প্রাণীর প্রতি মানুষের দায়িত্ব

ইসলাম প্রাণীর প্রতি দয়া ও সদাচরণের শিক্ষা দিয়েছে। অকারণে কষ্ট দেওয়া, নির্যাতন করা কিংবা প্রয়োজনের অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেওয়াকে সমর্থন করেনি। বরং প্রাণীর প্রতিও মানুষের দায়িত্ব ও জবাবদিহির কথা জানিয়েছে।

প্রাণী আল্লাহর সৃষ্টি : পবিত্র কোরআনে প্রাণীকে আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে বিশেষ মর্যাদায় উল্লেখ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘ভূপৃষ্ঠে বিচরণশীল কোনো প্রাণী এবং দুই ডানা দিয়ে উড়ে এমন কোনো পাখি নেই, যারা তোমাদের মতো একেকটি জাতি নয়।’ (সুরা আনআম ৩৮)

এই আয়াত প্রাণিজগৎ সম্পর্কে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। পৃথিবীর সব প্রাণীই আল্লাহর সৃষ্টি এবং নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য ও জীবনব্যবস্থা নিয়ে পৃথিবীতে অবস্থান করছে। তাই এগুলোর প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করা মানুষের কর্তব্য।

প্রাণীর প্রতি দয়ায় আল্লাহর রহমত : প্রাণীর প্রতি দয়া অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাজ। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, রাস্তা দিয়ে চলার সময় একজন লোকের ভীষণ পিপাসা লাগল। সে কূপে নেমে পানি পান করল। এরপর সে বের হয়ে দেখতে পেল, একটা কুকুর হাঁপাচ্ছে এবং পিপাসায় কাতর হয়ে মাটি চাটছে। সে ভাবল, কুকুরটারও আমার মতো পিপাসা লেগেছে। সে কূপের মধ্যে নামল এবং নিজের মোজা ভরে পানি নিয়ে মুখ দিয়ে সেটি ধরে ওপরে উঠে এসে কুকুরটিকে পানি পান করাল। মহান আল্লাহ তার আমল কবুল করলেন এবং তার গুনাহ মাফ করে দিলেন। সাহাবিরা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! চতুষ্পদ জন্তুর উপকার করলেও কি আমাদের সাওয়াব হবে? তিনি বললেন, প্রত্যেক প্রাণীর উপকার করাতেই পুণ্য রয়েছে। (সহিহ বুখারি ২৩৬৩)

এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, প্রাণীর প্রতি করা সামান্য দয়াও আল্লাহর কাছে মূল্যবান হতে পারে। মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণের মতো প্রাণীর প্রতিও সহানুভূতি প্রকাশ করা মুমিনের চরিত্রের অংশ।

প্রাণীকে কষ্ট দেওয়া অপরাধ : প্রাণীর প্রতি দয়া যেমন সওয়াবের কাজ, তেমনি এগুলোর ওপর নির্যাতন করাও গুরুতর অপরাধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন এক নারীর ঘটনা বলেছেন, যে একটি বিড়ালকে আটকে রেখেছিল। সে বিড়ালটিকে খাবার ও পানি দেয়নি এবং তাকে ছেড়েও দেয়নি, যাতে সে নিজে খাবার সংগ্রহ করতে পারে। ফলে বিড়ালটি মারা যায়। এই নিষ্ঠুরতার কারণে নারীটিকে জাহান্নামে যেতে হয়। (সহিহ বুখারি ৩৩১৮)

এ হাদিস মানুষের জন্য স্পষ্ট সতর্কবার্তা। কোনো প্রাণীকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখলে তার প্রয়োজন পূরণের দায়িত্বও নিতে হবে। তাকে আটকে রেখে অনাহারে রাখা কিংবা অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখা গ্রহণযোগ্য নয়।

