যুক্তরাষ্ট্র ও নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ

দুই দশকের সামরিক উপস্থিতি ও ভূরাজনৈতিক আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে আমেরিকা যখন মধ্যপ্রাচ্যের মাটি থেকে চূড়ান্তভাবে তাদের সেনা গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করল, তখন ঐতিহাসিক এক মোড় ঘোরার মুহূর্তের মুখোমুখি হলো বিশ্ব রাজনীতি। ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের একচ্ছত্র শাসন উৎখাত করতে উত্তর আমেরিকার পরাশক্তিটির নির্দেশে যে সামরিক অভিযান শুরু হয়েছিল, তা যে কেবল একটি ভৌগোলিক অঞ্চলে সামরিক দখলদারিত্বের গল্প ছিল না, তা আজ দুই দশক পর অতিমাত্রায় স্পষ্ট। বিশ শতকের শেষভাগ থেকে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম প্রহর পর্যন্ত ওয়াশিংটন যেভাবে সামরিক শক্তির দাপটে বিশ্বে নিজেদের একক অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল, ইরাক ত্যাগ হলো সেই একক কেন্দ্রিক পরাশক্তি কাঠামোর চূড়ান্ত পরিণতি। ২০২৫ সালে বাগদাদ ত্যাগের পর এরবিলের হারির ঘাঁটি থেকে শেষ মার্কিন সাঁজোয়া বহর সরে যাওয়ার দৃশ্যটি তাই কোনো আকস্মিক সামরিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং দীর্ঘ দুই দশক ধরে চলে আসা এক রক্তক্ষয়ী ও ব্যর্থ ভূরাজনৈতিক অভিজ্ঞতার অবধারিত সমাপ্তি। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে যাকে মার্কিন প্রত্যাহার মনে হচ্ছে, তার গভীরে লুকিয়ে রয়েছে পেন্টাগনের এক নতুন সামরিক পুনর্বিন্যাস এবং তেহরানকেন্দ্রিক এক গভীর কৌশলগত চাল, যা মধ্যপ্রাচ্যকে এক সম্পূর্ণ অনিশ্চিত ও নতুন ভূরাজনৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

আমেরিকার এই সামরিক প্রস্থানকে যদি কেবলই যুদ্ধের অবসানের বার্তা হিসেবে দেখা হয়, তবে তা হবে অত্যন্ত সরলীকরণ। পেন্টাগনের এই পদক্ষেপের পেছনে সবচেয়ে বড় যে সামরিক চাল লুকিয়ে রয়েছে, তা হলো তাদের সেনাসদস্যদের অত্যন্ত সুরক্ষিত অঞ্চলে পুনর্বিন্যস্ত করা। ইরাকের অভ্যন্তরীণ ঘাঁটিতে অবস্থানরত প্রায় আড়াই হাজার মার্কিন সেনা দীর্ঘদিন ধরেই ইরান-সমর্থিত স্থানীয় শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর সহজ লক্ষ্যবস্তু ছিল। তেহরানের বিরুদ্ধে কোনো সরাসরি বা বড় ধরনের বিমান হামলার রূপরেখা বাস্তবায়ন করতে গেলে ইরাকের মাটিতে মার্কিন সেনাদের জিম্মি হয়ে পড়ার স্পষ্ট শঙ্কা তৈরি হতো। ফলে পেন্টাগন অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় তাদের সেনাদের জর্ডান, কুয়েত এবং পারস্য উপসাগরের সুরক্ষাবেষ্টনীতে সরিয়ে নিয়েছে। এর অর্থ হলো, মার্কিন বাহিনী ইরাক ছাড়লেও মধ্যপ্রাচ্য ছাড়েনি; বরং তারা তাদের সেনাদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিয়ে তেহরানের ওপর বড় ধরনের সামরিক আঘাত হানার পথকে অনেক বেশি মসৃণ ও ঝুঁকিমুক্ত করেছে। উপরন্তু, ইরাকের মূল ভূমিতে সেনা না রাখলেও সেখানকার আকাশসীমা ও রাডার মনিটরিং ব্যবস্থা সেন্টকমের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে রাখা নিশ্চিত করা হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ আকাশ যুদ্ধের জন্য তৈরি রাখা এক ফাঁকা যুদ্ধক্ষেত্রের ইঙ্গিত দেয়।

