তাড়াশে ঘোড়া দিয়ে হালচাষ

জ্বালানির ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধির কারণে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে হালচাষের বিকল্প মাধ্যম হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ঘোড়া। উপজেলার তালম ইউনিয়নের গোস্তা, জন্তিপুর, পাড়িল, লাউতা, হারিসেনা, রোকনপুর ও গুল্টাসহ বেশ কিছু গ্রামে জমিতে ঘোড়া দিয়ে হালচাষ ও মই দেওয়ার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। এতে একদিকে সাধারণ কৃষকদের বাড়তি জ্বালানি খরচ সাশ্রয় হচ্ছে, অন্যদিকে এটি একদল কৃষকের আয়ের নতুন উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাড়তি উপার্জনের আশায় অনেকেই এখন অর্থের বিনিময়ে অন্যের জমিতে ঘোড়া দিয়ে হালচাষ করাকে স্থায়ী পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

গত রবিবার তাড়াশের তালম ইউনিয়নের গোন্তা গ্রামের কৃষিজমিতে দেখা যায়, ঘোড়া দিয়ে মই দিচ্ছেন কৃষক শফিকুল ইসলাম। কাদামাটির জমিতে ঘোড়াটিকে নিয়ন্ত্রণ করে জমির উঁচু-নিচু অংশ সমান করছিলেন তিনি। এ বিষয়ে শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রায় পাঁচ বছর আগে তিনি ২৪ হাজার টাকা দিয়ে ঘোড়াটি কিনেছেন। এরপর থেকে বিভিন্ন কৃষকের জমিতে হালচাষ ও মই দেওয়ার কাজে ঘোড়াটি ব্যবহার করছেন। বর্তমানে এটিই তার আয়ের অন্যতম মাধ্যম। তিনি আরও জানান, প্রতি বিঘা জমিতে মই দেওয়ার জন্য ২৫০ টাকা করে নেন। দিনে প্রায় পাঁচ বিঘা জমিতে মই দিতে পারেন। এতে দৈনিক তার আয় হয় প্রায় ১ হাজার ২৫০ টাকা। আমন ও বোরো মৌসুমে ঘোড়া দিয়ে জমি হালচাষ করে তিনি প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা আয় করেন। বীজতলা তৈরির কাজেও ঘোড়াটি ব্যবহার করা হয়।

স্থানীয় একাধিক কৃষকের মতে, তাড়াশে গরুর জোয়াল-মই ও মহিষ প্রায় বিলুপ্ত। অন্যদিকে, আধুনিক ট্রাক্টর বা পাওয়ার টিলার সময়মতো পাওয়া যায় না এবং জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে চাষের খরচ অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। ফলে কম খরচে জমি চাষ ও মই দেওয়ার জন্য কৃষকরা এখন ঘোড়ার দিকে ঝুঁকছেন। তাদের দাবি, ঘোড়া দিয়ে হালচাষ ও মই দিলে জমি ভালোভাবে সমান হয় এবং সেচের পানি সব জায়গায় সমানভাবে ছড়ায়।

তাড়াশের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী নাটোরের সিংড়া ও গুরুদাসপুর উপজেলাতেও কয়েকজন ঘোড়া দিয়ে জমিতে মই ও হালচাষ দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। সিংড়া উপজেলার মোখলেছুর রহমান বলেন, শুরুতে ঘোড়ার গাড়িতে মালামাল পরিবহন করতেন তিনি। পরে আরও একটি ঘোড়া কিনে প্রশিক্ষণ দিয়ে জমি চাষের কাজ শুরু করেছেন। এখন প্রতিদিন তিনি তিন থেকে সাড়ে তিন বিঘা জমি চাষ করতে পারেন। এতে তার আয় হয় প্রায় ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা। তবে দুটি ঘোড়ার খাবার বাবদ প্রতিদিন প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা খরচ হয়।

মোখলেছুর রহমানের দাবি, ঘোড়ার হালচাষে জমি তুলনামূলক ভালোভাবে চাষ হয়। ইরি-বোরো মৌসুমে এ কাজের চাহিদা আরও বেড়ে যায়। তখন আয়ও বেশি হয়।তিনি বলেন, অনেক কৃষক এখন পাওয়ার টিলারের পরিবর্তে ঘোড়ার হাল দিয়ে জমি চাষ করাচ্ছেন।

ট্রাক্টর চালক সেরাজুল ইসলাম বলেন, তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় জমি চাষের খরচও আগের তুলনায় বেড়েছে। এতে বিঘাপ্রতি চাষাবাদে

কৃষকদের বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে। ফলে খরচ কমাতে অনেক কৃষক ট্রাক্টরের পরিবর্তে ঘোড়া দিয়ে জমি চাষ করাচ্ছেন। ঘোড়া দিয়ে চাষে জ্বালানি খরচ লাগে না। আবার ব্যয় তুলনামূলক কম হয়।

তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শর্মিষ্ঠা সেনগুপ্তা বলেন, আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহারের কারণে বর্তমানে ঘোড়া দিয়ে জমি চাষের ঘটনা সচরাচর দেখা যায় না। তবে প্রয়োজন ও বাড়তি আয়ের জন্য তাড়াশ উপজেলার কিছু কৃষক ঘোড়া দিয়ে জমি চাষ ও মই দেওয়ার কাজ করছেন। কৃষি বিভাগ কৃষকদের আধুনিক ও উন্নত কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকে।

ট্রাক্টর-পাওয়ার টিলারের যুগে তাড়াশের মাঠে ঘোড়ার হালচাষ যেন পুরনো দিনের কৃষিচিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। সেই পুরনো পদ্ধতি এখন কয়েকজনের জীবিকার পাশাপাশি এ এলাকায় কম খরচে চাষাবাদের বিকল্প হয়ে উঠেছে।