১২৫ বছরের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চিকিৎসাসেবা

এক অংশের প্লাস্টার ও সুরকি খসে পড়েছে আগেই। যেকোনো মুহূর্তে মাথার ওপর ভেঙে পড়তে পারে পুরো ছাদ। ধস ঠেকাতে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রের (আইসিইউ) বারান্দার নিচে কয়েকটি লোহার পাইপ আর খুঁটি দিয়ে ঠেক দেওয়া হয়েছে। এই বিপজ্জনক ছাদের নিচ দিয়েই প্রতিনিয়ত শঙ্কা আর আতঙ্কের মধ্যে চলাচল করেন চিকিৎসাধীন রোগী, তাদের স্বজন ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। শুধু আইসিইউর ছাদই নয়; গাইনি অপারেশন থিয়েটার (ওটি), প্রসূতিদের লেবার রুম, চক্ষু ওটি এবং ১০ ও ১১ নম্বর ওয়ার্ডের সিলিং থেকেও খসে পড়ছে প্লাস্টার। অন্যদিকে বহির্বিভাগের পেছনের পাহাড় থেকে বালি ধসে পড়ে পুরো ড্রেনেজ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে, সামান্য বৃষ্টিতেই ছাদ চুইয়ে ভেতরে পড়ছে পানি। এই অবস্থার মধ্যেই ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা চলছে।

১৯০১ সালে বন্দরনগরীতে ৮ একর জায়গার ওপর ৫টি ভবন নিয়ে যাত্রা শুরু করে এ হাসপাতাল। হাসপাতালটির ১২৫ বছরের পুরনো অবকাঠামো এখন চরম ভগ্নদশায় পৌঁছেছে। সংকীর্ণ জায়গা, জরাজীর্ণ ভবন, ড্রেনেজ বিপর্যয় আর পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতির অভাব সত্ত্বেও কেবল ভৌগোলিক সুবিধা ও স্বল্প খরচের কারণে এই হাসপাতালে প্রতিদিন সেবা নিতে আসেন অসংখ্য মানুষ।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ওপর অতিরিক্ত রোগীর যে ভয়াবহ চাপ, তা ভাগ করে নেওয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত কেন্দ্র ছিল এই জেনারেল হাসপাতাল। কিন্তু ভাঙাচোরা ভবনকে লোহার পাইপের ঠেক দিয়ে বা ওটির ছাদ খসে পড়া অবস্থায় সচল রাখার জন্য কেবল দায়সারা ব্যবস্থা নিলে চলবে না। চট্টগ্রাম অঞ্চলের কোটি মানুষের চিকিৎসাসেবা সচল রাখতে হলে দ্রুততম সময়ে জরাজীর্ণ ভবন সংস্কারের পাশাপাশি নতুন আধুনিক বহুতল ভবন নির্মাণ ও জনবল পদায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি পর্যাপ্ত জায়গা থাকায় হাসপাতালটিকে একটি সরকারি মেডিকেল কলেজে রূপান্তরিত করার পরামর্শ তাদের।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, রোগীরা এই হাসপাতালে সেবা পায় বলে আসে। আরও ভালো মানের সেবা দিতে এটিকে ৫০ শয্যার একটি পরিপূর্ণ মেডিকেল কলেজ বানানো প্রয়োজন। মেডিকেল কলেজের জন্য যেসব শর্ত দরকার, সবই এখানে আছে। আর নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করা অত্যন্ত জরুরি।

পাঁচ বছরে রোগী বেড়েছে আড়াই গুণ : হাসপাতালের গত ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত ৫ বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জরাজীর্ণ ভবনের করুণ চিত্র সত্ত্বেও প্রতিদিন হাজারো মানুষ এখানে চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। ২০২১-২২ অর্থবছরে বহির্বিভাগে সেবা নিতে এসেছিলেন ১ লাখ ৬১ হাজার ৩৬৪ জন রোগী। পাঁচ বছরের ব্যবধানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা প্রায় আড়াই গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৭১৮ জনে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজারের বেশি মানুষ কেবল বহির্বিভাগের টিকিটের জন্য জরাজীর্ণ লাইনে দাঁড়িয়ে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। একই সময়ে জরুরি বিভাগে সেবার চাহিদা দ্বিগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ৯৮৮ জনে, যা পাঁচ বছর আগে ছিল মাত্র ২৫ হাজার ৮৯৭ জন।

