উজ্জ্বল দুই নক্ষত্র

খুব কাছাকাছি সময়ে চলে গেলেন দুজন প্রিয় শিশুসাহিত্যিক। আমীরুল ইসলাম চিরতরে বিদায় নিলেন ১১ সেপ্টেম্বর। আখতার হুসেন ২৪ সেপ্টেম্বর। বাংলা শিশুসাহিত্যের উজ্জ্বল দুই নক্ষত্র। দুজনেই ছিলেন দুই স্বতন্ত্র ঘরের লেখক। শিশু-কিশোরদের মনকে তারা রাঙিয়ে তুলেছেন। তাদের সামনে তুলে ধরেছেন আনন্দ, বিস্ময়, কৌতূহল, প্রশ্ন আর স্বপ্নে ভরা পৃথিবী। সাজিয়ে দিয়েছেন কল্পনার রঙিন রাজ্য।

বয়সে আমীরুল ইসলাম আখতার হুসেনের ছোট। বাষট্টি বছর বয়সে বিদায় নিলেন। শোকবইতে আখতার হুসেন লিখেছিলেন, ‘আমীরুল ইসলামকে আমি চিনি ওর ছোটবেলা থেকে। ওর বড় চাচা কবি হাবীবুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় একজন শিশুসাহিত্যিক ও খেলাঘর সংগঠনের জন্মদাতা। ফলে আমীরুলের বুদ্ধি ও দীপ্তি বিকশিত হয়েছে এক সাহিত্যিক পরিবেশে। আমীরুল আমাদের শিশুসাহিত্যের একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে ওঠেন। তার কাছ থেকে আমাদের আরও অনেক কিছু পাওয়ার ছিল। ও এভাবে অকাল মৃত্যুর শিকার হবে, আমি মেনে নিতে পারছি না। আমি তার আত্মার শান্তি কামনা করি। আমীরুল বিদায়। আমরাও আসছি।

আখতার হুসেনের শেষ লাইনটি সত্য হয়ে এলো এতটাই দ্রুত যে আমরাও কেঁদে উঠলাম। আমাদের হৃদয়ে শোকের আবহ তৈরি হলো। হারালাম আখতার হুসেনকেও। মৃত্যুকালে তার বয়স একাশি। এই দুজন শিশুসাহিত্যিক তাদের নানান লেখার মধ্য দিয়ে ছোটদের মনোজগৎ স্পর্শ করেছেন। নতুন যুগের নতুন আলোয় তারা শিশুসাহিত্যের ভাষা রীতি, উপস্থাপনার কৌশল, আর বিষয়বৈচিত্র্য তুলে ধরেছেন শিশুসাহিত্যের পাতায় পাতায়। যা শুধু ছোটদের নয় বড়দেরও আকর্ষণ করেছে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যে উজ্জ্বল হয়ে প্রকাশ পেয়েছে ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, একাত্তরের কথা, স্বাধীন পতাকার কথা, দেশপ্রেমের কথা। সেই সঙ্গে আছে ছোটদের মনরাঙানো হাস্যরস, গোয়েন্দা, বিজ্ঞান, কল্পবিজ্ঞান, প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য, অভিযান কাহিনি, রোমাঞ্চকর কাহিনি, ইতিহাস, জীবনী নানান বিষয়। যেখানে স্বর্ণোজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছেন আখতার হুসেন এবং আমীরুল ইসলাম। আখতার হুসেনের জন্ম ১৯৪৫ সালের ১ নভেম্বর। আমীরুল ইসলামের ১৯৬৪ সালের ৭ এপ্রিল।

আখতার হুসেনের ছড়ার প্রধান শক্তি হলো সহজ ভাষায় শিশুদের পরিচিত জগৎকে আনন্দ, কল্পনা ও জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া। যেমন কল্পনার পাখায় ঘুরে বেড়াতে একবার তিনি দেখা পেয়েছিলেন নিখিলপুরের চার-চারটে বুড়োকে। আর তাই নিয়ে লেখা তার ছড়াটি হয়ে উঠল ছোট-বড় সব বয়সীদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়।

হ্যাঁ রে খবরটা কি উড়ো?

শুনতে পেলাম নিখিলপুরে চার-চারটে বুড়ো

কাঁদেন কেবল লাগিয়ে চোখে শুকনো মরিচ গুঁড়ো।

আরে, কি বললি দূরো

খাবার সময় খায় কি জানিস? বিশটা রুইয়ের মুড়ো

বয়স ওদের জানিস কত? আটশ নাকি পুরো।

হ্যাঁ রে খবরটা কি উড়ো?