অকারণে প্রাণী হত্যা নয় : ইসলাম প্রয়োজন ছাড়া প্রাণী হত্যাকে উৎসাহিত করে না। খাদ্য, আত্মরক্ষা বা বৈধ প্রয়োজনের ক্ষেত্রে প্রাণী ব্যবহারের অনুমতি থাকলেও নিছক আনন্দ, খেলা কিংবা নিষ্ঠুরতার জন্য প্রাণী হত্যা করা ইসলামের দয়ার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রাণীকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে তীর নিক্ষেপ করতেও নিষেধ করেছেন। সহিহ মুসলিমে এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। প্রাণীকে শুধু নিজের দক্ষতা প্রদর্শনের উপকরণ বানানো ইসলামের দৃষ্টিতে সমর্থনযোগ্য নয়।

জবাইয়েও থাকতে হবে দয়া : ইসলাম হালাল প্রাণীর মাংস খাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু প্রাণী জবাইয়ের ক্ষেত্রেও নিষ্ঠুরতার সুযোগ রাখেনি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ সব বিষয়ে উত্তম আচরণ ফরজ করেছেন। তোমরা যখন হত্যা করবে, সুন্দরভাবে হত্যা করবে। আর যখন জবাই করবে, সুন্দরভাবে জবাই করবে। তোমাদের প্রত্যেকে যেন তার ছুরি ধারালো করে এবং জবাইকৃত প্রাণীকে স্বস্তি দেয়।’ (সহিহ মুসলিম ১৯৫৫)

এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, বৈধভাবে প্রাণী জবাই করলেও তাকে অপ্রয়োজনীয় কষ্ট দেওয়া যাবে না। জবাইয়ের পদ্ধতিতেও দয়া ও দক্ষতা বজায় রাখতে হবে।

অতিরিক্ত বোঝা চাপানো অন্যায় : প্রাণীকে মানুষের কাজে ব্যবহার করার অনুমতি থাকলেও এগুলোর সামর্থ্যরে সীমা বিবেচনা করতে হবে। ঘোড়া, গাধা, উট বা অন্য কোনো বাহনকে অতিরিক্ত বোঝা দিয়ে কষ্টে ফেলা উচিত নয়। নিয়মিত এগুলোর খাবার, পানি ও বিশ্রামের ব্যবস্থা করতে হবে।

সাহল ইবনে হানজালিয়া (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন একটি উটের কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন, অনাহারে সেটির পেট পিঠের সঙ্গে লেগে গিয়েছিল। তিনি বললেন, তোমরা এসব বাকশক্তিহীন পশুর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। সুস্থ সবল পশুর পিঠে আরোহণ করবে এবং এগুলোকে উত্তমরূপে আহার করাবে। (সুনানে আবু দাউদ ২৫৪৮)

এ থেকে বোঝা যায়, প্রাণীকে শুধু ব্যবহার করার বস্তু হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলোর সামর্থ্য ও প্রয়োজনের প্রতিও নজর রাখতে হবে।

মা প্রাণী ও বাচ্চার প্রতি সহমর্মিতা : আবদুর রাহমান ইবনে আবদুল্লাহ (রহ.) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সফর সঙ্গী ছিলাম। তিনি তার প্রয়োজনে অন্যত্র গেলেন। আমরা দুটি বাচ্চাসহ একটি পাখি দেখতে পেয়ে বাচ্চা দুটিকে ধরে নিলাম। মা পাখিটি সঙ্গে সঙ্গে এলো এবং পাখা ঝাঁপটিয়ে বাচ্চার জন্য অস্থিরতা প্রকাশ করতে লাগল। রাসুলুল্লাহ (সা.) ফিরে এসে বললেন, কে এর বাচ্চা নিয়ে এসে একে অস্থিরতায় ফেলেছে? বাচ্চাগুলো এদের মায়ের কাছে ফিরিয়ে দাও।

এই ঘটনা প্রাণীর অনুভূতির প্রতি ইসলামের সংবেদনশীলতার সুন্দর উদাহরণ। প্রাণীর মধ্যেও মাতৃত্বের টান রয়েছে। তাই এগুলোর স্বাভাবিক জীবন ও বন্ধন অকারণে নষ্ট করা উচিত নয়।

