নামজারির জন্য নিয়ম মেনে আবেদন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও জমা দিয়েছেন। এরপরও দিনের পর দিন ঘুরতে হয়েছে ভূমি কার্যালয়ে। কখনো কাগজপত্রে ত্রুটি, কখনো জমি নিয়ে জটিলতার কথা বলে আটকে রাখা হয়েছে কাজ। শেষ পর্যন্ত সেই ‘জটিলতা’ কাটাতে চাওয়া হয়েছে টাকা। এমন অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার চরপাথরঘাটা ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা (তহশিলদার) মো. জহির রায়হানের বিরুদ্ধে।
শুধু তহশিলদার নন, তার সহকারী (ক্যাজুয়াল) মো. শহিদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন একাধিক সেবাপ্রার্থী। তাদের অভিযোগ, নামজারি ও জমি-সংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা দিতে ২০ হাজার টাকা থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুস দাবি করা হয়। টাকা না দিলে তদন্ত ও প্রক্রিয়া আটকে রাখা হয়। আর টাকা দিলে দ্রুত কাজ করে দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগীদের একজন মো. লোকমান। নামজারির জন্য দীর্ঘদিন ধরে ভূমি কার্যালয়ে ঘুরেও কাজ করাতে পারেননি বলে অভিযোগ তার। একের পর এক অজুহাত দেখিয়ে তার আবেদনের কার্যক্রম বিলম্বিত করা হয়। পরে তাকে পাশের একটি কক্ষে নিয়ে প্রথমে ২০ হাজার টাকা এবং পরে আরও এক লাখ টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ঘুস দাবির অভিযোগের প্রতিকার এবং নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন লোকমান।
অভিযোগে লোকমান উল্লেখ করেন, কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহার বাসিন্দা তিনি ও তার ভাতিজি শিরিন আক্তার চরপাথরঘাটা মৌজায় পৃথক দুটি কবলা দলিলের মাধ্যমে জমি কেনেন। জমি কেনার আগে সংশ্লিষ্ট তহশিলদার জহির রায়হানকে দলিলপত্রে কোনো ত্রুটি আছে কি না, তা দেখান তাঁরা। তহশিলদার জমিটি নিষ্কণ্টক বলে জানান এবং ভূমি উন্নয়ন করও আদায় করেন।
পরে জমির নামজারি-জমাভাগের জন্য উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর পৃথক দুটি আবেদন করেন লোকমান ও শিরিন। প্রস্তাবনার জন্য আবেদন দুটির ফাইল ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ে পাঠানো হলে তহশিলদারের সহকারী মো. শহিদের মাধ্যমে প্রতি ফাইলের জন্য ১০ হাজার টাকা করে মোট ২০ হাজার টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
লোকমানের দাবি, অনেক অনুরোধের পর দুটি ফাইলের জন্য ৬ হাজার টাকা দেন তিনি। এরপর জমি পরিমাপ ও দখল নিশ্চিত হওয়ার পরও নানা অজুহাতে নামজারি প্রক্রিয়া বিলম্বিত করা হয়। একপর্যায়ে তহশিলদার ও তার সহকারী প্রতিটি ফাইলের জন্য ৫০ হাজার টাকা করে মোট এক লাখ টাকা দাবি করেন। এই টাকা না দিলে নামজারি হবে না এবং কীভাবে নামজারি হয়, তা দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
লোকমানের মতো আরও কয়েকজন সেবাপ্রার্থীও চরপাথরঘাটা ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ে ঘুস দাবির অভিযোগ করেছেন। তাঁদের ভাষ্য, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকার পরও টাকা ছাড়া কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া কঠিন। নানা সমস্যা দেখিয়ে সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি করা হয়। পরে টাকা দিলেই দ্রুত সমাধান হয়ে যায় সমস্যার।
ফরিদ নামে আরেক সেবাপ্রার্থী বলেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার জন্য চরপাথরঘাটায় তাঁর জমির খাজনা পরিশোধের রসিদ প্রয়োজন ছিল। এ জন্য টানা তিন দিন ভূমি কার্যালয়ে গেলেও খাজনা পরিশোধ করতে পারেননি। পরে অনলাইনে খাজনা পরিশোধের কথা বলে ৭০ টাকা খাজনার বিপরীতে ৫০০ টাকা দিতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
একই ইউনিয়নের বাসিন্দা শাহজাহান বলেন, ‘চরপাথরঘাটা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদার টাকা ছাড়া কোনো কাজ করেন না। টাকা না দিলে নানা ধরনের সমস্যা দেখানো হয়। টাকা দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।’
অভিযোগের বিষয়ে চরপাথরঘাটা ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা জহির রায়হানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।
তবে তহশিলদারের সহকারী (ক্যাজুয়াল) মো. শহিদ লোকমানের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এ বিষয়ে কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিদুয়ানুল ইসলাম বলেন, ‘অভিযোগের বিষয়টি তদন্তের জন্য নবনিযুক্ত সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস এম আমিরুল মোস্তফাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’