ওই ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনা করতে গিয়ে ২০০৩ সালের সেই অন্যায্য আক্রমণের অধ্যায়টি আবারও সামনে চলে আসে। জাতিসংঘের অনুমতি ব্যতিরেকে এবং গণবিধ্বংসী অস্ত্রের সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও মিথ্যা অজুহাতে ইরাকে যে আগ্রাসন চালানো হয়েছিল, তা আন্তর্জাতিক আইন ও নৈতিকতার ইতিহাসে এক কালো দাগ হয়ে রয়েছে। সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি আমেরিকার উদ্দেশে যে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন আগ্রাসনকারীরা ইরাককে স্থিতিশীল করতে পারবে না এবং তারা এই অঞ্চলে এক স্থায়ী রক্তক্ষয় ও বিশৃঙ্খলা রেখে যাবে। তা আজ নির্মমভাবে সত্য প্রমাণিত হলো। বিরতিসহ ২৩ বছরের সামগ্রিক হিসাব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রায় সাড়ে চার হাজার মার্কিন সেনার জীবনহানি, দুই ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থনৈতিক অপচয় এবং লাখ লাখ অনাকাক্সিক্ষত ইরাকি মানুষের প্রাণহানির বিনিময়ে পেন্টাগন সেখানে কেবলই এক ভঙ্গুর রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি করতে পেরেছিল। বলপ্রয়োগ করে চাপিয়ে দেওয়া গণতন্ত্র যে শেষ পর্যন্ত কার্যকর কোনো রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করতে পারে না, সোমালিয়া, ভিয়েতনাম ও আফগানিস্তানের পর ইরাক হলো তার সর্বশেষ ও স্পষ্ট উদাহরণ।

পেন্টাগনের সেনা অপসারণের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার শূন্যতায় যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে, তার মূল লাভজনক অবস্থানে রয়েছে ইরান। তেহরান দীর্ঘদিন ধরে তাদের কৌশলগত আঞ্চলিক কাঠামোর মাধ্যমে পুরো অঞ্চলে নিজেদের রাজনৈতিক ও সামরিক বলয় বিস্তৃত করেছে। বাগদাদে পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্স এবং কাসাইব হিজবুল্লাহর মতো শক্তিশালী মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর দাপট এখন রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশি দৃঢ় ও স্থায়ী রূপ ধারণ করবে। বাগদাদের কেন্দ্রীয় সরকার দীর্ঘদিন ধরেই সার্বভৌমত্বের ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তির টানাপড়েনে পিষ্ট হচ্ছিল। এখন মার্কিন সামরিক অনুপস্থিতি তেহরানের জন্য সমগ্র ইরাকি প্রশাসনের ওপর নিজস্ব অর্থনৈতিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করে দিল। তবে এই মুদ্রাটির ওপরের পিঠ যদি হয় ইরানের রাজনৈতিক বিজয়, তবে তার অপর পিঠ নির্দেশ করছে এক ভয়াবহ নিরাপত্তা শূন্যতা। আন্তর্জাতিক প্রতিরোধ ও প্রাথমিক সামরিক নিরাপত্তার অনুপস্থিতিতে আনবার মরুভূমি ও গোত্র-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে সুপ্ত অবস্থায় থাকা জঙ্গি সংগঠন আইএসআইএস আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। স্থানীয় সুন্নি গোত্রভিত্তিক গোষ্ঠীগুলো এবং কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যকার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বৈষম্য ও অবিশ্বাসকে পুঁজি করে চরমপন্থী দলগুলোর এই পুনরুত্থান পুরো অঞ্চলের আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে এক বিরাট ধ্বংসাত্মক ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন কেবল কোনো একক আঞ্চলিক সংকটে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলবে। তেল ও গ্যাস সরবরাহের বৈশ্বিক রুটে যদি ইরান এবং মার্কিন সমর্থিত শক্তির মধ্যে নতুন করে কোনো আকাশযুদ্ধ বা সামরিক সংঘাত বাধে, তবে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল চরম হুমকির মুখে পড়বে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পাবে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতির ওপর তীব্র নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন-বিরোধী অন্য বিশ্বশক্তিগুলো এখন মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন ক্ষমতার শূন্যতা পূরণ করতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে আরও সক্রিয় হতে চাইছে। তারা ইতিমধ্যে তাদের কূটনৈতিক মধ্যস্থতা ও বিশাল অর্থনৈতিক বিনিয়োগ বাড়িয়ে এই অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান মজবুত করার কৌশল গ্রহণ করেছে, যা বহুজাতিক ভূরাজনীতিতে আমেরিকার পূর্বতন একক আধিপত্যের জন্য আরেকটি বড় ধাক্কা। একই সময়ে পেন্টাগন কেবল পারস্য উপসাগর বা মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে তাদের কৌশলগত পুনর্বিন্যাস ঘটাচ্ছে। ইউরোপ থেকে শুরু করে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর ওপরের চাপ কমাতেই এই একক ভূখণ্ডকেন্দ্রিক দীর্ঘস্থায়ী স্থল অভিযানগুলোর ইতি টানা হচ্ছে। আধুনিক যুদ্ধকৌশলে এখন আর হাজার হাজার পদাতিক সেনা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে কোনো দেশ দখল করে রাখার নীতি কার্যকর নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, হাইপারসোনিক মিসাইল, দূরনিয়ন্ত্রিত ড্রোন প্রযুক্তি এবং সাইবার যুদ্ধক্ষেত্রের বিকাশের ফলে পেন্টাগন এখন সরাসরি স্থল উপস্থিতির চেয়ে ভৌগোলিক দূরত্ব বজায় রেখে আঘাত হানার সক্ষমতা বাড়াতে মনোযোগী হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দায়ভার কমে, অন্যদিকে আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর প্রতিরক্ষার সিংহভাগ ভার চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়।

