সম্পদ নয়, তাকওয়া মর্যাদার মাপকাঠি

আমরা মানুষকে তার সম্পদ দিয়ে বিচার করি। যার সম্পদ আছে, তার কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনি। তার ভুলও অনেক সময় সহজে চোখ এড়িয়ে যায়। আবার যার সম্পদ কম, তার জ্ঞান ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাকে অবহেলা করি। মানুষের এই প্রবণতাই ফুঠে উঠেছে হজরত আলি (রা.)-এর এক কবিতায়।

তিনি লিখেছেন, ‘অধিক সম্পদ মানুষের দোষত্রুটি ঢেকে দেয়। সে মিথ্যাবাদী হলেও অন্যরা তার কথা বিশ্বাস করে। আর অল্প সম্পদ মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে খাটো করে দেয়। সে জ্ঞানী হলেও অন্যরা তাকে নির্বোধ মনে করে। (দিওয়ানে আলি)

কবিতার বক্তব্য মূলত মানুষের সামাজিক মূল্যায়নের একটি অসংগতিকে সামনে আনে। সম্পদ মানুষের জীবনকে সচ্ছল করে। প্রয়োজন পূরণে সাহায্য করে। মানুষের জন্য বহু কল্যাণের সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু সম্পদ কখনো মানুষের চরিত্র, সত্যবাদিতা কিংবা জ্ঞানের প্রমাণ নয়। একজন মানুষ ধনী হলেই তার প্রতিটি কথা সত্য হয়ে যায় না। আবার কেউ দরিদ্র হলেই তার কথা অজ্ঞতার পরিচয় বহন করে না।

সমাজে অর্থের প্রভাব অনেক সময় মানুষের বিচারবোধকে প্রভাবিত করে। ধনী ব্যক্তির পোশাক, জীবনযাপন, পরিচিতি ও সামাজিক অবস্থান তার প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে পারে। তার ভুলকে মানুষ সামান্য বিষয় হিসেবে দেখতেও পারে। তার বক্তব্যের সত্যতা যাচাই না করেই অনেকে তা গ্রহণ করতে পারে। অথচ একই কথা একজন দরিদ্র মানুষ বললে তা গুরুত্ব না পাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তার জ্ঞানকে প্রশ্ন করা হয়। তার যোগ্যতাকে ছোট করে দেখা হয়।

এই মানসিকতা মানুষের জন্য ন্যায়সংগত নয়। কারণ মানুষের প্রকৃত মূল্য তার সম্পদের পরিমাণ দিয়ে নির্ধারিত হয় না। সম্পদ মানুষের হাতে থাকতে পারে। আবার কোনো এক সময় তা নাও থাকতে পারে। আজ যে ব্যক্তি সচ্ছল, আগামী দিনে সে অভাবের মুখোমুখি হতে পারে। আবার আজ যে ব্যক্তি অভাবগ্রস্ত, আগামী দিনে আল্লাহ তাকে সচ্ছলতা দান করতে পারেন। তাই পরিবর্তনশীল সম্পদকে মানুষের মর্যাদার মাপকাঠি বানানো যুক্তিসংগত নয়।

ইসলাম মানুষের মর্যাদার ক্ষেত্রে আরও সুস্পষ্ট একটি মাপকাঠি দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাবান সে, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।’ (সুরা হুজুরাত ১৩)

এই আয়াত মানুষের মর্যাদার একটি মৌলিক ভিত্তি নির্ধারণ করে। বংশ, জাতি, গোত্র, সম্পদ কিংবা সামাজিক অবস্থান মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি নয়। আল্লাহর কাছে মর্যাদার মূল বিষয় হলো তাকওয়া। অর্থাৎ আল্লাহকে ভয় করে তার নির্দেশ মেনে চলা, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

ধনী হওয়া যেমন দোষের বিষয় নয়, তেমনি দরিদ্র হওয়াও অপমানের বিষয় নয়। ইসলাম বৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জনকে নিষিদ্ধ করেনি। বরং সম্পদ মানুষের জন্য পরীক্ষা। সে সম্পদ কীভাবে অর্জন করছে, কোথায় ব্যয় করছে এবং সম্পদের কারণে তার অন্তরে অহংকার জন্ম নিচ্ছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

একজন ধনী মানুষ যদি তাকওয়াবান হন, তার সম্পদ তার জন্য কল্যাণের মাধ্যম হতে পারে। তিনি দরিদ্রের অধিকার আদায় করতে পারেন। আত্মীয়-স্বজনের সহযোগিতা করতে পারেন। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারেন। আল্লাহর পথে ব্যয় করতে পারেন। অন্যদিকে একজন দরিদ্র মানুষও তাকওয়া, জ্ঞান, সততা ও উত্তম চরিত্রের কারণে আল্লাহর কাছে মর্যাদাবান হতে পারেন।

লেখক : ইমাম, খতিব ও মাদ্রাসাশিক্ষক