পূর্বাভাসের চেয়ে টেকসই পরিকল্পনা জরুরি

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি নিয়ে বৈশ্বিক ও জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা যখনই হয়, তা সাধারণত দূরবর্তী পূর্বাভাসের ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকে। বলা হয়, শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ সমুদ্রের পানি কত সেন্টিমিটার বাড়বে, কত শতাংশ উপকূলরেখা জলের নিচে তলিয়ে যাবে কিংবা কত লাখ মানুষ বা¯ ‘চ্যুত হবে। এই বৈজ্ঞানিক প্রাক্কলনগুলো নিশ্চিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তবে নীতি-কৌশল প্রণয়নের ক্ষেত্রে কেবল পূর্বাভাসের ওপর নির্ভর করা এক ধরনের বিশ্লেষণাত্মক অসম্পূর্ণতা তৈরি করে। কারণ এটি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিকে ‘বর্তমান বাস্তবতা’ হিসেবে না দেখে কেবল ‘ভবিষ্যতের একটি সম্ভাব্য দুর্যোগ’ হিসেবে বিবেচনা করতে শেখায়। অথচ গতিশীল এই ব-দ্বীপ অর্থনীতির জন্য এটি কোনো কাল্পনিক ভবিষ্যৎ নয়, বরং প্রাত্যহিক সংকট। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা সবচেয়ে বিপন্ন দেশগুলোর মধ্যে মালদ্বীপ, টুভালু ও মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের মতো ছোট দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো তাদের অস্তিত্বের সংকটের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। বড় বদ্বীপ হিসেবে বাংলাদেশ অন্যতম শীর্ষ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। মালদ্বীপ, টুভালু, কিরিবাস ও মার্শাল দ্বীপপুঞ্জর উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র কয়েক ফুট উঁচুতে হওয়ায়, সম্পূর্ণ তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। নেদারল্যান্ডস এবং ভিয়েতনামের মতো বদ্বীপ অঞ্চলগুলোও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

২০২৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের উচ্চ-পর্যায়ের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন এবং এতে গৃহীত রাজনৈতিক ঘোষণাপত্রটিকে এই গভীর ও বিশ্লেষণাত্মক প্রেক্ষাপট থেকে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে এ কারণে যে, এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশ একটি ব্যতিক্রমী এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিল। একদিকে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি দেশ হিসেবে ড. খলিলুর রহমানের কূটনৈতিক নেতৃত্ব, অন্যদিকে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে বৈশ্বিক জলবায়ু কার্যক্রমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সোচ্চার নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঢাকার অবস্থানকে বেশ জোরালো করেছে। তবে প্রশ্ন হলো, বিশ্বমঞ্চের এই কূটনৈতিক সাফল্য দেশের অভ্যন্তরে জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বাস্তব পদক্ষেপে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে? এই বিতর্কের গভীরে প্রবেশের আগে জলবায়ু পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক পরিসংখ্যানগুলো নির্ভুলভাবে বোঝা দরকার। বিশ্বজুড়ে স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণের শুরুর দিকে (১৯৯৩-২০০২) যেখানে প্রতি বছর গড়ে ২.১ মিলিমিটার হারে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছিল, সেখানে গত এক দশকে (২০১৫-২০২৪) এই হার দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে বার্ষিক ৪.৭ মিলিমিটারে পৌঁছেছে।

সরকারি প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২৫ সেন্টিমিটার বাড়লে দেশের প্রায় ৪ শতাংশ ভূখণ্ড পানির নিচে তলিয়ে যেতে পারে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে অন্তত ১ কোটি মানুষ। চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ উপকূলীয় এলাকার ১২ থেকে ১৮ শতাংশ অঞ্চল প্রত্যক্ষ ঝুঁকির মুখে পড়বে। এখানে দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা জরুরি: স্বল্পমেয়াদি নির্দিষ্ট উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যাপক প্লাবনের আশঙ্কা, দুটোই বৈজ্ঞানিকভাবে সত্য হলেও নীতিপ্রণেতারা যদি এই দুটি সময়সীমাকে গুলিয়ে ফেলেন, তবে জলবায়ু অর্থায়ন ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় চরম বিভ্রান্তিতৈরি হয়। জাতিসংঘে বাংলাদেশের উত্থাপিত ৪-দফা ও ৫-দফা এজেন্ডায় বৈশ্বিক নির্গমন হ্রাস, সহজলভ্য জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তির হস্তান্তর এবং জলবায়ু-জনিত ক্ষয়ক্ষতি তহবিলের পূর্ণ পুনর্ভরণের দাবিগুলো ছিল আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু কূটনৈতিক বার্তার এই সুনির্দিষ্টতা আমাদের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন নীতিমালায় ততটা দৃশ্যমান নয়। মূল বিশ্লেষণাত্মক দুর্বলতা তৈরি হয় ‘অভিযোজন’ এবং ‘ক্ষয়ক্ষতি’-এর মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য অনুধাবন না করার কারণে।

