ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) আয়োজিত ‘লোক প্রশাসন আন্তর্জাতিক সম্মেলন-২০২৬’-এর উদ্বোধন করা হয়েছে। শনিবার (৩ অক্টোবর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন মিলনায়তনে বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের উদ্যোগে ‘রিথিংকিং পাবলিক এডমিনিষ্ট্রিশন ইন এন ইরা অব গ্লোবাল ক্রাইসিস: গভারনেন্স অ্যান্ড পলিসি রেসপন্সস’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে দুই দিনব্যাপী (৩ ও ৪ অক্টোবর) এ আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজিত হচ্ছে।
সম্মেলনের আহ্বায়ক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের চেয়ারপার্সন প্রফেসর ড. সৈয়দা লাসনা কবিরের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. এ. বি. এম. ওবায়দুল ইসলাম। গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাবির উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) প্রফেসর ড. আবদুস সালাম, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ, ঢাবির সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন প্রফেসর কাজী মোহাম্মদ মাহবুবর রহমান। অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন লোক প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর ড. আকা ফিরোজ আহমেদ।
সম্মেলনে কি-নোট স্পিকার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কানাডার ম্যাকমাস্টার ইউনিভার্সিটির এমিরিটাস প্রফেসর ড. আহমেদ শফিকুল হক এবং চীনের সিচুয়ান ইউনিভার্সিটির এসোসিয়েট প্রফেসর ড. জেং শিয়াংইউ।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই লোক প্রশাসন বিভাগের ইতিহাস ও অর্জন সম্পর্কিত একটি সংক্ষিপ্ত ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য প্রফেসর ড. এ. বি. এম. ওবায়দুল ইসলাম বলেন, শিক্ষা ও গবেষণার উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা একটি সুদৃঢ় একাডেমিক ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে চাই। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বতন্ত্র ও অনন্য করে তুলতে হলে আমাদের শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের সর্বোচ্চ মানের পারফরম্যান্স নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, নীতি সংস্কার, নাগরিক অধিকার এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থালনা বিষয়ক গবেষণাপত্রগুলো আমাদের রাষ্ট্রকাঠামোকে সঠিকভাবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে রূপরেখা হিসেবে কাজ করবে। এই পরিবর্তনের ফলে জনপ্রশাসনের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসা অনিবার্য।
উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) আমাদের জন্য যেমন ভালো তেমন খারাপও। আমাদের সতর্কতার সাথে একাডেমিক ক্ষেত্রে এআইকে ব্যবহার করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিং এগিয়ে নিতে গবেষণাখাতকে আরও সমৃদ্ধ করতে হবে৷ গবেষণার মান যতো ভালো হবে, দেশ ততই উন্নয়নের দিকে ধাবিত হবে৷
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, বর্তমানে বিশ্ব কোভিড-১৯ মহামারি ও অর্থনৈতিক সংকটসহ নানা ধরনের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। এ ধরনের সংকটের সময় জনপ্রশাসনের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হলো জনগণের আস্থা নিশ্চিত করা। বর্তমান বাস্তবতায় জনপ্রশাসনকে জনগণের আস্থা ও সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রশাসনিক ব্যয় কমানোর বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন প্রফেসর কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, জনপ্রশাসন নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক বিপর্যয় ও রাজনৈতিক মাত্রাগুলোকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। ক্ষমতা ও সমতার বিষয়েও কার্যকরভাবে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে। জনপ্রশাসনকে আরও কার্যকর ও জনমুখী করতে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও আলোচনার আওতায় আনা জরুরি। এসময় তিনি প্রশাসনে মেধাভিত্তিক নিয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
লোক প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর ড. আকা ফিরোজ আহমেদ বলেন, এ সম্মেলনের উদ্দেশ্য শুধু প্রশাসন নিয়ে আলোচনা করা নয়; বরং দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য কার্যকর জ্ঞান, উৎপাদন ও নীতিগত দিকনির্দেশনাও অন্যতম লক্ষ্য। তিনি উল্লেখ করেন, লোক প্রশাসন বিভাগের প্রতিষ্ঠাতারা শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান ও একাডেমিক চর্চার ক্ষেত্র তৈরি করেননি, বরং আধুনিক ও সময়োপযোগী প্রশাসনিক চিন্তার বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি দেশের সিভিল সার্ভিসে প্রয়োজনীয় রূপান্তরের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং একটি কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে মূল্যবোধ, সভ্যতা ও আত্মত্যাগের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
সভাপতির বক্তব্যে লোক প্রশাসন বিভাগের চেয়ারপার্সন প্রফেসর ড. সৈয়দা লাসনা কবির বলেন, যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বিশ্বের অর্থনীতি, খাদ্য সরবরাহ এবং মানব নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সরকারি সেবা প্রদান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতিকে বদলে দিচ্ছে। একইসঙ্গে গোপনীয়তা, সাইবার নিরাপত্তা, অপতথ্য এবং ডিজিটাল বৈষম্য নিয়ে নতুন চিন্তার উদ্রেক করছে। বিশ্বের অনেক অংশেই মেরুকরণ, জনতুষ্টিবাদ এবং জনগণের আস্থা হ্রাসের কারণে স্বয়ং গণতন্ত্রই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সম্ভাব্য ঝুঁকি পূর্বাভাস করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে ১০টি প্যারালাল সেশন অনুষ্ঠিত হয়; যেখানে ১২টি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা মোট ৫১টি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন। সেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষার্থী, দেশি-বিদেশি অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।