উপদেশের মতো করে নয়; বরং আনন্দের ভেতর দিয়ে সামাজিক ভাবনার নানান কথা গল্প-ছড়ায় তুলে ধরেছেন। সেসব লেখায় উঠে এসেছে কত সব দৃশ্য। কত আনন্দময় ঘটনা। যেমন জাফলং যেতে যেতে আখতার হুসেন তার ছড়ায় লিখলেন

পথ খানা আগে আমি ভাল করে মাপলং

দেখলাম বেশ দূরে ভয়ে তাই কাঁপলং

 শেষে ভয় করে জয় বাসে আমি চাপলং

আসলাম সোজা চলে ঢাকা থেকে জাফলং।

সমকালীন বিষয়-আশয় নিয়ে আখতার হুসেন শিশু-কিশোরদের মনোজগতে ছন্দময় ঝংকার তুলেছেন। তিনি যা বলতে চেয়েছেন তা যেমন মজার তেমনই ভাববার বিষয়

মোটেও যা নেই বইয়ে কিংবা ভূগোলে

তা-ই আছে জেনো গুগলে গুগলে গুগলে।

কোথায় কী কাজ করছে সরল গাধারা

ভিরমি কেনই খাচ্ছে তাদের দাদারা

সবই পাওয়া যায় ঠিকমতো সার্চ করলে।

বললে কি তুমি মিছে কথা! বাজি ধরলে?           

লেখালেখির ইচ্ছেটা জেগেছিল ক্লাস ফোরে পড়ার সময় থেকে। বাবার দেওয়া ‘আঙ্কেল টমস কেবিন’ বইটি উপহার পেয়ে প্রবল উৎসাহ নিয়ে তিনি ডুবে যান লেখালেখির ভুবনে। ষোলো বছর বয়সে তার প্রথম লেখা ছাপা হয়। ১৯৬১ সালের কথা। প্রথম দিকে ছিলেন বড়দের উপযোগী গল্প। আখতার হুসেনের প্রথম ছড়া ছাপা হয় আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী সম্পাদিত অর্ধসাপ্তাহিক সোনার বাংলা পত্রিকায়। বাবার চাকরির সূত্রে তখন থাকতেন কুলাউড়ায়। ১৯৬৫ সালের কথা। সোনার বাংলার ছোটদের পাতা সম্পাদনা করতেন শিশুসাহিত্যিক রফিকুল হক, পরবর্তীকালে যিনি ‘দাদুভাই’ নামে খ্যাত হন ছোটদের পত্রিকা কিশোর বাংলা সম্পাদনা করতে গিয়ে।

১৯৭০ সালে প্রকাশিত হয় আখতার হুসেনের প্রথম বই। ছোটদের উপযোগী গল্প বইটির নাম ‘সমুদ্র অনেক বড়।’ প্রকাশিত দ্বিতীয় বইটি ছিল ছড়ার। নাম ‘হালচাল’। যেমন বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চার প্রতি ছিলেন মনোযোগী তেমনি বিদেশি ভাষার সাহিত্যের ছিল তার ব্যাপক আগ্রহ। শুদ্ধমত সাহিত্য চর্চার মধ্য দিয়ে আখতার হুসেন হয়ে উঠলেন আমাদের প্রিয়জন।

অন্যদিকে আখতার হুসেনের মতোই লেখায় জাদুকরি স্পর্শ নিয়ে শিশুসাহিত্যের জগৎ মাতিয়ে রাখেন আমীরুল ইসলাম। চার দশকের বেশি সময় ধরে সৃজনশীলতার নানা মাত্রায় নিজেকে প্রকাশ করেছেন। যা ছোটদের কাছে শুধুই ছড়া তা বড়দের কাছে ভাববার বিষয়। চিরচেনা ছন্দের বাক্সে না আটকে রেখে ছড়াকে তিনি নিরীক্ষার সুতোয় বেঁধে টাপুর-টুপুর করে নাচিয়েছেন। গল্পে এনেছেন জাদু বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। শিশু-কিশোরদের ভুবনকে জ্ঞান সমৃদ্ধ করে সাজানোর জন্য তিনি গল্প, ছড়া, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, জীবনী, ইতিহাস, চিত্রকলা নানান বিষয় নিয়ে লিখেছেন। নবীন লেখকদের কাছে টানতে তার ছিল উদার মানসিকতা।