অভিযোজন হলো ঝুঁকি কমানোর আগাম ব্যবস্থা যেমন সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ, মজবুত বেড়িবাঁধ তৈরি বা লবণাক্ত তা-সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন। বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় যে সাফল্য দেখিয়েছে, তা মূলত এই অভিযোজনেরই সাফল্য। এর ফলে ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণহানি ব্যাপক হারে কমেছে। কিন্তু অভিযোজনেরও একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। যখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নদীভাঙনে ভিটেমাটি পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়, ভূগর্ভস্থ সুপেয় পানি স্থায়ীভাবে লবণাক্ত হয়ে পড়ে বা কৃষি জমি চাষের অনুপযোগী হয়ে দাঁড়ায়, তখন আর খাপ খাইয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে না; সেটি সরাসরি ‘ক্ষয়ক্ষতি’ বা লোকসানের খাতায় গিয়ে জমা হয়। জাতিসংঘে উঠে আসা আর্থিক চিত্রটি আরও আশঙ্কাজনক। প্রাক্কলন বলছে, ২০৩৫ সাল নাগাদ জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বছরে ৩১০ থেকে ৩৬৫ বিলিয়ন ডলার অর্থের প্রয়োজন হবে। কিন্তু ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক সরকারি অভিযোজন অর্থায়নের পরিমাণ ছিল মাত্র ২৬ বিলিয়ন ডলার। এই বিশাল ব্যবধান স্পষ্ট করে দেয় যে, এককভাবে আন্তর্জাতিক সাহায্যের ওপর ভরসা করে উপকূল রক্ষা করা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ বাজেট থেকে অভ্যন্তরীণ জলবায়ু কর্মসূচি ও ট্রাস্ট ফান্ডে বরাদ্দ বাড়িয়ে বৈশ্বিক দরকষাকষিতে নৈতিক ভিত্তি শক্ত করার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি অবকাঠামোগত কিছু বড় অঙ্কের প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করা হয়েছে। যেমন-২০,০০০ কিলোমিটার নদী ও খাল পুনঃখনন, আগামী পাঁচ বছরে পদ্মা ব্যারাজের পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি, তিস্তা ব্যারাজ আধুনিকীকরণ, ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা। তবে আন্তর্জাতিক ফোরামে পরিকল্পনাগুলো তুলে ধরা যতটা সহজ, দেশীয় বাজেটে এদের পর্যায়ক্রমিক বাস্তবায়ন এবং তদারকি নিশ্চিত করা ততটা কঠিন। প্রতিটি বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও স্বচ্ছ সময়সীমা নির্ধারিত না থাকলে, এগুলো শেষ পর্যন্ত উচ্চাকাক্সক্ষী তালিকায় সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জলবায়ু বিতর্কের দ্বিতীয় প্রধান দুর্বলতা হলো সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিকে স্রেফ একটি ‘উপকূলীয় সমস্যা’ হিসেবে বিবেচনা করা। নীতিপ্রণেতাদের ধারণা, উপকূলের মানুষ গৃহহীন হলে তারা ঢাকা বা অন্যান্য শহরে চলে আসবে এবং শ্রমবাজারে যোগ দেবে। বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ জলবায়ু অভিবাসীর সংখ্যা ১ কোটি ৩৩ লাখে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে, এটি কেবল উপকূলের হিসাব নয়, এটি মূলত নগরগুলোর জন্য এক বিরাট সতর্কবার্তা।

