বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলা গ্রেপ্তার মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান

জামায়াত নেতা ও বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্টের ডিওএইচএসের নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বিমানবন্দর থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আজ শনিবার তাকে আদালতে প্রেরণ করা হবে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলির সংকট কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, সরকারি কাজে বাধা প্রদান এবং দায়িত্বরত এক নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে বিমানবন্দর থানায় মামলা হয়েছে। সেই মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রথমে তাকে ডিবি কার্যালয়ে আনা হয়। পরে তাকে বিমানবন্দর থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার সকালে তুচ্ছ ঘটনায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে (ইডি) হুমকি, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ও নিরাপত্তা সুপারভাইজারকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. শাহরিয়ার আলম সজিব বাদী হয়ে আখতারুজ্জামানকে আসামি করে গত বৃহস্পতিবার দিনগত রাত ৩টা ২০ মিনিটে বিমানবন্দর থানায় মামলা দায়ের করেন। গতকাল বিকেলে মামলার এজাহার আদালতে এলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আলবিরুনী মীর তা গ্রহণ করেন। বিমানবন্দর থানার এসআই মাজেদুল ইসলামকে আগামী ১০ নভেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। এরপরই আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে ১১টার দিকে সৌদি আরবের মদিনা থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি উড়োজাহাজ (বিজি-৩৩৮) থেকে যাত্রীরা নামার পর ৮ নম্বর লাগেজ বেল্ট এলাকায় ট্রলির সংকট দেখা দেয়। এতে লাগেজ পেতে বিলম্ব হওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এ সময় ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেনের আহ্বানে পরিস্থিতি দেখতে ঘটনাস্থলে যান বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এসএম রাগীব সামাদ। পুলিশ জানায়, রাগীব সামাদ পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করার সময় মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান তার দিকে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে এগিয়ে যান। ‘আমি কিন্তু পিটাবো ধইরা’, ‘ঘাড় ধরে বের করে দিবো’ বলে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে প্রকাশ্যে হুমকি দেন তিনি। এমনকি তিনি বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী সম্পর্কেও অশালীন মন্তব্য করেন। এতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, আখতারুজ্জামানের সঙ্গে থাকা প্রটোকল সহকারীরা বিমানবন্দরের সংরক্ষিত কেপিআই এলাকায় মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ শুরু করেন। সেখানে দায়িত্বরত নিরাপত্তা সুপারভাইজার ওয়ারেন্ট অফিসার মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন তাদের ভিডিও ধারণে নিষেধ করেন। এতে আখতারুজ্জামান ক্ষিপ্ত হয়ে ওই কর্মকর্তাকে গালাগাল করেন এবং একপর্যায়ে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। মামলায় সাধারণ যাত্রীদের সংগ্রহ করা পবিত্র জমজমের পানির বোতলের ক্ষতিসাধন এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এক প্রতিনিধির সঙ্গে মারমুখী আচরণের অভিযোগও আনা হয়েছে। সেদিনের ঘটনার পুরো ভিডিও সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য ও অন্যান্য আলামত সংগ্রহ করা হবে। এগুলোর ভিত্তিতে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার রেজাউল করিম রেজা বলেন, অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোহাম্মদ আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তারের ব্যাপারে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে আমরা সহায়তা চেয়েছিলাম। তারা গ্রেপ্তার করে আমাদের কাছে দিয়েছে।

এদিকে বিকেলে ডিবি পুলিশ গ্রেপ্তার অভিযানে গেলে এবং গ্রেপ্তার হওয়ার আগে সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে ফেসবুকে এক ভিডিওবার্তায় আখতারুজ্জামান বলেন, আমাকে এই মুহূর্তে ডিবি পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছে। আমি শুধু জানিয়ে গেলাম আপনাদের। দোয়া করবেন, আমি যেন জনগণের জন্য, দেশের মানুষের জন্য বিশেষ করে প্রবাসীদের জন্য যদি শহীদ হতে পারি।

বিমানবন্দর থানার ওসি কামরুল হাসান তালুকদার বলেন, মামলায় আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা, আঘাত, অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ, ইচ্ছাকৃত অপমান ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ আনা হয়েছে। ডিবি পুলিশ আমাদের কাছে হস্তান্তর করেছে। আজ শনিবার তাকে আদালতে প্রেরণ করা হবে।

মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে। কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে টানা দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। একাদশ জাতীয় সংসদের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে এ আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পুলিশের সাবেক আইজি নূর মোহাম্মদের কাছে হেরে যান আখতারুজ্জামান।

আখতারুজ্জামান একসময় কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন। দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকান্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০২২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি আখতারুজ্জামানকে পঞ্চমবারের মতো বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর বিভিন্ন সময় সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে টকশো বা সামাজিক মাধ্যমে কথা বলে আলোচনায় ছিলেন তিনি। এমন অবস্থার মধ্যে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গত বছর ১৩ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়েছিলেন মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান।

জামায়াতের বিবৃতি : ঠুনকো অজুহাতে আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে জামায়াত। গতকাল জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদের সদস্য, ঢাকা উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন এক বিবৃতিতে বলেছেন সামান্য ও ঠুনকো অজুহাতে খ্যাতিমান বীর মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের এবং তড়িঘড়ি করে তাকে আটকের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও অশুভ লক্ষণ। বীর মুক্তিযোদ্ধা আক্তারুজ্জামানসহ বহু যাত্রী (শাহজালাল বিমানবন্দরে) যে ধরনের ভোগান্তির শিকার হয়েছেন, তার নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে যাত্রী হয়রানি ও অব্যবস্থাপনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তিনি বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালনে অবহেলার বিরুদ্ধে কথা বলায় তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে মামলা দেওয়া হয়েছে। বিবৃতিতে অবিলম্বে মামলা প্রত্যাহার এবং তাকে ছেড়ে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এ ছাড়া বিকেলে বিক্ষোভ মিছিল করে মহানগর উত্তর জামায়াত। উত্তরার জসীমউদ্দীন সড়ক থেকে কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও মহানগরীর সহকারী সেক্রেটারি ইয়াসিন আরাফাতের নেতৃত্বে মিছিল নিয়ে বিমানবন্দর সড়কে এসে সমাবেশ করেন নেতাকর্মীরা।