দীর্ঘদিনের গবেষণায় জেনেছি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও পাঠগ্রহণের সম্পর্ক আন্তরিক নয়। স্কুলের শিক্ষক সব বিষয় শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন। অনেক শিক্ষার্থী বিষয়বস্তু বা পাঠটি ভালোভাবে বুঝতে পারে না। কখনো দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের বয়স বিবেচনায় নিয়ে বিষয়বস্তু উপস্থাপন করা হয় না। ফলে সিলেবাস শেষ হয়, পরীক্ষা আসে কিন্তু পাস আসে না। অভিভাবকদের কাছ থেকে অভিযোগ পাই, ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষকদের বাসায় পড়া বা তার পরিচালিত কোচিংয়ে পড়ার জন্য শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা, ইচ্ছা করে ফেল করানো হচ্ছে যা সত্যি দুঃখজনক। শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ে নিতে কিছু কৌশলও নেন শিক্ষকরা। সপ্তাহে রবিবার, মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার রোল নং-১, ৩, ৫, ৭ স্কুলে থাকবে আর জোড় রোলগুলো কোচিংয়ে যাবে শনি, সোম ও বুধবার। বেজোড় কোচিংয়ে যাবে, জোড়গুলো স্কুলে থাকবে। কখনো কখনো অভিভাবকদের অপশন থাকে না। স্কুল শিক্ষক বা কোচিংয়ের শিক্ষকরা অভিভাবকদের সন্তানদের কোচিংয়ে পাঠাতে উদ্বুদ্ধ করেন। নানা রকম উপঢৌকন দেন। ফলে অভিভাবকরা সেই কোচিংয়ের একজন হন। কোনো কোনো অভিভাবক দুশ্চিন্তায় পড়ে শিক্ষার্থীদের কোচিং সেন্টারে পাঠান। এটা সহজ সাধারণ কথা। কিন্তু গভীরে যা নিহিত আছে, কোচিং সেন্টারগুলোর সঙ্গে স্কুলের সম্মানিত শিক্ষকরা জড়িত। শিক্ষকদের সচ্ছলভাবে বাঁচার জন্য এর বিকল্পও কিছু নেই। কোনো কোনো কোচিং সেন্টার শতভাগ কমন প্রশ্নেœর নিশ্চয়তাসহ এ+ পাওয়ার নিশ্চয়তা দেন। সেখানে শুধু জ্ঞানদান করা হয় বা পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য উপযোগী করা হয়। কিন্তু একজন সন্তানকে প্রকৃত অর্থে মানুষ করার মন্ত্র স্কুল এবং পরিবার ছাড়া অন্য কোথাও হতে পারে কিনা, জানা নেই। কোনো কোনো শিক্ষার্থী সপ্তাহে একদিন বা দুদিন স্কুলে যায়। প্রতিদিন কোচিং করে, বহু শিক্ষার্থী আছে যারা স্কুলের প্রধান শিক্ষক বা শ্রেণি শিক্ষকদের নাম জানে না। এটা শুভ লক্ষণ নয়। শিক্ষার্থীরা স্কুলে না গিয়ে কোচিংয়ে যায়। সেখানে কড়াকড়ি-ধরাধরি নেই। কে, কী ধরনের পোশাক পরল, কীভাবে চলল বা বলল তার জন্য কৈফিয়ত দিতে হয় না।
অনেক শিক্ষার্থী শিক্ষকদের দেখলে, সালাম দেওয়ার রীতি ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। এটা কী ধরনের শিক্ষাব্যবস্থায় আমরা নিমজ্জিত হচ্ছি? মনে হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের বিকাশ ঘটলেও দৈহিক, মানসিক, সামাজিক ও আত্মিক বিকাশ হচ্ছে না। নম্বর বেশি পাওয়ার দৌড়ে অংশ নিয়ে জীবনে আনন্দের স্বাদ থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। অবশ্য কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে নম্বরকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। এতে প্রকৃত মেধাবীর যোগ্যতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। এটা ঠিক, শিক্ষকরা আন্তরিকতার সঙ্গে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তবে যতটুকু সময় তারা পান, সেটুকু যদি যথাযথ পদ্ধতি-কৌশল ও শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের বয়স ও চাহিদা বিবেচনায় বিষয়বস্তু আলোচনা করেন, তাহলে কোচিংমুখিতা কিছুটা হলেও কমবে। কোচিং সেন্টার যদি সব ধরনের শিক্ষার উৎস হতো, তাহলে স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন পড়ত না। কোনো কোনো পরিবারে দেখা যায়, একটা বাচ্চা নিয়ে মা ছুটছেন কোচিং সেন্টার বা শিক্ষকের বাসায়। ছোট সন্তান গৃহকর্মীর কাছে রেখে যাচ্ছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সন্তানের খবরাখবর নেওয়ার সময় পান না মা। এতে ছোট সন্তান অপুষ্টিতে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। যে উদ্দেশ্য নিয়ে বড় সন্তানকে কোচিংয়ে দেওয়া হচ্ছে, তা সফলতা লাভ করতে পারেনি। পরিবারের সবাইকে বলতে চাই, বেশি না চেয়ে যে নিয়মে আপনি পড়েছেন, আপনার বাবা-মা পড়ালেখা করেছেন সেই নিয়মে পথ চলুন। নিশ্চয়ই মনে আছে, আমাদের সময়ও কেউ কেউ প্রাইভেট পড়তাম, তবে নির্দিষ্ট একটা বা দুটো বিষয়ে। বিশেষ কোনো অধ্যায়ের গণিত বা ইংরেজি গ্রামার, তাও এক বা দুই মাস। মাসের পর মাস প্রাইভেট পড়তে হতো না। এখন মা-বাবাদের একটা সামাজিক মর্যাদা বাড়ানোর কৌশলে পরিণত হয়েছে কোচিং সেন্টারে সন্তান ভর্তি। কোনো কোনো অভিভাবক তার সন্তানদের কতজন প্রাইভেট টিউটর বা কতটি কোচিং সেন্টারে পাঠাচ্ছেন, তার ওপর সামাজিক অবস্থান নির্ণয় করেন। এই উপায় কতটুকু সঠিক?
আপনারা যারা ছেলেমেয়েদের নিয়ে কোচিং সেন্টারে যাচ্ছেন না বা যাওয়ার সময় পাচ্ছেন না, তারা কী জানেন ওরা কী কোচিংয়ে যাচ্ছে, না অন্য কোথাও? কয়টায় কোচিং? কত টাকা কোচিং ফি? কখন তারা ফিরবে? একবারও কী ভেবেছেন, সন্তানের ভালোর জন্য কোচিংয়ে পাঠিয়ে বিপদ ডেকে আনছেন? ভাবেননি একসময় কষ্ট আপনাকেই পেতে হবে। পরিবার-সমাজ-দেশ কেউ এগিয়ে আসবে না। কয়েকদিন পর পত্রিকায় শিরোনাম হবে ‘মাদকাসক্ত বখাটে সন্তানের হাতে পিতা-মাতা খুন।’ আমরা এমন নেতিবাচক চিন্তা করতে চাই না। আবার এমন চিন্তা একেবারে উড়িয়ে দেবেন, তারও সুযোগ নেই। তাই মা-বাবা, শিক্ষক, সমাজ, কোচিং সেন্টারের পরিচালক, রাষ্ট্র, সরকার এবং অভিভাবক সবাইকে সঠিক চিন্তা করে মুক্তির পথ বের করতে হবে। নয়তো খুব বেশি দিন লাগবে না কোচিংয়ের শিক্ষক, স্কুল-কলেজ শিক্ষক, মা-বাবা- কেউ একসময় রেহাই পাবেন না। এখনই সময় মা-বাবা, শিক্ষক, সমাজ, সরকার সবার সচেতন হওয়ার। ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিন, সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করুন।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, চট্টগ্রাম
phd22ju@gmail.com