জলবায়ু অভিবাসীরা যখন উপকূল ছেড়ে শহরের বস্তিগুলোতে আশ্রয় নেয়, তখন আগেই চাপে থাকা শহুরে অবকাঠামো, আবাসন ও স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মক সংকটে পড়ে। অথচ বর্তমানে উপকূলীয় নিরাপত্তা ও নগর উন্নয়ন এই দুটি খাত সম্পূর্ণ পৃথক দুটি মন্ত্রণালয় ও সংস্থা দ্বারা পরিচালিত হয়। তাদের বাজেট আলাদা, কাজের ধরন আলাদা। উপকূল থেকে শহরে অভিবাসনের যে নিরবচ্ছিন্ন স্রোত বয়ে চলেছে, তাকে একটি সমন্বিত নীতিমালার আওতায় না আনলে নগর সংকট অচিরে অর্থনৈতিক স্থবিরতায় রূপ নেবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিকে পুরো দেশের জন্য একটি একক ও সমরূপ হুমকি মনে করা ভুল। বাংলাদেশ ব-দ্বীপটি অত্যন্ত ভৌগোলিক ও হাইড্রোলজিক্যাল দিক থেকে গতিশীল। স্থানভেদে পলি জমার হার এবং ভূখণ্ডের দেবে যাওয়ার (সাবসিডেন্স) মধ্যে বড় ধরনের তারতম্য রয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত পোল্ডার বা বেড়িবাঁধ অনেক সময় প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহকে ব্যাহত করে জলাবদ্ধতা বাড়িয়েছে। ৫৪টি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের প্রায় দুই দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করে ২০২৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, উপকূলজুড়ে লবণাক্ত তা প্রবেশের ধরন সব জায়গায় এক নয়। জোয়ারের গতিপ্রকৃতি এবং সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস স্থানভেদে ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব ফেলে। 

এর অর্থ হলো, পুরো দেশের জন্য একটি মাত্র সাধারণ ‘প্লাবন মানচিত্র’ এঁকে উন্নয়ন প্রকল্প সাজালে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যাবে না। সাতক্ষীরা বা বাগেরহাটের জন্য যেখানে কঠোর প্রকৌশলগত সুরক্ষা বা ম্যানগ্রোভ বনায়ন দরকার, সেখানে হয়তো পটুয়াখালী বা ভোলার জন্য প্রয়োজন ভিন্ন ধাঁচের নিষ্কাশন ব্যবস্থা ও কৃষির ধরন পরিবর্তন। নির্দিষ্ট ভৌগোলিক বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে পৃথক অঞ্চলভিত্তিক কৌশল গ্রহণ না করলে, সীমিত অর্থ সম্পদের অপচয় ঠেকানো যাবে না। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্ক ও রাজনৈতিক ঘোষণাপত্র নিশ্চিতভাবেই বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থানকে উজ্জ্বল করেছে। তবে নীতিপ্রণেতাদের মনে রাখা দরকার, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের একটি ঘোষণাপত্র নিজে থেকে দেশের উপকূলে একটি বেড়িবাঁধও নির্মাণ করে দেবে না কিংবা বাস্তুচ্যুত একটি পরিবারকেও পুনর্বাসন করবে না। বৈশ্বিক কূটনীতির মাধ্যমে দৃষ্টি আকর্ষণ করার পর এখন মূল পরীক্ষা হলো, দেশের ভেতরের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো। আমাদের উপকূল সুরক্ষা, নদী ড্রেজিং, নগর আবাসন, কৃষি সম্প্রসারণ এবং দুর্যোগ মোকাবিলা বিভাগগুলো এখনো পৃথক পৃথক সাইলোতে কাজ করে। ‘বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০’-এর মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকলেও, এর প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ও অর্থায়ন কাঠামো এখনো পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। নদীমাতৃক দেশে জলবায়ু অভিযোজনে সাধারণ মানুষের যে ঐতিহ্যগত সক্ষমতা রয়েছে, তাকে আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। জাতিসংঘে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতিগুলোকে নিজস্ব বাজেটে অর্থায়িত, পর্যায়ক্রমিক ও দৃশ্যমান প্রকল্প হিসেবে বাস্তবায়ন করাই এই ব-দ্বীপকে সুরক্ষার একমাত্র পথ।

লেখক : গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী