বাজে লুব্রিকেন্টে অনেক ঝুঁকি

গাড়ি থেকে মোটরবাইক শুরু করে কারখানা ও বাসাবাড়িতে আজকাল বিভিন্ন ধরনের মেশিন বা ইঞ্জিন ও যন্ত্রপাতির ব্যবহৃত হয়। এসব ইঞ্জিন ও যন্ত্রের কর্মক্ষমতা, জ্বালানি দক্ষতা ও দীর্ঘায়ু নিশ্চিত করতে দরকার ভালো মানের ইঞ্জিন অয়েল বা লুব্রিকেন্ট, যা ইঞ্জিনভেদে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিরতিতে বদলাতে হয়। কারিগরি জ্ঞান এবং বাজারে কেমন লুব্রিকেন্ট মেলে, সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা না থাকায় অনেকে লুব্রিকেন্ট বদলাতে নির্ভর করেন মেকানিকদের ওপর। মেকানিক ভেজাল বা নিম্নমানের লুব্রিকেন্ট দিলে, তা যানবাহন ও মেশিনের ব্যবহারকারীদের জন্য বেশ ঝুঁকি তৈরি করে, ব্যয় বাড়ায় ও ক্ষতির কারণ হয়। 

এই ঝুঁকি কেবল একটি-দুটি নয়। অনেকগুলো।

ইঞ্জিন ও যন্ত্রপাতির আয়ুষ্কাল হ্রাস : ভেজাল অয়েলে সঠিক ঘনত্ব (ভিসকোসিটি) বা এপিআই মান থাকে না। ফলে পিস্টন, সিলিন্ডার ও বিয়ারিংয়ের মধ্যে ঘর্ষণ (ফ্রিকশন) বেড়ে যায়। এটি ইঞ্জিনের অভ্যন্তরীণ ধাতব অংশগুলোকে দ্রুত ক্ষয় করে, যা একটি ইঞ্জিনের স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল নির্দিষ্ট একটি সময়ের ব্যবধানে ৪০% থেকে ৫০% পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে।

ওভারহিটিং : যন্ত্রে মানসম্পন্ন লুব্রিকেন্ট তাপ শোষক হিসেবে কাজ করে। কিন্তু ভেজাল লুব্রিকেন্টে নিম্নমানের বেস অয়েল থাকায় তা উচ্চ তাপে দ্রুত নষ্ট হয় এবং লুব্রিকেশনের গুণাগুণ হারিয়ে যায়। এতে ইঞ্জিন অতিরিক্ত গরম হয়, যা শেষ পর্যন্ত ইঞ্জিন হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার (সিজ) অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।   

জ্বালানি দক্ষতা হ্রাস : ইঞ্জিনের ভেতরে ঘর্ষণ বেড়ে যাওয়ায় একই গতি বজায় রাখতে অনেক বেশি জ্বালানি পোড়াতে হয়। এর ফলে জ্বালানি খরচ ১০% থেকে ১৫% পর্যন্ত বেড়ে যায়, যা মালিকের খরচ বাড়ায়, জ্বালানি নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে।

রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বৃদ্ধি : ভেজাল অয়েলের কারণে ইঞ্জিনে আঠালো গাদ (স্ল্যাজ) জমে। এর ফলে অয়েল ফিল্টার অকালে নষ্ট হয়, স্পার্ক প্লাগ নোংরা হয়, ঘনঘন ইঞ্জিন ওভারহোলিং করা দরকার হয়, প্রায়ই ইঞ্জিনের পার্টস বদলাতে হয়।

টার্বোচার্জার ও সেন্সর নষ্ট হওয়া : আধুনিক গাড়ির টার্বোচার্জার ও সেন্সরগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল। ভেজাল অয়েলের কার্বন-কণা এগুলোকে দ্রুত বিকল করে দেয়, যা মেরামতে অনেক টাকা খরচ করতে হয়।

কারিগরি ত্রুটি ও মেকানিক্যাল ফেইলিউর : ভেজাল লুব্রিকেন্টে প্রয়োজনীয় এডিটিভ (যেমন: অ্যান্টি-উইয়ার, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, ডিটারজেন্ট) ইত্যাদি থাকে না। ফলে তা যন্ত্রের বা পাওয়ার প্ল্যান্টের জেনারেটরের স্বাভাবিক কার্যকারিতা হ্রাস করে। প্রায়ই ইঞ্জিন বন্ধ রেখে অনির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। ফলে স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হয়।

অর্থনৈতিক ঝুঁকি : শিল্প-কারখানার মেশিন ভেজাল অয়েলের কারণে অনির্ধারিত সময়ের জন্য হঠাৎ বন্ধ হওয়া মানেই উৎপাদনে কোটি কোটি টাকার ক্ষতি; যা কারখানার সরবরাহ চেইনকে ব্যাহত করে। 

এনার্জি লস : ঘর্ষণজনিত উচ্চতাপমাত্রার কারণে মেশিনের কর্মক্ষমতা কমে গেলে বিদ্যুৎ খরচ বহুগুণ বেড়ে যায়। এটি উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়। ফলে পণ্য দেশে-বিদেশে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পিছিয়ে পড়ে।

স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি : মানহীন অয়েল পোড়ানোর ফলে নির্গত ধোঁয়া কারখানার মালিক-শ্রমিকদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি (যেমন :  শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের রোগ) তৈরি করে এবং পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

পরিবেশ দূষণ : ভেজাল লুব্রিকেন্ট পুড়ে পরিবেশে নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফার এবং ক্ষতিকর পার্টিকুলেট ম্যাটার (পিএম ২ দশমিক ৫) নির্গত হয়। এটি বায়ুদূষণ বাড়ায়; অ্যাসিড-বৃষ্টির ঝুঁকি  তৈরি করে।

বিপুল রাজস্ব ক্ষতি : ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্য উৎপাদক ও আমদানিকারকরা সাধারণত সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ট্যাক্স-ভ্যাট দেয় না। এতে রাষ্ট্র প্রতি বছর লুব্রিকেন্ট খাত থেকে প্রাপ্য শত শত কোটি টাকার রাজস্ব হারায়।

বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় : ভেজাল অয়েলের কারণে ইঞ্জিন দ্রুত নষ্ট হওয়ায় নতুন ইঞ্জিন ও খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিপুল পরিমাণ  বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়।

জাতীয় উৎপাদনশীলতা হ্রাস : কৃষি যন্ত্রপাতি (ট্রাক্টর, সেচ পাম্প) থেকে শুরু করে পণ্যবাহী ট্রাকসহ বিভিন্ন ধরনের যন্ত্র ও যানবাহন সবই যদি ঘনঘন বিকল হতে থাকে, তবে দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা মারাত্মক কমিয়ে দেয়। এতে জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়।