এমপির পদত্যাগ

আপনি আচরি ধর্ম শিখাও অপরে

সবার জন্য আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করে ধীরে ধীরে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফেনীর পরশুরামে গত বৃহস্পতিবার এক জনসভায় তিনি এ কথা বলেন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজটি তারেক রহমান যে নিজের দল থেকেই শুরু করেছেন, তা স্পষ্ট হয় আগের দিন জাতীয় সংসদ থেকে নিজ দল বিএনপির একজন সদস্যকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার মধ্য দিয়ে। সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগের মাধ্যমে নির্দেশটি বাস্তবায়িত হয়েছে। বর্তমান রাজনৈতিক পরিসরে প্রধানমন্ত্রীর এ সিদ্ধান্তকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনামূলক ব্যবস্থা হিসেবে আমরা স্বাগত জানাই।    

গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে নির্বাচিত নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর নাগরিকরা আশা করছেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং  রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা পাবে। নতুন সরকার প্রায় আট মাস আগে দায়িত্ব গ্রহণ করে। এর আগে-পরে চাঁদাবাজি ও জায়গা-জমি দখলসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে, এমন কর্মকা-ে অপরাধীদের সঙ্গে সঙ্গে বিএনপিসহ কয়েকটি দলের স্থানীয় অনেক নেতাকর্মী, প্রভাবশালী নেতা ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির আত্মীয়স্বজনের নাম আসতে থাকে। কিছু অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা হলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী আত্মীয়স্বজনের হস্তক্ষেপে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটতে থাকায় আইনশৃঙ্খলার উন্নতির প্রশ্নে নাগরিকদের অনেকের মধ্যে হতাশা দেখা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে দলনির্বিশেষে অভিযুক্ত ব্যক্তি ও বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে যুক্ত বেপরোয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নাগরিক সমাজ দাবি জানাতে থাকে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনাগুলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের সদিচ্ছাকেও প্রশ্নের মুখোমুখি করে। এরই মধ্যে রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় মিষ্টির নাম আসা সরকার ও ক্ষমতাসীন বিএনপির জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে। দলের ঢাকা মহানগরীর মাঝারি সারির প্রয়াত দুই নেতা ভাই নাসির উদ্দিন আহম্মেদ পিন্টু ও স্বামী সাইদুর রহমান নিউটনের পরিচয়ে অনেকটা পরিচিত হলেও মাঠপর্যায়ে  বিএনপিতে মিষ্টির কিছুটা নিজস্ব পরিচিতিও আছে। বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ ছাত্র সংসদে ছাত্রদলের প্যানেল থেকে একসময় নির্বাচিত সহ-সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। দলের দুঃসময়ে মাঠে সক্রিয় থাকার পুরস্কার হিসেবে নারীদের জন্য সংরক্ষিত ৩৬ আসনের একটিতে মাত্র কয়েক মাস আগে মনোনয়ন দেওয়া হয় তাকে। কিন্তু সরকার ও দলের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর বিবেচিত হওয়ায় সেই মিষ্টিকে ছেঁটে ফেলার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রায় একই সময়ে একজন প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন দলের ঢাকা মহানগর উত্তরের কমিটিও বাতিল করা হয়েছে। কারণ, এই কমিটির কয়েকজন রাড্ডার ঘটনায় জড়িত ছিলেন এমন তথ্য রয়েছে। মিষ্টি কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। আমরা আশা করছি এ দুটি ঘটনার মাধ্যমে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে মন্ত্রী, এমপি ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের বার্তা দেওয়া হচ্ছে যে, ক্ষমতার অপব্যবহার, বিতর্কিত কর্মকা- এবং সরকার ও দলের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয় এমন যেকোনো কাজে জড়ালে শাস্তি পেতে হবে। 

নাগরিকদের প্রত্যাশা আইনের শাসন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশে শান্তি আসুক। কিন্তু চাঁদাবাজি, ভূমি দখল এবং অন্যান্য অপরাধের যে ব্যাপকতা, তাতে এসব কর্মকা-ে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে দৃশ্যমান কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রাখা এখন সময়ের দাবি। জাতীয় সংসদে সদস্যরা আইনের শাসনের কথা বলেন। অন্যের চাঁদাবাজি, ভূমি দখল এবং অন্যান্য অপরাধের বিরুদ্ধেও তারা সরব থাকেন। কিন্তু নিজেকে এসব ঘটনায় জড়ানো থেকে বিরত রাখা এবং নিজ এলাকায় নেতাকর্মীদের অপরাধ সংঘটনে নিবৃত্ত রাখার ক্ষেত্রেও এমপিরা ভূমিকা রাখবেন এটাই প্রত্যাশিত।

সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক নির্মূল ও ভূমি দখলসহ অপরাধ দমনে সরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর সমন্বিত অভিযানের কথা বলছে। এমন পরিস্থিতিতে আমরা আশা করি, মিষ্টির বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থা এবং ঢাকা উত্তরের কমিটি বাতিল শুধু তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ায় পর্যবসিত হবে না। ভবিষ্যতে যারাই অপরাধে জড়াবে এবং আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে নাগরিকদের শান্তি বিনষ্ট করবে, তারা যত প্রভাবশালীই হোক, সবাইকে আইন ও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। আমাদের আশা, প্রধানমন্ত্রীর তৈরি করা উদাহরণ অন্যরা অনুসরণ করবেন।