ইরাকের অভ্যন্তরে তৈরি হওয়া এই শূন্যতা সেখানকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেও এক গভীর ক্ষত রেখে যাচ্ছে। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা রাজনৈতিক অস্থিরতা, অবকাঠামোগত বিনাশ এবং দুর্নীতি ও অস্থিতিশীলতার কারণে দেশটির শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। মার্কিন বাহিনীর বিদায়ের পর সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের যে উদযাপিত চিত্র দেখা যাচ্ছে, তার আড়ালে রয়ে গেছে এক দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা। ইরাকের নতুন প্রজন্ম, যারা জন্ম থেকেই কেবল যুদ্ধ, বোমাবর্ষণ আর বিদেশি সামরিক ট্যাংকের শব্দ শুনে বড় হয়েছে, তারা এখন এক চরম অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। দেশের তেলসম্পদ থেকে উপার্জিত বিপুল রাজস্ব সুষম বণ্টনের অভাবে এবং দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক এলিটদের হাতে বন্দি থাকার ফলে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক জীবনের কোনো গুণগত পরিবর্তন ঘটেনি। ফলে কেবল বিদেশি সেনা সরিলেই একটি জাতির ভাগ্য পরিবর্তিত হয় না, যতক্ষণ না দেশের ভেতরের শাসনব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও স্বনির্ভরতা প্রতিষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে পর্যালোচনা করলে এটি স্পষ্ট, বাগদাদ থেকে মার্কিন সেনা অপসারণের মাধ্যমে বিশ্ব রাজনীতি কোনো শান্তির নতুন প্রত্যুষে প্রবেশ করেনি, বরং এটি এক অত্যন্ত জটিল ও বিপজ্জনক ভূরাজনৈতিক দাবা খেলার সূচনা মাত্র।  বিদেশি দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার আনন্দ একদিকে যেমন রয়েছে, অন্যদিকে আঞ্চলিক আধিপত্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সুপ্ত চরমপন্থার পুনরুত্থানের আশঙ্কা ইরাককে এক পরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়েছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, পরাশক্তিগুলো যখন তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থে কোনো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে প্রস্থান করে, তখন তার পরিণতি হয় দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত। ২০২৬ সালের ঐতিহাসিক সেনা প্রত্যাহারের ঘটনাটি ঠিক সেই পুরনো বৈশ্বিক সামরিক পদ্ধতিরই পুনরাবৃত্তি, যা ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যকে আরও বেশি রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক মেরুকরণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে পারে।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও পরিবেশ গবেষক