অন্তর্বিভাগেও শয্যা সংকট : কাগজ-কলমে হাসপাতালটি ২৫০ শয্যার হলেও বাস্তবে শয্যা আরও কম। তবুও স্থান ও শয্যা সংকটের মধ্যেই গত অর্থবছরে ওয়ার্ডে ভর্তি হয়ে সেবা নিয়েছেন ১০ হাজার ৪৫ জন রোগী, যা পাঁচ বছর আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। ভবনের সিলিং ও দেয়াল ধসে পড়ার নিত্য আতঙ্ক সত্ত্বেও অস্ত্রোপচার ও বিভিন্ন রোগ নির্ণয় বিভাগে সেবাগ্রহীতার সংখ্যা বহুগুণ বেড়েছে। গত পাঁচ বছরে সাধারণ সার্জারি ১ হাজার ৬৬৭টি থেকে দেড়গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ১৫১টিতে। হাড়ভাঙা রোগীর অর্থোসার্জারি ৩২২টি থেকে বেড়ে হয়েছে ৮৯৬টি এবং নাক, কান ও গলা (ইএনটি) বিভাগের অপারেশন ৫৩৮টি থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৯৪২টিতে। গাইনি ও প্রসূতি বিভাগে অপারেশন পাঁচ বছরে বেড়েছে ৯০০টি। প্যাথলজি পরীক্ষা ৯ হাজার ৬২৩ থেকে বেড়ে ২৬ হাজার ৭০০ হয়েছে। ফিজিওথেরাপি বিভাগ থেকে এক বছরে রেকর্ড ৪ লাখ ১০ হাজারের বেশি সেবা দেওয়া হয়েছে।

হাসপাতালটিতে চিকিৎসকের ৭৮টি পদের বিপরীতে ৬৬ জন এবং ১৫৭টি পদের মধ্যে ১৫১ জন কর্মরত আছেন। তবে সহায়ক কর্মীদের সংকট রয়েছে। ৭২টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কাজ করছেন ৫৪ জন। ফলে রোগীদের এক ওয়ার্ড থেকে অন্য ওয়ার্ডে নিতে বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজে চরম ব্যাঘাত ঘটে। বিকেল ও সন্ধ্যার পর শিশু বা সাধারণ বিভাগে জটিলতা দেখা দিলে রোগীদের চমেকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

হাসপাতালটি পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় প্রায়ই চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। তাই নিরাপত্তা ও পরিবেশগত কারণে অনেক ভর্তি রোগীই রাতে এখানে থাকতে সাহস পান না।

মেরামত ও সংস্কারে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা প্রস্তাব : জরাজীর্ণ এই হাসপাতালের ২৯টি খাতে মেরামত ও সংস্কারের জন্য চলতি বছরের এপ্রিলে গণপূর্ত বিভাগে চিঠি দেন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক। পরবর্তী সময়ে এসব মেরামত ও সংস্কার কাজের জন্য ৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা প্রস্তাব করে গণপূর্ত বিভাগ। তবে হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলছেন, জরাজীর্ণ এই হাসপাতালের মেরামত কাজে এত টাকা খরচ করে তেমন কাজ হবে না।

আলোর মুখ দেখেনি পাঁচ বছর আগে ভবন নির্মাণের উদ্যোগ : স্বাধীনতা-উত্তরকালে হাসপাতালটিতে প্রথমে ৮০ ও পরে ৭০ শয্যা যুক্ত করে ১৫০ শয্যায় রূপান্তর করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধীনে পরিচালনা করা হতো। ১৯৮৫ সালে এনাম কমিশনের অনুমোদনের পর ১৯৮৭ সালে এটিকে আলাদা করে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের অধীনে যুক্ত করা হয়। ২০২০ সালে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বৈঠকের পর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (পিডব্লিউডি) ১৬ তলা ভিত্তির ওপর ১০ তলা বিশিষ্ট দুটি আধুনিক ভবন নির্মাণের প্রস্তাব তৈরি করে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ‘অপারেশনাল কপি’ প্রকল্পের আওতায় অনুমোদন প্রক্রিয়ায় থাকলেও ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর সেই প্রকল্পটির আর কোনো অগ্রগতি হয়নি।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য : চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ একরাম হোসেন বলেন, ‘হাসপাতালটি ৫টি ভবন নিয়ে যাত্রা শুরু করার পর আর ভবন নির্মাণ করা হয়নি। ভবনগুলো শতবর্ষী হওয়ায় এটি বর্তমানের বিপুল রোগী সামলানোর উপযোগী বা রোগীবান্ধব নয়। বিশেষ করে আমাদের জরুরি বিভাগটি অত্যন্ত ছোট ও অপ্রশস্ত, সম্প্রসারণের কোনো সুযোগ নেই। শিশু ওয়ার্ডের স্ট্রাকচারে কোনো পরিবহন র‌্যাম্প না থাকায় রোগীদের সিঁড়ি বেয়ে বহন করতে হয়। এছাড়া জরাজীর্ণ বাথরুম, দরজা-জানালা প্রতিনিয়ত মেরামতের প্রয়োজন হয়। তবে নতুন ভবন করার জায়গা রয়েছে। হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির উদ্যোগে ৫০০ শয্যার নতুন ভবন নির্মাণের চেষ্টা চলছে।

সার্বিক বিষয়ে চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি নিজেও এই হাসপাতালের দায়িত্বে ছিলাম। স্বাস্থ্য বিভাগে আসার পর জনবল পদায়নের চেষ্টা করেছি। নতুন করে ১০ তলা একটা ভবনের জন্য প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে বলে জেনেছি। এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।