আমীরুল ইসলাম নিজের জন্য চার দেয়ালের সংসার বানাননি। বরং মানুষ আর মানুষের গল্প দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন এক অদৃশ্য সংসার। যে সংসারে ছিল লেখক, কবি, প্রকাশক, চিকিৎসক, খেলোয়াড়, বুদ্ধিজীবী, চিত্রশিল্পী, অভিনয়শিল্পী, সংগীতশিল্পীসহ শিশু-কিশোরের দল। নানান পেশার নানান মানুষ তার বন্ধু। বাষট্টি বছরের জীবনযাত্রায় তিনি ছিলেন সবার প্রিয়। রান্নায় ছিল তার জাদুকরী হাত। নিষ্ঠার সঙ্গে দাবা খেলেছেন অবসরে।

তার লেখায় শিশুরা খুঁজে পায় আনন্দের রঙিন পৃথিবী। বড়রাও খুঁজে পান হারিয়ে যাওয়া শৈশব স্মৃতি।

তিনি লিখলেন

দূরের মাঠ। নদীর ঘাট।

পাখির ডাক

আকাশ নীল

ছড়ার মিল

নৌকা যায় কোথায় যায়?

এই তো আমার ধানের দেশ

গানের দেশ। প্রাণের দেশ।

বাংলাদেশ।

হিজল গাছ। শাপলা বিল।

জিওল মাছ। মেঘ-দুপুর।

পায়ে নূপুর। সূর্যবীর। ঢালছে রোদ।

স্বপ্ন বীজ উড়ছে ঐ

এই তো আমার বাংলাদেশ।

তিনি লেখালেখিতে নতুন আঙ্গিক, নতুন ধারা তৈরি করতে চাইতেন। নবীন লেখকদের উৎসাহ জোগাতেন। ছড়া-কবিতায় তিনি আঁকতেন মজার মজার ছবি। তুলে ধরতেন অদ্ভুত ঘটনার কথা। যেমন

কায়েতটুলীর পাতলা খান

একটা গোটা কাতলা খান

তিনটা মোরগ একটা ইলিশ

প্রশ্ন করি কেমন গিলিস?

পাতলা খানের চলছে ডায়েট

অবস্থাটা ভীষণ টায়েট।

নিজেকে নিয়ে উড়ে যান ছড়াপুরে। কিন্তু কোথায় সেই ছড়াপুর? আমরা জানি না। জানেন আমীরুল ইসলাম। তিনি লিখলেন

আমীরুল কই গেছে?

ছড়াপুরে ছড়াপুরে

উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে

বহুদূরে বহুদূরে

ভালোমানের শিশুসাহিত্য অন্তর্দৃষ্টি খুলে দেয়। সৃজনশীল চর্চার প্রতি আগ্রহ তৈরি করে। ভাবতে শেখায়। শেখায় মিষ্টি মধুর কল্পনার জগৎ তৈরি করতে। এই জায়গায় আখতার হুসেন এবং আমীরুল ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ। কে বড় কে ছোট এটি বিষয় নয়। মূল বিষয় শিশুসাহিত্যের বাগানে তারা দুজনেই ফুল ফুটিয়েছেন। যার সৌরভে-গৌরবে শিশুসাহিত্য হয়ে উঠেছে সমৃদ্ধ।

আজ তারা নেই। কিন্তু তাদের বই আছে। গল্প আছে। ছড়া-কবিতা, নাটক আছে। আছে প্রবন্ধ, নিবন্ধ। আছে জীবনী-ইতিহাস। গান-গীতিকবিতা। তাদের এসব সৃষ্টিকে আমরা যদি নিয়মিত পাঠ করে যাই তাহলে আমরা অনুভব করতে শিখব-পৃথিবী সুন্দর। সুন্দর তার মানুষ। সুন্দর তার পরিবেশ-প্রকৃতি।

লেখার মধ্য দিয়ে তারা এই বার্তা আমাদের দিয়েছেন। তারা আমাদের শিশুসাহিত্যের চলমান পথের দুটি আলোকচিহ্ন।

আখতার হুসেন ও আমীরুল ইসলাম দুটি নাম আজ স্মৃতির পাতায়। কিন্তু তাদের সৃজনশীল রচনাগুলো আজকের মতো আগামী দিনগুলোতেও শৈশবের উঠোনে রৌদ্র হয়ে আলো ছড়াবে। নতুন প্রজন্মের পাঠকরা সেই আলোয় গল্প পড়বে, ছড়া-কবিতা পড়বে, স্বপ্ন দেখবে, কল্পনায় ডানা মেলবে পাখির মতো।

সময়ের স্রোতে রচিত তাদের সৃষ্টির আলো কখনো মুছে যাবে না। আখতার হুসেন ও আমীরুল ইসলাম আমাদের হৃদয়ে চিরকাল জেগে থাকবেন।