কৃষকের ছেলে বিসিএসে ইতিহাসে প্রথম, গেজেটে নেই নাম!

‘অভাবের সংসারে কত কষ্ট করে পড়াশোনা করাইছি, আল্লাহ জানে কেন এমন হইলো আমার ছাওয়ালটার সঙ্গে। এত কষ্ট করে পড়াশোনা করার পরে একটা চাকরি হয়েছে বলে টেকিছে। এখন শুনেছি আমার ছাওয়ালটাকে বাদ দিয়েছে। কেন বারে, আমার বাবাটার কী দোষ?’ 

চোখের পানি মুছতে মুছতে কথাগুলো বলছিলেন ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও চূড়ান্ত নিয়োগ গেজেটে নাম না থাকা সোহেল রানার মা শাহিদা বেগম।

নীলফামারী সদর উপজেলার সোনারায় ইউনিয়নের কুখাপাড়া গ্রামের কৃষক আবু হোসেনের ছেলে সোহেল রানা ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে ইতিহাস বিষয়ে শিক্ষা ক্যাডারে প্রথম স্থান অর্জন করেন। তবে বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত চূড়ান্ত নিয়োগ গেজেটে তার নাম পাওয়া যায়নি।

এর আগে গত বছরের ১১ নভেম্বর বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) ৬৮৩টি পদের বিপরীতে ৬৬৮ জনকে মনোনয়ন দিয়ে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করে। সেই তালিকায় ইতিহাস বিষয়ে প্রথম ছিলেন সোহেল। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত গেজেটে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে ৬১১ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

তবে চূড়ান্ত গেজেটে নিজের নাম না থাকার কারণ জানেন না বলে জানিয়েছেন সোহেল। তিনি বলেন, ৪৯তম বিসিএসে ইতিহাস বিভাগে শিক্ষা ক্যাডারে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলাম। দীর্ঘ ১০ মাস পর গেজেট প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু সেখানে আমার নাম না দেখে আমি নিজেই হতভম্ব হয়ে গেছি। কী কারণে আমার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, সেটিও আমি জানি না।

সোহেলের দাবি, তার বা পরিবারের কারও বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা থানায় অভিযোগ নেই এবং পরিবারের কেউ কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। কেন আমাকে বাদ দেওয়া হলো, সেটি আমি নিজেও এখনো জানি না। আমার পরিবার কোনোভাবেই রাজনৈতিক বা অন্য কোনো সম্পৃক্ততার সঙ্গে জড়িত নয়। আমি একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। আমার পরিবারের কেউই কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন” বলেন তিনি।

পুলিশ ভেরিফিকেশনের প্রসঙ্গ তুলে সোহেল বলেন, কোনো ব্যক্তি অপরাধ, রাষ্ট্রবিরোধী কাজ বা সরকারবিরোধী কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত থাকলে সাধারণত ভেরিফিকেশনে তা উল্লেখ করা হয়। তবে এসব বিষয়ের সঙ্গে তিনি বা তার পরিবার ন্যূনতম কোনোভাবে সম্পৃক্ত নন বলে দাবি তার।

কৃষকের ঘর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : সোহেলের বেড়ে ওঠা নীলফামারীর একটি কৃষক পরিবারে। ২০১৪ সালে সোনারায়-সংগলশী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ নিয়ে এসএসসি এবং ২০১৬ সালে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে জিপিএ-৪.৯২ নিয়ে এইচএসসি পাস করেন তিনি। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হন। ২০২০ সালে সিজিপিএ ৩.৫৪ নিয়ে স্নাতক এবং ২০২১ সালে সিজিপিএ ৩.৫৬ নিয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। সোহেলের বাবা আবু হোসেন বলেন, অভাবের সংসারে ছেলেকে পড়াতে গিয়ে তাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে।

শুধু এই আশায় ছেলেকে পড়াশোনা করিয়েছি, একদিন নিজের পায়ে দাঁড়াবে, ভালো একটা চাকরি করবে। ছেলেকে পড়াতে গিয়ে জমি-জায়গা বিক্রি করেছি। অনেক কষ্ট করে তাকে এতদূর নিয়ে এসেছি, বলেন তিনি।

ছেলে বিসিএসে সুপারিশ পাওয়ার খবর পাওয়ার দিনের কথা স্মরণ করে আবু হোসেন বলেন, যেদিন জানতে পারলাম, আমার ছেলে বিসিএসে টিকে গেছে, সেদিন আমাদের আনন্দের সীমা ছিল না। মনে হয়েছিল, এত বছরের কষ্ট অবশেষে সার্থক হয়েছে। কিন্তু গেজেটে ছেলের নাম না থাকায় পরিবারটি ভেঙে পড়েছে বলে জানান তিনি। যে ছেলে এত কষ্ট, পরিশ্রম ও মেধার মাধ্যমে বিসিএসে উত্তীর্ণ হলো, শেষ পর্যন্ত গেজেটে তার নাম নেই- এটা একজন বাবা হিসেবে মেনে নেওয়া খুবই কষ্টের। সরকারের কাছে আমার অনুরোধ, আমার ছেলের বিষয়টি যেন বিবেচনা করা হয়। এত বছরের পরিশ্রম, ত্যাগ ও স্বপ্ন যেন এভাবে শেষ হয়ে না যায়, বলেন আবু হোসেন।

স্কুলের শিক্ষক ও এলাকাবাসী ব্যথিত : সোনারায়-সংগলশী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক বিভূতি ভূষণ রায় বলেন, সোহেল ২০১৪ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে এসএসসি পাস করেন। পরে কারমাইকেল কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।

৪৯তম বিসিএসে সে ভালো ফলাফল করে ইতিহাস বিভাগে শিক্ষা ক্যাডারে প্রথম স্থান অধিকার করে। কিন্তু গেজেট প্রকাশের পর তার নাম বাদ দেওয়ায় আমরা স্কুলের সব শিক্ষক ও এলাকাবাসী ব্যথিত, বলেন তিনি।

সোহেলের প্রতিবেশী মাজাহারুল ইসলাম বলেন, আগে তারা শুনেছিলেন সোহেল প্রথম হয়েছেন এবং একটি ভেরিফিকেশন বাকি রয়েছে। তখন পরিবারটির দীর্ঘদিনের কষ্টের অবসান হবে বলে তারা আশা করেছিলেন।

তিনি বলেন, আমরা ভেবেছিলাম, হয়তো তার বাবার কষ্ট করে পড়ানোটা সার্থক হবে। এবার পরিবারটি একটু শান্তিতে থাকতে পারবে। কিন্তু এখন শুনলাম, তাকে নাকি রাজনৈতিক কারণে বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে আমার দেখা মতে, সে কোনো দিন কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। তবে সোহেলকে কেন চূড়ান্ত নিয়োগ গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, সে বিষয়ে কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত বা কারণের কথা তিনি জানেন না বলেও জানান।

বিসিএসের প্রস্তুতিতে চাকরিও ছাড়েননি সোহেল : সোহেল জানান, ৪৯তম বিসিএসে অংশ নেওয়ার সময় তিনি একটি চাকরি করতেন। সেই চাকরির পাশাপাশি বিসিএসের প্রস্তুতি নেওয়াকে চ্যালেঞ্জিং বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বাংলাদেশের অন্যতম সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা বিসিএসে টিকতে অন্য সব পরীক্ষার্থীর মতো আমাকেও অনেক দিন-রাত এক করে পড়াশোনা করতে হয়েছে। অনেক রাত নির্ঘুম কেটেছে, বলেন তিনি।

বিসিএসে সুপারিশ পাওয়ার পর অন্য চাকরির জন্য তেমন চেষ্টা করেননি জানিয়ে সোহেল বলেন, আমার সর্বোচ্চ একটি চাওয়া ছিল বিসিএসে চাকরি পাওয়া। সেই চাওয়া পূরণ হয়ে গিয়েছিল। এ কারণে আর কোথাও সেভাবে আবেদনও করিনি বা চেষ্টা করিনি।

চূড়ান্ত গেজেটে নাম না থাকায় এখন তিনি কী করবেন, তা নিয়েও অনিশ্চয়তার কথা জানান সোহেল। সোহেলের নাম চূড়ান্ত নিয়োগ গেজেটে না থাকার কারণ কী, তার নিয়োগ পুলিশ ভেরিফিকেশন বা অন্য কোনো কারণে আটকে আছে কি না- এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে ইতিহাস বিষয়ে প্রথম স্থান অর্জন ও পিএসসির চূড়ান্ত ফলাফলে সুপারিশ পাওয়ার পরও সোহেলের নাম চূড়ান্ত নিয়োগ গেজেটে না থাকার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।