একই হাদিসে বর্ণনাকারী আরও বলেন, তিনি (নবীজি) আমাদের পুড়িয়ে দেওয়া একটি পিঁপড়ার ঢিবি দেখতে পেয়ে বললেন, কে এগুলো পুড়িয়েছে? আমরা বললাম, আমরা। তিনি বললেন, আগুনের রব ছাড়া আগুন দিয়ে কিছুকে শাস্তি দেওয়ার কারও অধিকার নেই। (সুনানে আবু দাউদ ২৬৭৫)

পোষা প্রাণীর যতœ : অনেকে শখ করে বিড়াল, পাখি কিংবা অন্য প্রাণী পোষে। কিন্তু প্রাণী পোষা শুধু আনন্দের বিষয় নয়, এটি দায়িত্বও। খাবার, পানি, নিরাপদ আশ্রয় এবং প্রয়োজনীয় পরিচর্যার ব্যবস্থা করা মালিকের দায়িত্ব।

কোনো প্রাণীকে নিজের কাছে রেখে সেটার প্রয়োজন পূরণ না করলে তা অন্যায়ের পর্যায়ে যেতে পারে। তাই প্রাণী পোষার আগে সেটার যথাযথ যতœ নেওয়ার সামর্থ্য ও দায়িত্ববোধ থাকা প্রয়োজন।

প্রাণীর প্রতি দয়া পরিবেশ রক্ষার অংশ : প্রাণীর অধিকার রক্ষার সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণও জড়িত। বন ধ্বংস হলে বন্যপ্রাণী তাদের আবাসস্থল হারায়। নদী ও জলাশয় দূষিত হলে জলজ প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নির্বিচারে শিকার করলে প্রাণীর স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়।

ইসলাম পৃথিবীতে ভারসাম্য বজায় রাখার শিক্ষা দিয়েছে। তাই পরিবেশ ধ্বংস করে প্রাণীর জীবন বিপন্ন করা ইসলামের সামগ্রিক নৈতিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

আধুনিক সমাজে প্রাণীর প্রতি দায়িত্ব : বর্তমান সময়ে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতার নানা ঘটনা দেখা যায়। রাস্তার প্রাণীকে অকারণে পিটিয়ে মারা, বিষপ্রয়োগ করা, পাখিকে দীর্ঘদিন খাঁচায় বন্দি রাখা, পশুকে অনাহারে রাখা, অতিরিক্ত বোঝা বহন করানো এবং বিনোদনের জন্য প্রাণীকে নির্যাতন করা ইত্যাদি নিষ্ঠুর আচরণ পরিত্যাগ করা প্রয়োজন।

পরিবার থেকেই এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা যেতে পারে। শিশুদের প্রাণীর প্রতি কোমল আচরণ শেখাতে হবে। অসহায় প্রাণী দেখলে তাকে অকারণে ভয় না দেখিয়ে সম্ভব হলে খাবার ও পানি দিতে বলা।

মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব ও দায়িত্ব : ইসলাম মানুষকে পৃথিবীতে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। কিন্তু এই মর্যাদা মানুষের জন্য সীমাহীন ক্ষমতার ঘোষণা নয়। বরং এর সঙ্গে দায়িত্বও রয়েছে। প্রাণী মানুষের অধীন হতে পারে, কিন্তু তাই বলে মানুষ এগুলোর প্রতি যা ইচ্ছা তাই করতে পারে না।

আল্লাহ মানুষকে বিবেক, জ্ঞান ও ক্ষমতা দিয়েছেন। তাই দুর্বল প্রাণীর প্রতি তার দায়িত্ব আরও বেশি। যে প্রাণী নিজের অধিকার দাবি করতে পারে না, সেটার প্রতি মানুষের ন্যায় ও দয়ার আচরণই প্রকৃত নৈতিকতার পরিচয়।           

লেখক : ইসলামি গবেষক