাদা করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না।”

পরবর্তীতে আরটিপিকে দেওয়া আরেক প্রতিক্রিয়ায় দলের খেলোয়াড়দের সমর্থন ও নিজের বিশ্বাসের কথা তুলে ধরে তিনি যোগ করেন, “আমার এমন এক দল আছে যারা আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বাস করে। এত ব্যক্তিগত মানের খেলোয়াড়দের নিয়ে কাজ করা সহজ। তারা ঠিক আমার এবং আমার ভাবনার পেছনে রয়েছে।”

কোচের এই কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি দলের ফুটবলাররাও মাঠের পারফরম্যান্স ও ঐক্য নিয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। কোচের অধীনে দলের রূপান্তর ও খেলার কৌশল নিয়ে রামোস সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “সবকিছুর ওপরে নতুন কোচ আমাদের দারুণভাবে সাহায্য করছেন। আমাদের পরিকল্পনা এখন অনেক পরিষ্কার; রক্ষণ হোক বা আক্রমণ, প্রত্যেক সতীর্থের অবস্থান সম্পর্কে আমরা ওয়াকিবহাল। প্রতিদিন আমরা উন্নত হচ্ছি, যা আমাদের এই পারফরম্যান্স দেখেই বোঝা যায়।”

একই সুর মিলিয়েছেন ভিতিনহাও, “আমরা কেবল ম্যাচের দিকে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আমার মনে হয় আমরা অবিশ্বাস্য এক উত্তর দিয়েছি। পুরো দলকে এর জন্য অভিনন্দন। কোচের সাথে যত বেশি সময় কাটাচ্ছি, তার আইডিয়াগুলো তত বেশি নিজেদের মধ্যে আত্মস্থ করতে পারছি।”

এদিকে রোনালদোর হঠাৎ দল ছাড়ার বিষয়ে ডিফেন্ডার রেনাতো ভেইগা জানান, ক্রিশ্চিয়ানোর প্রতি তার ব্যক্তিগত অনুরাগ ও গভীর ভালোবাসা থাকলেও কোচের কঠোর নির্দেশনার কারণে এই মুহূর্তে ওই বিষয়ে মন্তব্য করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।

আগামী রবিবার নরওয়ের বিপক্ষে ঘরের মাঠে ম্যাচ খেলে বর্তমান আন্তর্জাতিক উইন্ডো শেষ করবে জেসুসের দল, যেখানে জয়ের এই ধারা বজায় রাখাই এখন তাদের মূল লক্ষ্য।