ডেঙ্গুজ্বর কমার পরও বিপদ হতে পারে

ডা. তারেক সালাহ্উদ্দিন

জেনারেল প্র্যাকটিশনার ও ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান।

বাংলাদেশ ক্যানসার অ্যান্ড প্যালিয়েটিভ কেয়ার সেন্টার, ধানমন্ডি, ঢাকা।

প্লাজমা লিকেজ থেকে শক ও অঙ্গের জটিলতা হতে পারে; তাই ডেঙ্গু চিকিৎসায় সঠিক ফ্লুইড ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডেঙ্গু নিয়ে বিপজ্জনক ভুল ধারণাগুলোর একটি হলো জ্বর কমে গেলেই রোগী সুস্থ হয়ে যাচ্ছে। অনেকের ক্ষেত্রে সত্য হলেও, কিছু রোগীর জন্য জ্বর নামার সময়টিই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এই সময় শুরু হতে পারে ক্রিটিক্যাল ফেজ, যখন প্লাজমা লিকেজ দেখা দেয়। প্লাজমা রক্তের তরল অংশ। গুরুতর ডেঙ্গুতে শরীরের সূক্ষ্ম রক্তনালির দেয়াল সাময়িকভাবে বেশি ভেদ্য হয়ে পড়ে। রক্তনালি থেকে প্লাজমা বেরিয়ে আশপাশের টিস্যু, ফুসফুসের চারপাশ বা পেটের ভেতরে জমতে পারে। রক্ত সঞ্চালনে কার্যকর রক্তের পরিমাণ কমে যায় এবং রক্ত ঘন হয়ে আসে। প্লাজমা লিকেজ বেশি হলে রক্তচাপ ও টিস্যুতে রক্তপ্রবাহ কমে গিয়ে ডেঙ্গু শক হতে পারে। শক মানে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ পর্যাপ্ত রক্ত ও অক্সিজেন পাচ্ছে না। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে কিডনি, লিভার, মস্তিষ্ক ও হৃদ্যন্ত্রের কার্যকারিতা ব্যাহত হতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে একাধিক অঙ্গ বিকল হওয়া এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে। ডেঙ্গু রোগীর হেমাটোক্রিট বা ঐঈঞ গুরুত্বপূর্ণ। রক্তে লোহিত রক্তকণিকার অনুপাত নির্দেশ করে। প্লাজমা বেরিয়ে গেলে রক্ত ঘন হয় এবং হেমাটোক্রিট বাড়তে পারে। শুধু প্লেটলেট কাউন্ট দেখে ডেঙ্গুর তীব্রতা বিচার করা ঠিক নয়। রোগী ও স্বজনদের দৃষ্টি প্রায়ই প্লেটলেটের সংখ্যায় আটকে থাকে।  চিকিৎসকদের হেমাটোক্রিটের পাশাপাশি রক্তচাপ, পালস প্রেসার, প্রস্রাবের পরিমাণ, পেরিফেরাল সার্কুলেশন এবং রোগীর সামগ্রিক অবস্থাও দেখতে হয়। রোগীর অবস্থা খারাপ হওয়ার সঙ্গে হেমাটোক্রিট বাড়তে থাকলে গুরুত্বপূর্ণ প্লাজমা লিকেজের ইঙ্গিত হতে পারে। ডেঙ্গু চিকিৎসায় ফ্লুইড ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সমাধান কেবল ‘স্যালাইন দেওয়া’

নয়। কম ফ্লুইড যেমন বিপজ্জনক, অতিরিক্ত ফ্লুইডও তেমনি ক্ষতিকর। প্লাজমা লিকেজের সময় পর্যাপ্ত ফ্লুইড না পেলে রক্ত সঞ্চালনের পরিমাণ কমে শক ও অঙ্গের ক্ষতি হতে পারে। আবার অতিরিক্ত শিরায় ফ্লুইড দিলে পরে ফ্লুইড ওভারলোড, ফুসফুসে পানি জমা, শ্বাসকষ্ট বা হৃদ্যন্ত্রের জটিলতা দেখা দিতে পারে। কারণ রক্তনালি থেকে বেরিয়ে যাওয়া তরল শরীর থেকে হারিয়ে যায় না। লিকেজ বন্ধ হলে সেই তরল আবার রক্ত সঞ্চালনে ফিরে আসে। তখন আগে থেকে দেওয়া অতিরিক্ত স্যালাইন বিপদ বাড়াতে পারে। তাই মূলনীতি হলো সঠিক সময়ে, সঠিক পরিমাণে ফ্লুইড এবং ঘন ঘন রোগীর অবস্থা পুনর্মূল্যায়ন। যে রোগী মুখে পর্যাপ্ত তরল নিতে পারছেন, তার সব সময় শিরায় ফ্লুইড দরকার নাও হতে পারে।

আবার যাদের সতর্ক সংকেত বা উল্লেখযোগ্য প্লাজমা লিকেজ আছে, তাদের হিসাব করে আইসোটোনিক ফ্লুইড দিতে হতে পারে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনেক রোগী জ্বর কমার পরই হঠাৎ বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন। কেউ কেউ হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পরও আবার খারাপ হতে পারেন। সাধারণত ডেঙ্গু ‘ফিরে আসা’ নয়। বরং জ্বর নামার সময়ই ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার ক্রিটিক্যাল ফেজ শুরু হতে পারে। জ্বর কমার পর তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, অস্বাভাবিক ঝিমুনি বা অস্থিরতা, হাত-পা ঠা-া হয়ে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, রক্তপাত, মাথা ঘোরা বা প্রস্রাব কমে গেলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। ডেঙ্গুতে তাই জ্বর নামা সব সময় স্বস্তির খবর নয়। অনেক সময় বিপদ ঠিক তখনই বাড়তে পারে। প্লাজমা লিকেজ বুঝে সঠিক ফ্লুইড ব্যবস্থাপনাই জটিলতা ও শক প্রতিরোধের অন্যতম চাবিকাঠি।